জাহাজঘাটায় দাঁড় করানো ছিল একটা সুসজ্জিত সাদা ঘোড়া। এলাইমো সেই ঘোড়ায় উঠে বসল। ঘোড়া আস্তে আস্তে চলল।
বন্দি দুজনকে মাঝখানে রেখে দুপাশে দাঁড়াল খোলা তলোয়ার হাতে আটজন সৈন্য। পেছনে ফ্রান্সিস, মারিয়া আর হ্যারি মেরাবিত তখনও সুস্থ হয়নি। হাঁটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ওর খুব কষ্ট হচ্ছে।
নগরে ঢুকল সবাই। সিরাকস মোটামুটি বড়ো একটা বন্দর-শহর। রাস্তায় লোকজনের বেশ ভিড়। সারি সারি খোলা দোকানপাট। এর মধ্যেই রটে গেছে মোরাবিত আর সাভোনাকে বন্দি করে নিয়ে আসা হচ্ছে। লোকজন যে যার কাজ ফেলে মোরাবিকে দেখতে ছুটে এলো। সাভোনা রাজ-অমাত্য ছিল। তাকে অনেকেই দেখেছে। চেনেও। কিন্তু বিদ্রোহীযুবক মোরাবিতের নামই সবাই শুনেছে। চোখ কখনও দেখেনি। তাই সকলে সাগ্রহে মোরাবিকে দেখতে রাস্তায় ভিড় করল। ফ্রান্সিস, মারিয়া, হ্যারিকে দেখেও ওরা একটু আশ্চর্য হলো। এই ভিনদেশী লোকগুলোকে তো বন্দি করা হয়নি। তাহলে এদের দুর্গে রাজার কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কেন?
ম্যামিয়েস দুর্গ অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি হয়েছে। উঁচু পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রধান দরজার কাছে এলাইমো ঘোড়া থেকে নামল। প্রধান ফটকটি মজবুত কাঠের। দ্বাররক্ষীরা এলাইমোকে দেখে মাথা নিচু করে সম্মান জানাল। একটু শব্দ তুলে দরজা খুলে দিল ওরা।
সবাই দুর্গের ভেতরে ঢুকল। একটা পাথরের তৈরি চত্বরের পর দুর্গের পাথরে তৈরি বাড়িঘর। চত্বর পেরিয়ে একটা বড়ো দরজার সামনে সবাই এলো। দুজন দ্বাররক্ষী এলাইমোকে সন্মান জানাল। এলাইমো একজন দ্বাররক্ষীকে কী বলল। সে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। একটু পরে বেরিয়ে এলাইমাকে কী বলল। এলাইমো পেছন ফিরে হাতের ইঙ্গিতে সবাইকে ঘরে ঢুকতে বলল।
সৈন্যরা বাদে ঘরে ঢুকল সবাই। ঘরটা বেশ বড়। একটু অন্ধকার মতো। পাথরের দেয়ালের পাথর কুঁদে ফুল-লতাপাতার কাজ করা। সামনেই একটা পাথরের রঙিন কাপড় ঢাকা আসনে রাজা ফ্রেডারিক বসে আছেন। দুপাশে লম্ফাটে পাথরের কাপড়-ঢাকা আসনে রাজা ফ্রেডারিক বসে আছেন। নিশ্চয়ই মন্ত্রী-অমাত্যরা। রাজা ফেডারিকের মাথায় দামি পাথর বসানো সবুজ মীনে করা মুকুট। রাজা মধ্যবয়স্ক। পরনে রেশমী কাপড়ের ঢিলে পোশাক। অমাত্যদের গায়েও একই রকম পোশাক।
এলাইমা মাথা নিচু করে রাজাকে সম্মান জানাল। মোরাবিত সাভোনা মাথা নোয়ালো না। ফ্রান্সিস এটা দেখে মনে মনে ওদের প্রশংসা করল। এলাইমা একনাগাড়ে কী বলে যেতে লাগল। হ্যারি মৃদুস্বরে সেসব ফ্রান্সিসকে বুঝিয়ে দিল। এলাইমোর কথা শেষ হলে রাজা ফ্রেডারিক মোরাবিতের দিকে তাকিয়ে বললেন,—সারাসেনদের ক্ষেপিয়ে তুমি রাজবিদ্রোহী হয়েছে। তোমরা ফাঁসি হবেই। এবার সাভোনার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের সুরে বললেন, সাভোনা, বেশ তো আমার রাজসভায় সুখে ছিলে। সে সুখ তোমার সহ্য হল না। সব ছেড়েছুঁড়ে চলে গেলে। বিদ্রোহীদের পরামর্শদাতা হলে। এবার বাকি জীবন কয়েদঘরে কাটাতে হবে যে। মোরাবিত সাভোনা কোনো কথা বলল না।
এবার রাজা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। স্পেনীয় ভাষায় বলল, শুনলাম আপনার ভাইকিং। মোরাবিত আর সাভোনাকে আশ্রয় দিয়েছেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করিয়েছেন। কিন্তু আপনারা কি জানতেন না ওরা রাজদ্রোহী?
ফ্রান্সিস একটু মাথা ঝাঁকিয়ে সত্যি কথাই বলল,হ্যাঁ, মোরাবিত বিদ্রোহী আমরা ঘটনাক্রমে সেটা জানতাম। কিন্তু সাভোনার পরিচয় জানতাম না।
ফ্রান্সিসের কথা শুনে হ্যারি মৃদুস্বরে বলল এটা স্বীকার করলে কেন? এতে তো আমাদের বিপদ বাড়বে।
—দেখা যাক। ফ্রান্সিস ও মৃদুস্বরে বলল।
রাজা ফ্রেডারিক বললেন, আপনারা বিদেশি। তবু জেনেশুনে যখন ওদের আশ্রয় দিয়েছেন তখন আপনাদেরও বিচার হবে কয়েকদিনের মধ্যেই।
ফ্রান্সিস বলল, বেশ। তবে আপনাকে আমার কয়েকটা কথা বলার আছে।
—বলুন।
—সাভোনা এদেশের অতীত ইতিহাস ভালোই জানেন। ওঁর কাছে শুনেছি প্রায় একশো বছর আগের রাজা কাউন্ট রজার এখানে তাঁর সমস্ত ধনসম্পদ কোথাও গোপনে রেখেছিলেন। আমরা স্থির করেছি সেই গুপ্তধন অনুসন্ধান করে উদ্ধার করবো। ফ্রান্সিস বলল।
কথাটা শুনে রাজা ফ্রেডারিক বেশ আশ্চর্য হলেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন, প্রায় একশো বছর ধরে আমার পূর্বপুরুষরা ঐ গুপ্তধন উদ্ধারের কত চেষ্টা করেছেন। কেউ পারেননি। আপনি বলেছেন পারবেন।
—পারবোই একথা বলার সময় এখনো আসেনি। সব দেখাশুনে চিন্তাভাবনা করে তবেই পারবো কিনা সেটা বলা যাবে। তবে আমি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস রাখি। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা ফেডারিক অবাক চোখে ফান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফ্রান্সিস বলল, আপনার কাছে আমি কয়েকটা কথা জানতে চাই।
-বলুন।
—কাউন্ট রজার তাঁর রাজত্বকালে কী কী তৈরি করিয়েছিলেন?
—এখানে আর কাতানিয়ার দুটো গীর্জা আর যে বিরাট বাড়িটা কাতনিয়ার তৈরি করাবার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সেই বাড়িটা। তারপরেই উলি মারা যান। রাজা বললেন।
—অসুস্থতার সময় কোথায় ছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
—কাতনিয়ার সময় কোথায় ছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
—কাতনিয়ার ঐ বাড়িটায়। অবশ্য দুদিন পরেই তাঁকে এখানে নিয়ে আসা হয়। এখানকার রাজবাড়িতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
ফ্রান্সিস চুপ করে শুনল। তারপর বলল, আজকে আমরা জাহাজে ফিরে যাবো। এই দুর্গে আমাদের একটা থাকবার জন্যে ঘর দেবেন। কাল থেকে আমরা তিনজন এখানেই থাকবো। আর একটা কথা, মোরাবিত আর সাভোনা আমাদের সঙ্গে থাকবেন। ওঁদের সাহায্য আমাদের খুবই প্রয়োজন।
