—মোরাবিত। ও আমার সন্তানের মতো। সাভোনা বলল।
—হুঁ। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল, কী হয়েছিল অল্প কথায় বলুন তো।
লোকটি বলতে লাগল, আমরা লিপারি দ্বীপ থেকে সিসিলি আক্রমণের জন্যে তৈরি হইচ্ছলাম। তার আগেই রাজা ফ্রেডারিকের সৈন্যরা দুটো জাহাজে চড়ে এলো। লিপারি দ্বীপে আমাদের আক্রমণ করল। আমরা হেরে গেলাম। সৈন্যরা আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিল। ভীষণ আহত মোরাবিতকে কাঁধে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে সমুদ্রতীরে এলাম। পেয়ে গেলাম আমাদের একটা নৌকো। মোরাবিতকে নৌকোয় শুইয়ে দিয়ে আমিও পাশে শুয়ে পড়লাম যাতে রাজার সৈন্যরা আমাদের দেখতে না পায়। নৌকো। সমুদ্রের জলে ভাসতে ভাসতে চলল। তারপর—লোকটি থামল।
—হুঁ। ফ্রান্সিস একটু ভেবে নিয়ে বলল, দেখুন, আমরা ভাইকিং-বিদেশি। মোরাবিত আর আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি আপনারা অসুস্থ ও বিপন্ন বলে। কিন্তু আপনাদের দেশের কোনো ব্যাপারের সঙ্গে আমরা নিজেদের জড়াতে চাই না। তাই আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই অঞ্চল থেকে চলে যেতে চাইছি। কিন্তু আপনারা জাহাজে থাকলে তো আমাদেরও জাহাজ থামিয়ে অপেক্ষা করতে হয়।
সাভোনা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ঠিক আছে। মোরাবিত কাল নাগাদ একটু সুস্থ হলে আমরা আপনাদের জাহাজ থেকে নেমে যাবে।
ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। শুধু শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল, জাহাজের পাল নামিয়ে নোঙর ফেলতে বলল। জাহাজ এখানেই থামিয়ে রাখতে হবে। অন্তত কাল অবধি।
মারিয়া সাভোনাকে বলল, আসুন, আপনাদের দুজনকেই খেতে দেব। সাভোনা আস্তে আস্তে উঠল। মারিয়ার সঙ্গে চলে গেল খাবার ঘরের দিকে।
রাত শেষ হয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস হ্যারি শুতে চলে গেল। ফ্রান্সিসের ঘুম আসতে একটু দেরি হলো। ওর মাথায় নানা চিন্তা।
ভোর হলো। ফ্রান্সিসদের জাহাজ থেমেই আছে। হ্যারি বরাবরই খুব ভোরে ওঠে। হ্যারি জাহাজের ডেকে উঠে এলো। অনেক ভাইকিং বন্ধু ডেকের এখানে-ওখানে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে।
সবে সূর্য উঠেছে। সমুদ্রে আকাশে হালকা নরম রোদ ছড়ানো। হ্যারি লিপারি দ্বীপের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠল। দেখল দুটো যুদ্ধজাহাজ ওদের জাহাজের দিকে আসছে। বেশ দ্রুতই আসছে।
হ্যারি চিৎকার করে বলল, এই সবাই উঠে পড়ো। তারপরই ছুটল নীচে নামার সিঁড়ির দিকে। ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের দরজায় ঘা দিয়ে ডাকল, ফ্রান্সিস ! ফ্রান্সিস !
মারিয়া জেগেই ছিল। ও ছুটে এসে দরজা খুলে দিল। ফ্রান্সিস ও ততক্ষণে উঠে পড়েছে। হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস, ডেক-এ এসো। দুটো যুদ্ধজাহাজ আমাদের জাহাজের দিকে আসছে।
বলো কি? ফ্রান্সিস বিছানা থেকে লাফিয়ে নামল। ছুটল ডেক-এ সিঁড়ির দিকে।
ডেক-এ তখন ভাইকিং বন্ধুরা জড়ো হয়েছে। ফ্রান্সিসকে দেখে বিস্কো বলল, ফ্রান্সিস, এখন কী করবে?
—দাঁড়াও, দেখি। ফ্রান্সিস তাকাল জাহাজ দুটোর দিকে। জাহাজ দুটো তখন অনেক কাছে চলে এসেছে। সৈন্যরা জাহাজের রেলিঙের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রীক সৈন্যদের মতো মাথায় শিরস্ত্রাণ, বুকে লোহার বর্ম। ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হলো যে জলদস্যুর দল নয়। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা হলো এরা কারা? ওদের জাহাজের দিকে আসছে কেন?
ফ্রান্সিস, আমরা আগেই লড়াইয়ে নামবো না—দেখি এদের উদ্দেশ্য কী? হ্যারি বলল।
—আমিও তাই ভাবছি। ফ্রান্সিস বলল।
তারপর ডেক-এ জড়ো হওয়া বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলল,ভাইসব, আমরা আগেই লড়াইয়ে জড়াবো না। এরা কারা, কী চায় আগে শুনি সব।
বন্ধুরা লড়াইয়ের জন্যে তৈরি হচ্ছিল মনে মনে। ফ্রান্সিসের কথা শুনে ওরা একটু হতাশ হলো। হতাশা চাপা থাকলো না বিস্কোর কথায়। বিস্কো বলল, যদি এই সৈন্যরা নিরস্ত্র আমাদের হত্যা করে?
ফ্রান্সিস বলল, আমরা এখনও তা মনে হচ্ছে না। তবু সবাই অস্ত্র আনো। অস্ত্র নিয়ে ডেক-এ একপাশে দাঁড়াও। আমার আর হ্যারির তলোয়ার দুটোও এনো।
সবাই ছুটল অস্ত্রঘরের দিকে। ভাইকিংদের ছুটোছুটিতে কথাবার্তায় মারিয়া বুঝল কিছু একটা হয়েছে? ও দ্রুতপায়ে ডেক-এ উঠে এলো। ওদিকে মোরাবিতের পাশে সাভোনা ঘুমিয়েছিল। ভাইকিংদের ডাকাডাকি ছুটোছুটির শব্দে ওর ঘুম ভেঙে গেল। ও উঠল, দেখল মোরাবিত তখনও ঘুমিয়ে আছে। ও মোরাবিতকে আর ডাকল না। কেবিনঘরের বাইরে এলো। সিঁড়ি বেয়ে ডেক-এ পা রেখেইও চমকে উঠল। রাজা ফ্রেডারিকের জাহাজ। সামনের জাহাজের ডেকে-এ দাঁড়িয়ে আছে রাজা ফ্রেডারিকের প্রধান সেনাপতি এলাইমা। সাভোনা। সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করল। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। ছুটল নিজেদের কেবিনের দিকে।
ওদিকে সেনাপতি এলাইমো যে জাহাজে ছিল সেই জাহাজটা ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায়ে এসে লাগল। ফ্রান্সিসদের জাহাজটা ঝাঁকুনি খেয়ে দুলে উঠল। এলাইমো এক লাফে ফ্রান্সিসদের জাহাজে রেলিং ধরে ডেক-এ উঠে এলো। পেছনে পেছনে আরো কয়েকজন সৈন্য।
এলাইমো এগিয়ে এলো ফ্রান্সিস,হ্যারি আর মারিয়ার দিকে। এলাইমো দীর্ঘদেহী। বলিষ্ঠ। মুখে দাড়িগোঁফ। বেশ সযত্নে ছাঁটা। বলল,—আপনারা কারা? কোত্থেকে আসছেন? লো ল্যাতিন ভাষা। হ্যারি এক পা এগিয়ে এসে বলল,আমরা ভাইকিং। ক্রীট দ্বীপ থেকে ফিরছি।
সশস্ত্র ভাইকিংদের দেখে এলাইমো মৃদু হাসল। বলল, শুনেছি আপনারা বীরের জাতি। আমাদের সঙ্গে লড়াই চান?
