—বেঁচে আছে। আমি হাত তুলতে দেখেছি। ফ্রান্সিস বলল।
—কী করবে এখন? হ্যারি বলল।
—যে দেশেরই হোক, মানুষ তো। ফ্রান্সিস বলল, ওদের বাঁচাতে হবে। বিস্কো, এক্ষুণি যাও। নৌকোটো টেনে নিয়ে এসো। কিন্তু আমাদের নৌকোয় চড়ে যেও না। বলা যায়না হয়তো রাজা ফ্রেডারিকের সৈন্যরা এদিকে নজর রাখছে। সাঁতরে যাও।
বিস্কো জাহাজের হালের দিকে চলে গেল। ঝোলানো দড়িদড়া ধরে ধরে আস্তে সমুদ্রের জলে নামল। জলে বেশি শব্দ না করে সাঁতরে চলল নৌকোটার দিকে।
নৌকোর কাছাকাছি পৌঁছে বিস্কো ঠিক করল আগেই নৌকোর মধ্যে উঁকি দেবেনা। বলা যায় না ভেতরে যে দুজন লোক আত্মগোপন করে আছে তারা হয়েতো সশস্ত্র। চমকে উঠে হয়তো ওকে আক্রমণও করতে পারে। বিস্কো তত তলোয়ারই আনেনি।
বিস্কো নৌকাটার পেছন দিকে গেল। নৌকোর গায়ে হাত রেখে একটু বিশ্রাম করল। নৌকোর পেছন দিকটা লম্বাটে নয়, চ্যাপ্টামতো। এই ভূমধ্যসাগর এলাকায় এরকম নৌকোই লোকেরা ব্যবহার করে। ওখান থেকে একটা দড়ি ঝুলছিল। বিস্কো দড়িটা নিয়ে দাঁতে চেপে ধরল। তারপর সাঁতরে চলল ওদের জাহাজের দিকে। নৌকোটাও ভেসে চলল সঙ্গে সঙ্গে।
নৌকোটা জাহাজের গায়ে এসে লাগল। এবার দেখা গেল দুজন লোক নৌকোটার গলুইয়ে শুয়ে আছে। মড়ার মতো। হ্যারি একটু গলা চড়িয়ে লো ল্যাতিন ভাষায় বলল তোমাদের কোনো ভয় নেই। দড়ি ফেলা হচ্ছে, দড়ি ধরে ধরে উঠে এসো। লোক দুজনের মধ্যে একজন আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। অল্প আলোয় দেখা গেল লোকটি বয়স্ক। মুখে কাঁচাপাকা দাঁড়িগোফ। লোকটি নৌকো থেকে মুখ তুলে বলল, আমি মোটামুটি সুস্থ। কিন্তু সঙ্গের যুবকটি বেশ আহত। ও দড়ি ধরে উঠতে পারবে না। এবার বিস্কো নিশ্চিন্ত হলো—লোক দুটো সশস্ত্র নয়। বিস্কো নৌকোটায় উঠল। ওদিকে শাঙ্কোরা কয়েকজন মিলে জালের মতো বাঁধা দড়ি জাহাজ থেকে নামিয়ে দিল। বিস্কো আহত যুবকটিকে ধরে দাঁড় করাল। তারপর দড়ির জালে বসিয়ে দিল। আহত যুবকটি গোঙরাতে শুরু করল। ওপর থেকে শাঙ্কোরা দড়ির জালে বসে থাকা যুবকটিকে আস্তে আস্তে জাহাজের রেলিঙের ওপর দিয়ে তুলে এনে ডেক-এনামাল। আহত যুবকটি দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ডেক এই শুয়ে পড়ল। এবার জাহাজের কাঁচঢাকা চৌকোণো লণ্ঠনের আলোয় ফ্রান্সিস হ্যারি যুবকটিকে দেখেই পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। যুবক সেই বিদ্রোহী নেতা। ঘাড়ের ওপর ঝুলে-পড়া মাথার চুল। এখন বুকে বর্ম পরা নেই। খালি গা। হাত-কাঁধ-মুখ-কপাল ক্ষতবিক্ষত। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল, শিগগির বৈদ্যকে ডেকে আনে। ওদিকে বিস্কো আর বয়স্ক লোকটি দড়ি বেয়ে জাহাজে উঠে এসেছে। বিস্কো তাড়াহুড়োতে একটা মারাত্মক ভুল করল। যুবক আর লোকটি যে নৌকোয় ভাসছিল সেই নৌকোটা বিস্কো দড়ি দিয়ে ওদের জাহাজে গায়ে বেঁধে রেখে এলো। তখন ফ্রান্সিস হ্যারি রা আহত যুবকটিকে নিয়ে ব্যস্ত। ওরা এটা লক্ষ্য করল না।
জাহাজের বৈদ্য ওষুধের ঝোলা নিয়ে এলো। আহত যুবকটির ক্ষতগুলো পরীক্ষা করল। বৈদ্যকে ফ্রান্সিস বলল, কেমন দেখলে?
—তলোয়ার বর্শার ঘায়ে কেটে গেছে। বেশি রক্ত পড়েছে তাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভয়ের কিছু নেই। বৈদ্য ঝোলা খুলল। চিনেমাটির বোয়াম বের করল। চটচটে আঠার মতো হলুদরঙা ওষুধ ক্ষতস্থানে আস্তে আস্তে লাগিয়ে দিল। যুবকটি কঁকিয়ে উঠেই শান্ত হলো। ওর মৃদু গোঙানি বন্ধ হলো। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল, একে তোমরা সাবধানে নিয়ে যাও। কোনো কেবিনে রেখো। মারিয়াকে বলো ও যেন যুবকটির দেখাশুনো করে।
শাঙ্কোরা কয়েকজন মিলে যুবকটিকে কাঁধে করে নিয়ে গেল।
বয়স্ক লোকটি তখন ডেক-এ বসে পড়েছে। বোঝা গেল ভীষণ ক্লান্ত লোকটি। ফ্রান্সিস একবার দেখল লোকটিকে। লোকটির পরনে সাধারণ চাষিীর পোশাক। ফ্রান্সিস এবার হ্যারিকে মৃদুস্বরে বলল,হ্যারি চিনতে পেরেছো যুবকটিকে?
—হ্যাঁ। সেই যে বক্তৃতা দিচ্ছিল, বিদ্রোহী নেতা।
—কী করবে এখন? ফ্রান্সিস বলল।
-–ও ভীষণ আহত। বিপন্নও। ওকে তো আশ্রয় দিতেই হবে। চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তো ওকে রাখতেই হবে। হ্যারি বলল।
—বুঝলাম এটা আমাদের মানবিক কর্তব্য। কিন্তু পরাজিত আহত এই বিদ্রোহী নেতাকে ফ্রেডারিকের সৈন্যরা নিশ্চয়ই খুঁজে বেড়াবে। যদি আমাদের জাহাজ খানাতল্লাশি করতে আসে? ফ্রান্সিস বলল।
—কিন্তু ওরা কী করে বুঝবে যেযুবকটিআমাদের জাহাজেই আশ্রয় নিয়েছে?হ্যারি বলল।
তা ঠিক। যাক গে, কালকের দিনটা দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
এ সময় মারিয়া ডেক-এ উঠে এলো। ফ্রান্সিসের কাছে এসে বলল, আহত যুবকটি এখন একটু ভালো আছে। ওর সঙ্গের লোকটি কোথায়?
ফ্রান্সিস ডেক-এ বসা লোকটিকে দেখাল। মারিয়া লোকটির কাছে গেল। স্পেনীয় ভাষায় বলল, আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন? লোকটি মাথা নেড়ে স্পেনীয় ভাষায় বলল, আমি আসলে স্পেনীয়। অনেকদিন আগে জাহাজডুবি হয়ে এই সিসিলিতে এসেছিলাম। ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হলো। লোকটির সঙ্গে কথা বলে সব জানা যাবে।
ফ্রান্সিস ও হ্যারি লোকটির কাছে এলো। ফ্রান্সিস বলল, আপনার নাম কী?
—সাভোনা। লোকটি আস্তে বলল।
—ঐ যুবকটি তো বিদ্রোহী নেতা?
সাভোনা একটু আশ্চর্য হলো। বলল—আপনারা জানলেন কী করে?
—যে ভাবেই তোক জানতে পেরেছি। যুবকটির নাম কী?
