সেদিন বিকেলে ওরা আবার দুর্গে গেল। সম্রাটের সজ্জাকক্ষে ঢুকল ওরা। ফ্রান্সিস আবার চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। ছবিটা ছিল মারিয়ার হাতে। মারিয়া ছবিটা দেখবার জন্যে চামড়ার গোটানোটা খুলে মেলে ধরল। যাঃ উল্টেমুখো হয়ে রয়েছে। মারিয়া ছবিটা সোজা করতে গিয়ে একেবারে ঝুলন্ত ফুলদানিটার দিকে তাকাল। আরে?
মারিয়া চমকে উঠল। ছবিটা সোজা করল না। মিলিয়ে দেখল মুকুটটা ওল্টালে ঠিক ফুলদানির মতো দেখাচ্ছে। ঠিক তখনই ফ্রান্সিসকে গলা চড়িয়ে বলল—সম্রাটের ভাগ্য সুতোয় ঝোলে। কাভাল্লি, ফুলদানিটাও সুতোয় ঝুলছে। মারিয়া ছুটে ফ্রান্সিসের কাছে এলো। উল্টে রাজমুকুটের ছবিটা আর ফুলদানিটা আঙুল দিয়ে দেখাল। ফ্রান্সিস একমুহূর্ত ভাবল। তারপর উত্তেজিত স্বরে বলল-কাভাল্লি ফুলদানিটা নামাও। কাভাল্লি একটা পাথরের পাটাতনের ওপর উঠে আস্তে আস্তে ফুলদানিটা সুতোর জাল থেকে খুলে নামাল। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি ফুলদানিটা হাতে নিল। ভেতর থেকে ফুল পাতা তুলে নিলে। দেখা গেল ছবিতে যে সোনার পালকটা মুকুটের মাথায় আঁকা আছে সেটা ফুলদানিটার মধ্যে রাখা। ফ্রান্সিস ফুল-পাতা রেখে সোনার পালকটা ভেতর থেকে তুলে নিল। দেখা আবার হাত ঢোকাল। তুলল মুকুটের পালকের ঠিকনীচেই যে রক্তপ্রবালের ছবিটা রয়েছে সেই চৌকাণো রক্তপ্রবাল। তারপর আবার হাত ঢোকাল। তুলল পাতলা সোনার দোমড়ানো পাতার কিছু অংশ। সেসব মারিয়ার হাতে দিল। ফ্রান্সিস হেসে উঠল। ফুলদানিটা উঁচু করে তুলে চেঁচিয়ে বলল—মারিয়া, হ্যারি, এটাই সেই নিখোঁজ রাজমুকুট। ফ্রান্সিস এবার আস্তে আস্তে ফুলদানির গাঢ় সবুজ রঙের ঢাকানাটা খুলতে লাগল। দেখা গেল চুনী পান্না আর দামি দামি পাথর বসানো ওটার গায়ে। সেসবের চারদিকে নীল সবুজ মীনে করা। যখন সবটার ঢাকনা খোলা হলো, দেখা গেল চুনী পান্না নীলকান্তমণি দামি পাথর বসানো রাজমুকুট। দেয়াল আটকানো মশালের আলো পড়ল রাজমুকুটে। চুনী পান্না নীলকান্তমণি দামি পাথর সব ঝিকমিকিয়ে উঠল। আলো ঠিকরোচ্ছে। কী অপরূপ সুন্দর সেই রাজমুকুট।
কিছুক্ষণ কারো মুখে কোনো কথা নেই। অবাক হয়ে ওরা রাজমুকুটটা দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস মারিয়ার হাত থেকে শীর্ষপালকটা নিল। মুকুটের মাথায় যেখানে লাগানো ছিল সেখানে ধরল। বলল—মারিয়া ছবির মতো রক্তপ্রবালটা রাখো। সোনার পালক আর রক্তপ্রবাল রাখা হলে দেখা গেল হুবহু ছবির মতো রাজমুকুটটা। সোনার পালক, রক্তপ্রবাল মুকুটের মধ্যে রেখে দিয়ে ফ্রান্সিস বলল—শেষ বাইজেনস্টাইন সম্রাট শেষবারের মতো এই সজ্জাকক্ষে ঢুকেছিলেন। কাভাল্লিকে ঢুকতে দেননি। দরজা বন্ধ করে কাঁচের আধার থেকে মুকুটটা বের করেছেন। সোনার পালক মুকুট থেকে খুলে নিয়েছেন। মুকুটের ভেতরে রেখেছেন। এবার মুকুটের মতো ঠিক একই মাপে তৈরি করা ফুলদানিটা সুতোর জাল থেকে নামিয়েছেন। কাপড়ের ঢাকনা খুলেছেন। কাপড়ের ফুল পাতা তুলে নিয়েছেন। তারপর ঐ পাতলা সোনার চাদরে তৈরি ফুলদানিটা সহজেই দুমড়ে মুচড়ে রাজমুকুটের মধ্যে রেখেছেন। তার ওপর রেখেছেন ফুলপাতা। এবার ঢাকানায় মুকুটটা ভরে সুতোর জালে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। ফুলদানি আগেই ছিল। কাজেই কারো মনেই ফুলদানিটা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। ফুলদানিটাকে কেউ কোনো গুরুত্বই দেবে না। কিন্তু সম্রাটের সেই লেখা কথাটা সম্রাটের ভাগ্য সুতোয় ঝোলে—এই কথাটাই আমার দৃষ্টি টানল ঝুলন্ত ফুলদানির দিকে। তখনই মারি ছবিটা উল্টো করে দেখাল। সব পরিষ্কার হয়ে গেল। ঝুলন্ত ফুলদানিটাই নিখোঁজ রাজমুকুট। কাভাল্লি আস্তে আস্তে রাজমুকুটটার কাছে গেল। দুহাতে মুকুটটার গায়ে হাত বুলোত বুলোতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। শেষ সম্রাটের স্মৃতিও কোনোদিন ভুলতে পারবেনা।
ওদিকে রাজমুকুট পাওয়া গেছে দেখে সজ্জাকক্ষের রক্ষীরা ছুটল রাজা বানিফেসকে খবর দিতে। একটু পরেই রাজা বোনিফেস দ্রুতপায়ে সজ্জাকক্ষে ঢুকল। পাথরের টেবিলের ওপর মুকুটটা রেখেছিল ফ্রান্সিস রাজা বোনিফেস মুকুটটা দু’হাতে উঁচু করে তুলে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল-হা-হা-হা। মুকুটটা হাতে নিয়ে পাগলের মতো ঘরময় পায়চারি কপি করতে লাগল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে যা যা করতে হবে বলল। রাজার কিন্তু খেয়ালই নেই যে যারা নিখোঁজ রাজমুকুট খুঁজে বের করে দিল তারা তারই সামনে দাঁড়িয়ে। হ্যারি একটু গলা চাড়িয়ে বলল—রাজা, আমাদের কিছু কথা ছিল। এতক্ষণে ওদের দিকে রাজার দৃষ্টি পড়ল। রাজা বলল, হুঁ বলো।
আমরা নিখোঁজ রাজমুকুট খুঁজে বের করে দেব বলেছিলাম, তা দিয়েছি। এবার আমাদের একটা অনুরোধ। হ্যারি বলল।
এজন্যে তোমাদের আমি কিছু দিতে পরবো না। রাজা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
আমরা কিছু চাইও না। শুধু অনুরোধ—এই সজ্জাকক্ষের দেখাশোনার দায়িত্ব যেন কাভাল্লিকেই আবার দেওয়া হয়।
কিন্তু ওকে কি বিশ্বাস করা যায়? রাজা বলল।
হ্যাঁ যায়। কাভাল্লি সৎ ও বিশ্বস্ত।
—ঠিক আছে। রাজা মাথা নাড়ল।
ফ্রান্সিস বলল—এবার চলো।
ওরা যখন দুর্গের বাইরে এসেছে তখন কাভাল্লি ছুটে এলো। বলল—চলুন জাহাজঘাটা পর্যন্ত আমি যাই। আপনারা আমার জন্যে এত করলেন।
জাহাজে উঠতে উঠতে ফ্রান্সিস হেসে বলল—মারিয়া, এবারও আমাদের হাত শূন্য। মারিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বলল—এ জন্যে আমার বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই।
