কাভাল্লি ওদের সজ্জাকক্ষের সামনে নিয়ে এলো। দুজন পাহারাদার সৈন্য চকচকে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরই একজন কাভাল্লিকেও ফ্রান্সিসদের দেখে দরজা খুলে দিল। দরজার কাঠ নানারঙের নকশায় চিত্রিত। ওরা ভেতরে ঢুকল। ফ্রান্সিসের নাকে জেসমিনের মৃদু গন্ধ ভেসে এলো। ঘরটির দেয়ালে মেঝেয় অতি সুন্দর মোজেকের কাজ। গাছ লতাপাতা পাখি। সামনেই বেশ বড়ো একটা আয়না দেয়ালে আটকানো। আয়নার সামনে পাথরের টেবিল। রেশমী কাপড়ে ঢাকা। সেই ঢাকনার কাপড়েও নানা রঙের সুতোর কাজ। তার ওপরে সাজিয়ে রাখা রাজদণ্ড, খাপে ঢাকা তলোয়ার। তলোয়ারের খাপে দামি পাথর বসানো মীনে করা। হাতল হাতির দাঁতের। রাজদণ্ডে কত দামি পাথরের কাজ। নিরেট সোনার সেই রাজদণ্ড। কারুকাজ করা খাপে ঢাকা ছোরা। সম্রাটের ব্যবহৃত হীরে পান্নার কত ছোটো বড়ো হার। সোনার কাজকরা কোমরবন্ধনী। সম্রাটের দুটো পোশাকেও পাথর বসানো সোনার সরু পাতের কাজ। ফ্রান্সিসরা অবাক হয়ে এই মূল্যবান জিনিসগুলো দেখল। বোঝাই যাচ্ছে শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট কিছুই নিয়ে যাননি। শুধু গোপনে কোথাও রেখে গেছেন রাজমুকুটটা।
ফ্রান্সিস ঘরের চারদিকে দেখতে লাগল। একপাশে একটা লম্বা কাঠের সিন্দুক। ফ্রান্সিস সিন্দুকের ডালাটা খুলল। দেখল সম্রাটের পোশাক। সাধারণ দামি দু’ধরনের পোশাক। ফ্রান্সিস কাভাল্লিকে ডাকল। কাভাল্লি কাছে এলো বলল—এই পোশাকগুলো সব তোলো তো। কাভাল্লি সম্রাটের পোশাকগুলো তুলতে লাগল। হ্যারি আর মারিয়াও হাত লাগল। সব পোশাক তোলা হলে দেখা গেল সিন্দুকটা ফাঁকা। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। সব পোশাক আবার রেখে দেওয়া হল। ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাতেই ফ্রান্সিসের চোখে পড়ল কোণার দিকে কী যেন ঝুলছে। ও কাভাল্লিকে বলল—ওটা কী? কাভাল্লি হেসে বলল সম্রাটের খেয়াল। একটা সোনার পাতলা পাত দিয়ে সম্রাট ফুলদানি তৈরি করিয়েছিলেন। তারপর নিজের হাতে ফুল-পাতা কেটে তৈরি করে এ ফুলদানিতে বসিয়ে দিয়েছিলেন। সম্রাট ঐ ফুলদানিতে প্রতিদিন একটু একটু আতর ঢালতেন। বলতেন, এটা আমার ব্যাবিলনের শূন্যেদান। একটু খেয়াল করে দেখুন এখনো জেসমিন ফুলের গন্ধ পাবেন। ফ্রান্সিস ঝুলন্ত ফুলদানিটার কাছে এলো। দেখল—একটা গাঢ় সবুজ রেশমী কাপড়ে ফুলদানিটা ঢাকা। নানারঙের সুতোয় বোনা একটা জালমত ছাদ থেকে ঝুলছে। তারই ভেতর ফুলদানিটা বসানো। নানারঙের কাপড় কেটে তৈরি ফুল-পাতা ফুলদানি থেকে বেরিয়ে আছে। ফ্রান্সিসরা ফুলদানিটা দেখে বেশ আশ্চর্য হলো। সম্রাটের খেয়ালের নমুনা। ফুল-পাতাগুলো এত সুন্দরভাবে কেটে তৈরি করা মনে হচ্ছে যেন সতেজ। বেগুনি ফুল সবুজ পাতা। ফ্রান্সিস ভেবে পেল না এখানে কী করে কোথায় সম্রাট রাজমুকুট লুকিয়ে রেখে গেছেন।
এবার ফ্রান্সিস সবাইকে নিয়ে সজ্জাকক্ষের বাইরে এলো। একজন সৈন্য দরজাটা বন্ধ করে দিল। ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকাল। বলল—অন্দরমহলে তো আমরা যেতে পারবো না। মারিয়া যাও। সব খুঁটিয়ে দেখে আসবে। বিশেষ করে সম্রাজ্ঞীর সজ্জাকক্ষটা। মারিয়া চলে গেল। ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে মারিয়া ফিরে এলো। বলল—অন্দরমহল ভালো করে দেখেছি। সম্রাজ্ঞীর সজ্জাকক্ষে সম্রাজ্ঞী কিছুই রেখে যাননি। সেখানে বর্তমান রানী তার পোশাকপত্র অলঙ্কার এসব রেখেছে। কিন্তু মুকুট লুকিয়ে রাখার জায়গা সেখানে নেই। ফ্রান্সিস একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—কালকে আবার দেখতে হবে।
সবাই জাহাজে ফিরে এলো। ভাইকিং বন্ধুরা শুনল, নিখোঁজ রাজমুকুট পাওয়া যায়নি। রাতে ফ্রান্সিসরা আবার মুকুটের ছবিটা নিয়ে বসল। ফ্রান্সিস বার বার বলল—ছবিটা থেকে নিশ্চয়ই কোনো সূত্র পাওয়া যাবে। হ্যারি হতাশস্বরে বলল ছবিটার নীচে নিশ্চয়ই কিছু লেখা আছে। কিন্তু কিছুতেই পাঠোদ্ধার করতে পারছি না। আলো জ্বলছে দেখে কাভাল্লি তখনই কেবিনঘরে ঢুকল। হ্যারি বলল—আচ্ছা কাভাল্লি, তুমি তো অনেকদিন এই খানিয়ায় ছিলে। তুমি কোনো বিদ্বান পণ্ডিত কাউকে চেন। কাভাল্লি একটু ভাবল। বলল—একজনকে জানি, প্যালিওলোগ—খুব পণ্ডিত মানুষ। সম্রাট মাঝে মাঝে তাকে ডেকে পাঠাতেন। কয়েকবার আমাকেও ডাকতে পাঠিয়েছেন। হ্যারি প্রায় লাফিয়ে উঠল। বলল—তুমি আমাদের কাল সকালেই প্যালিওলোগের বাড়ি নিয়ে চলো।
বেশ তো নিয়ে যাবো–কাভাল্লি বলল।
পরদিন একটু বেলায় কাভাল্লি ফ্রান্সিসদের প্যালিওলোগের বাড়ি নিয়ে গেল। প্যালিওলোগ বাইরের একটা ছোটো ঘরে একটা গদিওয়ালা আসনে বসেছিলেন। সামনে একটা পাথরের পাটাতন। তাতে কিছু সাদা পাতলা চামড়া রাখা, চিনেমাটির দোয়াত, পাথর বড়ো পালকের কলমও রয়েছে। প্যালিওলোগ বেশ বৃদ্ধ। মাথায় চুল দাড়ি গোঁফ ভুরু সব পাকা। পরনে ঢিলেঢালা জোব্বা। হ্যারি গ্রীক ভাষায় নিজের পরিচয় দিল। তারপর রাজমুকুটের ছবিটা তার সামনে রাখল। বলল—ছবিটার নীচে লতাপাতা ফুলের মধ্যেই নিশ্চয়ই কিছু লেখা আছে। প্রাচীন গ্রীক ভাষা যদি আপনি পড়তেন। প্যালিওলোগ ছবিটা উঁচু করে ধরলেন। একটুক্ষণ দেখলেন। হেসে বললেন—তুমি ঠিকই ধরেছো। প্রাচীন গ্রীক ভাষায় লেখা—সম্রাটের ভাগ্য সুতোয় ঝোলে। হ্যারি কথাটা বারবার বলল। মনে রাখল। এবার ফ্রান্সিস ও মারিয়াকে যা কথা হলো বলল। শেষে যা লেখা সেটা বলল। ফ্রান্সিস ও কথাটা মনে রাখল। কিন্তু কথাটার সঙ্গে রাজমুকুটের সম্পর্ক বুঝতে পারল না। ওরা জাহাজে ফিরে এলো। সারা দুপুর ফ্রান্সিস কথাটা নিয়ে ভাবল।
