ওরা জাহাজে উঠতেই বিস্কো শাঙ্কো আর ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে এলো। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল—কালকে আমরা খানিয়া নগর ঘুরে বেড়িয়ে দেখবো। পরশু জাহাজ ছাড়বো। তারপর মারিয়াকে বলল—কী? খুশি তো? মারিয়া হেসে উঠল।
কাউন্টরজারের গুপ্তধন
সেদিন সকালে খানিয়া নগর ঘুরে বেড়াবার জন্যে ভাইকিংদের মধ্যে তোড়জোড় শুরু হলো। সকালের খাবার ফ্রান্সিস আর মারিয়া কেবিনঘরে বসেই খেল। এবার মারিয়া চামড়ার দুটো বড়ো পেটী খুলল। ফ্রান্সিসের জন্যে যে ভালো দুটো পোশাক এনেছিল তা একটা খুঁজে বের করল। পোশাক দেখে ফ্রান্সিস হেসে বলল, এ তো তোমাদের বাড়িতে, মানে রাজবাড়িতে নাচের আসরে যাবার পোশাক।
—আমরা খানিয়া নগর ঘুরে বেড়াতে যাচ্ছি। আজকে অন্তত ভালো পোশাকটা পরো। সবসময় তো ঐ লড়াইয়ের পোশাকটা পরে থাকো। মারিয়া বলল।
—মারিয়া, আমরা ভাইকিং। এটাই আমাদের উপযুক্ত পোশাক। জীবনটাই তো একটা লড়াই। ফ্রান্সিস বলল।
খুব হয়েছে। নাও পরো এটা। মারিয়া হেসে বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যে হ্যারি, বিস্কো, শাঙ্কো আর অন্য সব ভাইকিংরা যে যার ভালো পোশাক পরে তৈরি হয়ে জাহাজের ডেক-এ এসে সে জড়ো হলো। জাহাজের জীবন বড়ো একঘেয়ে। দিনরাত চারদিকে সীমাহীন সমুদ্রে মাটির দেখা পাওয়ার জন্যে, মাটিতে নামার জন্যে ওরা আকুল হয়ে থাকে। আজকে শুধু মাটিতে নামা নয়, মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানো। যুদ্ধনয়, শান্তির দিন আজ। ওরা সাগ্রহে ফ্রান্সিস ও মারিয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
একটু পরেই সুন্দর পোশাক পরে ফ্রান্সিস ও মারিয়া ডেক-এ উঠে এলো। মারিয়া পরেছে হালকা গোলাপি রঙের পায়ের পাতা পর্যন্ত ঢাকা গাউন। মারিয়াকে আজকে দেখতে রাজকুমারীর মতোই লাগছে। অবশ্য দীর্ঘদিন সমুদ্রে জাহাজে থাকার জন্যে মারিয়ার গায়ের রঙ আগের মতো গোলাপিফর্সা নেই। একটু যেন তামাটে হয়ে গেছে। ওরা দুজনে আসতেই ভাইকিং বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো। এটা ওদের আনন্দে, ধ্বনি, প্রতিজ্ঞার ধ্বনি, আবার প্রতিবাদেরও ধ্বনি।
এমন সময় দেখা গেল কাভাল্লি জাহাজের পাটাতন দিয়ে উঠে আসছে। ওকে দেখে ফ্রান্সিসরা সকলেই খুশি হলো। কাভাল্লি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। হেসে বলল, কালকেই শুনেছি আপনারা আজ খানিয়া নগরে ঘুরে বেড়াবেন। আপনারা তো চেনেন না, তাই আমি এলাম। সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবো আপনাদের।
—এ তো ভালোই হলো। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
সবার আগে জাহাজের ফেলা পাটাতন দিয়ে কাভাল্লি, ফ্রান্সিস ও মারিয়া জাহাজঘাটায় নামল। পেছনে একে একে আর সব বন্ধুরা নামল। কাভাল্লি সবাইকে নিয়ে নগরের রাস্তা ১ দিয়ে চলল। পথের লোকজন দোকানদারেরা অনেকেই ফ্রান্সিসদের এই দলকে দেখল। তারা ভেবে পেলনা এরকম পোশাকপরা লোকগুলো কোন দেশের! বিশেষকরে মহিলারা মারিয়াকে বারবার দেখতে লাগল। এরকম মেয়েদের পোশাক ওরা কখনও দেখেনি। দল বেঁধে হৈ হৈ করে চলল ওরা।
প্রথমে কাভাল্লি ওদের নিয়ে গেল বিরাট দুৰ্গটায়। রাজা বোনিফেস-এর বাসস্থান আর সভাগৃহ এখানে। কাভাল্লি সবাইকে নিয়ে দুর্গের মধ্যে ঢুকল। ফ্রান্সিস, মারিয়া, হ্যারি দুর্গটা আগেই ভালো করে দেখেছে। ওরা দুর্গের প্রধান প্রবেশদ্বারে বন্ধুদের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
দুর্গ দেখা হলে কাঙাল্লি ওদের নিয়ে চলল। একটা ছোটো অ্যাম্ফিথিয়েটার দেখাতে। খুব বেশি বড়ো নয় সেটা। চারদিকে পাথরে দেয়াল। প্রধান প্রবেশদ্বার নিয়ে ওরা ভেতরে ঢুকল। দেখল চারদিকে গোল করে পাথরে বসার জায়গা। মাঝখানে গোল জায়গা। কাভাল্লি ঐ জায়গাটা দেখিয়ে বলল, এটাকে বলে এরেনা। এখানে তলোয়ারের লড়াইয়ের প্রতিযোগিতা হয়। রাতে মশালের আলোয় নাটকও অভিনীত হয়। তারপরে চলল সবাই উত্তর দিকে। দেখল ছবির মতো সুন্দর একটা হ্রদ। তারপরেই ঘাসে-ঢাকা ছোটো পাহাড়। পাথরে ছড়ানো ছোটো পাহাড়ি ঝর্ণা।
খানিয়া নগর খুব একটা বড়ো নয়। দুপুরের মধ্যেই প্রায় সব দেখা হয়ে গেল। ঘোরাঘুরির জন্যে বেশ খিদেও পেয়েছে সকলের। মারিয়াই প্রস্তাব দিল, এখল জাহাজে ফিরে গিয়ে রান্নবান্নার দরকার নেই। এখানেই কোনো সরাইখানায় খেয়ে নেওয়া যাক।
সব ভাইকিংরা হৈহৈ করে এই প্রস্তুবে রাজি হলো।
কাভাল্লি দুর্গের কাছে এক বড়ো সরাইখানায় এদের নিয়ে গেল। এত খদ্দের পেয়ে সরাইখানার মালিক খুশিতে আটখানা। সবাই টানা কাঠের বেঞ্চিতে বসল। সামনে কাঠের টানা টেবিলমতো। খেতে দেওয়া হলো বড়ো বড়ো গোল রুটি, তরকারি আর গরম গরম ভেড়ার মাংস। সবাই ক্ষুধার্ত। হাপুস হুপুস করে খেতে লাগল।
বিকেল নাগাদ ভাইকিংরা হৈহৈ করতে করতে জাহাজে ফিরে এলো। রাতে খাওয়া দাওয়ার সময় ভাইকিংরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, এবার আর কোথাও নয়। সোজা দেশে ফিরবো। দু’একজন বলল, দেখো ফ্রান্সিস কী বলে।
রাত হলো। ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে আছে। ও ভেবে পাচ্ছে না এবার কী করবে? মারিয়া জিজ্ঞেস করল, ফ্রান্সিস, এখন কী করবে?
ফ্রান্সিস হেসে বলল, আমিও ঠিক এই কথটাই ভাবছি। তুমি,আমার বন্ধুরা সবাই তো দেশে ফেরার জন্যে আকুল। আমার কিন্তু দেশে ফিরে অলস সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন কাটাবার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছে করছে না।
