–সুলতান যদি তাই চান, তবে তাই হবে।
ফ্রান্সিসের দলের লোকেদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য জাগল। শেকলে ঝনঝন শব্দ উঠল। কিন্তু কিছুই করবার নেই। তাদের হাত বাঁধা। শেকলের দুটো মুখ দেয়ালে গাথা। সেই সৈন্যটা ফিরে এল। সুলতান বোধহয় অনুমতি দিয়েছে। রহমান জল আর খাবার আনতে হুকুম দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার এল। পিঁপে ভর্তি জল এল।
খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই শুয়ে পড়ল। চোখ জড়িয়ে এল ঘুমে। শুধু কয়েকজন মিস্ত্রীর হাতুড়ি পেটানোর শব্দে মাঝে-মাঝে ওদের ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। মিস্ত্রীরা মোটা মোটা কাঠ পুঁতে কাটা তার দিয়ে ঘিরে দিলো জায়গাটা। এটাই হল ভাইকিংদের বন্দীশালা। বন্দীশালা তৈরী হলে সকলের হাত খুলে দেওয়া হল। বাইরে খিলানওয়ালা দরজার পাশেও মিস্ত্রীরা কাজ করছিল। ফ্রান্সিসের দলের লোকেরা কেউ জানতে পারেনি যে, ওখানে মিস্ত্রীরা একটা ফাঁসিকাঠ তৈরী করছিলো।
রাত্রি গভীর হলো। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু মিস্ত্রীদের হাতুড়ি ঠোকার শব্দ সেই নৈঃশব্দ ভেঙে দিচ্ছিল। ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। দু’হাতে মাথা রেখে সে ওপরের দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর চিন্তার যেন শেষ নেই। হঠাৎ একজন পাহারাদার কাঁটাতারের দরজার কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করল–ফ্রান্সিস কে?
কেউ কোন উত্তর না দিতে লোকটা আবার বললো–ফ্রান্সিস কে?
প্রশ্নটা কয়েকজনের কানে যেতে তারা বললো–ফ্রান্সিসকে কেন?
–সুলতান ডেকেছেন।
এইসব কথাবার্তা কানে যেতে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। সে যাবার জন্যে পা বাড়াল। কিন্তু যাদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, তারা ফের চেঁচিয়ে বলল না ফ্রান্সিস যাবে না। সুলতানকে হয় এখানে আসতে বল।
চিৎকার আর কথাবার্তায় অনেকেরই ঘুম ভেঙে গেল। তারা সবাই একসঙ্গে রুখে দাঁড়িয়ে বললো–না, ফ্রান্সিস একা যাবে না।
এবার কাঁটাতারের দরজার কাছে রহমানের মুখ দেখা গেল। সে হেসে বলল–আমি ফ্রান্সিসকে নিয়ে যাচ্ছি। তোমাদের ভয় নেই, ওর কোন ক্ষতি হবে না।
ফ্রান্সিস হাত তুলে সবাইকে শান্ত করল। পাহারাদার। কাঁটাতারের দরজার তালা খুলে দিল। ফ্রান্সিস বাইরে এসে, রহমানের সামনে এসে বললো–চলুন।
রহমান ওকে সঙ্গে নিয়ে চলল। প্রাসাদে ঢোকার আগে রহমান একবার দাঁড়াল। ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল–সুলতান তোমায় ডাকেননি।
–তবে?
–সুলতানের বেগম তোমাকে ডেকেছেন।
–সুলতানের বেগম তোমাকে ডেকেছেন।
ফ্রান্সিস আশ্চর্য হল। বেগমের উদ্দেশ্য কি? কিন্তু–ফ্রান্সিস বলল–আমার মত একজন বিদেশীকে–
–বেগমের সঙ্গে কথা হোক, তাহলেই জানতে পারবে।
সুসজ্জিত ঘরের পর ঘর পেরিয়ে অন্দরমহলে এল ওরা। অন্দরমহলের জৌলুসে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মেঝের দেয়ালে জাফরী কাটা জানালায় কি সুন্দর কারুকাজ! একসময়ে সিঁড়ি বেয়ে ওরা একটা পুকুরের সামনে এসে দাঁড়াল। পুকুরের চারিদিক শ্বেত পাথরে বাঁধানো। কাঁচের মত শান্ত জল টলটল করছে। পুকুরের ওপাশে বাগানে ফুলের গন্ধে বাতাস ভরে গেছে। বাগানের কাছে একটা দোলনা রূপোর শেকলে বাঁধা। দোলনায় কে যেন বসে আছে। রহমান ফিস ফিস করে বলল–বেগমসাহেবা দোলনায় বসে আছেন।
–একা?
–হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে এই সাক্ষাৎটা খুবই গোপনীয়।
বেগম সাহেবার কাছে গিয়ে রহমান আদাব করে সরে এল। ফ্রান্সিসও রহমানের দেখাদেখি আদাব করল। এখানে মশালের ক্ষীণ আলো এসে পৌঁছেছে, তাতে স্পষ্ট বেগমসাহেবার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তবু ফ্রান্সিস বুঝল, বেগমসাহেবা অপরূপা সুন্দরী। ভুরু দুটো যেন তুলিতে আঁকা। টানা লাল ঠোঁটের পাশে একটা তিল। মশালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠেছে বেগমের পোশাকের সোনার কারুকাজ করা নকশাগুলো।
-–তুমিই ফ্রান্সিস? সুরেলা গলায় বেগমসাহেবা প্রশ্ন করলেন।
–হ্যাঁ, –ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
–তুমি জানো সোনার ঘন্টা কোথায় আছে?
–না।
–কিন্তু সুলতান বলেন, তুমি নাকি সব জানো।
–আমি যা জানি সুলতানকে বলেছি।
–সেই মোহর দু’টোর কথাও বলেছো?
–কোন মোহর?–ফ্রান্সিস আশ্চর্য হল।
–তোমার কাছে যে দুটো মোহর ছিল।
–তার একটা বিক্রি করে দিয়েছি, আর একটা চুরি হয়ে গেছে।
–তুমি জানো, এ দুটো মোহরের একটাতে সেই সোনার ঘন্টার দ্বীপে যাওয়ার, অন্যটাতে ফিরে আসার নকশা খোদাই করা ছিল।
–না, আমি জানতাম না।
–তুমি মিথ্যে কথা বলছে। মোহর দুটো তোমার কাছেই আছে।
ফ্রান্সিসের বেশ রাগ হলো। সে গম্ভীর স্বরে বলল–আমি মিথ্যে কথা বলছি না, বেগম সাহেবা।
–তোমার মৃত্যু তুমি নিজেই ডেকে আনছে।
–তার মানে?
–দেউড়ির খিলানে এতক্ষণে ফাঁসিকাঠ তৈরি হয়ে গেছে।
ফ্রান্সিস চমকে উঠল–তাহলে আমাকে–
-হ্যাঁ, তোমাকে কাল সকালে ফাঁসি দেওয়া হবে।
ফ্রান্সিস কোন কথা বলতে পারল না। একবার মনে হলো, বেগমের কাছে সে প্রাণ ভিক্ষা করে। পরক্ষণেই মনে হল, না আমরা ভাইকিং। আমাদের মৃত্যু ভয় থাকতে নেই।
–আমার বন্ধুদের কী হবে?
–তারা বন্দী থাকবে।
ফ্রান্সিসের মন শান্ত হল। যাক, আমার বন্ধুরা তো বেঁচে থাকবে। বেগম সাহেবা কি যেন ইঙ্গিত করলেন। রহমান এগিয়ে এসে আদাব করল। মৃদুস্বরে ফ্রান্সিসকে বলল–চল।
এদিকে ফ্রান্সিসকে নিয়ে রহমান চলে আসার পর ফ্রান্সিসের বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে শলা পরামর্শ করতে লাগল। পরামর্শমত সবাই যে যার জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। একটু পরেই হঠাৎ একজন উঠে পরিত্রাহি চীৎকার শুরু করল। যেন সেই চীৎকার শুনেই উঠে পড়েছে, এমনি ভঙ্গি করে বেশ কয়েকজন ওর দিকে ছুটে এল। লোকটা তখন পেটে হাত দিয়ে গোঙাতে লাগল, আর মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল। একজন পাহারাদার ওদের চীৎকার চ্যাঁচামেচি শুনে কাঁটাতারের দরজা দিয়ে মুখ বাড়ালো কি হয়েছে?
