বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ওরা। অধিনায়ক ফিরে এলো। বলল—শিগগির এসো—রাজা তোমাদের সঙ্গে কথা বলবেন। সবাই দুর্গের মধ্যে ঢুকল। বিরাট বিরাট পাথরের খিলানওলা দরজা পার হয়ে একটা মস্তবড়ো কাঠের দরজার সামনে এলো ওরা। কাঠের দরজায় পেতলের ফুলপাতা আঁকা নানা কারুকাজ। সুদৃশ্য পেতলের বর্শা হাতে দুজন দ্বাররক্ষী ছিল। অধিনায়কের ইঙ্গিতে ওরা দরজা খুলে দিল।
বিরাট একটা ঘরে ঢুকল ওরা। কাভাল্লি বলল-রাজসভাঘর। হ্যারি সেটা ফ্রান্সিস আরমারিয়াকে বলল। ঘরের চারদিকে পেতলের মশালদণ্ডে মশাল জ্বলছে। রাজসভাঘরের পাথরের দেয়াল ও ছাদের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস অবাক হয়ে গেল। মশাল দণ্ডের মাথায় মাথায় উজ্জ্বলরঙে আঁকা কত ছবি দেয়ালে, ছাদে। ফুল লতাপাতা মানুষ সমুদ্র পাহাড় কী অপরূপ ছবি সেসব। বাইজেন্টাইন সম্রাটদের আমলে আঁকা এইসব ছবিই বুঝিয়ে দেয় বাইজেন্টাইন সম্রাটরা কত বড়ো শিল্পরসিক ছিলেন। সামনেই সিংহাসন। রুপোর সিংহাসনে কত কারুকাজ। গভীর নীলরঙের মখমলমোড়া সিংহাসন। দু’পাশে আরও দুখানা রুপোর আসন। রাজ-অমাত্যদের জন্যে।
ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাজসভা দেখতে লাগল। একটু পরে রাজা ঢুকল। সিংহাসনে বসল। বয়স হয়েছে রাজা বোনিফেসের। তবু হাঁটা চলা যুবকের মতো। বোনিফেস ফ্রান্সিসদের একবার দেখে নিয়ে কাভাল্লির মুখের দিকে তাকাল। বলল—তুমি কাভাল্লি? তুমি জানো বাইজেন্টাইন সম্রাটদের মুকুট কোথায় আছে?
হ্যারি আস্তে আস্তে বলল—না, কাভাল্লি জানে না। তবে আপনি যদি অনুমতি দেন তবে আমরা ঐ নিখোঁজ রাজমুকুট খুঁজে বের করতে চেষ্টা করবো।
রাজা বোনিফেস একটু চুপ করে থেকে বলল—নিখোঁজ রাজমুকুট আমার চাই। তারপর বলল—তোমরা ভাইকিং। এ দেশের কী জানো?
ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে হ্যারি বলল—আমার এই বন্ধুটির নাম ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস সাহস আর বুদ্ধিবলে অনেক গুপ্তধন উদ্ধার করেছে। সব দেখেশুনে ও সঠিক বলতে পারবে ঐ রাজমুকুট উদ্ধার করা সম্ভব কিনা। রাজা একটু ভাবল। বলল—বেশ, চেষ্টা করে দেখো। হ্যারি ফ্রান্সিসকে রাজার সঙ্গে যা কথা হলো বলল। ফ্রান্সিস ওকে দেখিয়ে বলল আর কী কী বলতে হবে। হ্যারি বলল—আমরা কাল থেকেই খোঁজার কাজ শুরু করবো। এজন্যে আপনার কাছে অনুমতি চাইছি।
বেশ—বলো। রাজা বলল।
এক—আমার বন্ধুর দৃঢ় বিশ্বাস এই রাজমুকুট এই দুর্গেই কোথাও আছে। কাভাল্লি এই দুর্গের সব কিছু খুব ভালোভাবে চেনে। সুতরাং আমাদের সঙ্গে কাভাল্লি সবসময় থাকবে।
আপত্তি নেই। রাজা বলল—কিন্তু কাভাল্লি পালালে তোমাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে।
বেশ, আমরা রাজি। দুই—এই দুর্গের সর্বত্র আমাদের যেতে দিতে হবে, বিশেষ করে আপনার সজ্জাকক্ষে। হ্যারি বলল।
যাবে, কিন্তু সঙ্গে দুজন পাহারাদার সৈন্য থাকবে। কারণ সজ্জাকক্ষে মূল্যবান অনেক কিছু রয়েছে। আর সজ্জাকক্ষে সকালে যেতে পারবে না, যাবে বিকেলে—দু’ঘন্টার জন্যে।
তাতেই হবে। হ্যারি বলল।
রাজা সিংহাসন থেকে উঠল। ভেতরের দিকে চলে গেল। ফ্রান্সিসেরা রাজসভা কক্ষের বাইরে এলো। দুর্গদ্বার পার হয়ে ওরা যখন রাস্তায় নামল তখন সন্ধে হয় হয়। ওরা জাহাজঘাটার দিকে চলল। রাস্তায় দুপাশে এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় লোকজন দোকানপাট এসব দেখে মারিয়া বলে উঠল—ফ্রান্সিস, কাভাল্লি তো সঙ্গে আছে। চলো না নগরটা একটু ঘুরে-ফিরে দেখি।
মারিয়াও আমরা বেড়াতে আসিনি। এখন অনেক চিন্তা মাথায়। ফ্রান্সিস আস্তে বলল। মারিয়ার বেড়ারার উৎসাহ আর রইল না। মন খারাপ হয়ে গেল ওর। ফ্রান্সিস বুঝল। বলল—মারিয়া, ভুলে যেও না—বিদ্রোহী এনরিকো যেকোনো মুহূর্তে এইখানিয়া আক্রমণ করতে পারে। তার আগেই আমাদের কাজ সেরে চলে যেতে হবে। তবে কথা দিচ্ছি—
বের করার পর যদি যুদ্ধ না লাগে, পুরো একদিন আমরা সবাই এইনগরে ঘুরে বেড়াবো। মারিয়া ফ্রান্সিসের কথার গুরুত্ব বুঝলো। বলল ঠিক আছে, তুমি যা ভালো বুঝবে তাই হবে।
জাহাজে ফিরে এলো ওরা। বন্ধুরা সব ছুটে এসে ওদের ঘিরে ধরল। ফ্রান্সিস রাজা বোনিফেসের সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে সব বলল।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর রুপোর মোমদানিতে মোম জ্বেলে ফ্রান্সিস রাজমুকুটের ছবিটা নিয়ে বিছানায় বসল। ও আগেই কাভাল্লির কাছ থেকে ছবিটা চেয়ে রেখেছিল। পাশে মারিয়াও বসল। তখনই হ্যারি এলো। বলল—আলো জ্বলছে দেখে এলাম। তিনজনেই মন দিয়ে ছবিটা দেখতে লাগল। একসময় হ্যারি বলে উঠল—ফ্রান্সিস, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছবিটার নীচে ঐ নকশার ফাঁকে ফাঁকে কিছু লেখা আছে। কিন্তু ভাষাটা প্রাচীন গ্রীক। আমার অত জ্ঞানগম্যি নেই। তবে তার একটা শব্দ ভাগ্য’। ফ্রান্সিস বলল—লেখাটার পাঠোদ্বার করতেই হবে। তার আগে দুৰ্গটা ভালো করে দেখতে হবে। বিশেষ করে সজ্জাকক্ষটা। কিছুক্ষণ তিনজনে এই ব্যাপারে কথাবার্তা বলল। হ্যারি চলে গেল। ফ্রান্সিস
আর মারিয়া আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।
পরদিন সারা দুপুর ফ্রান্সিস শুয়ে বসে সময় কাটাল। বিকেলে তৈরি হয়ে মরিয়া, হ্যারি আর কাভাল্লিকে নিয়ে ফ্রান্সিস জাহাজঘাটায় নামল। ওরা দুর্গে পৌঁছল। কাভাল্লি ওদের ঘুরে ঘুরে অন্তঃপুর বাদে সমস্ত দুর্গের ঘর, বারান্দা, সিঁড়ি দেখাল। ফ্রান্সিস বেশ মনোযোগ দিয়ে সব দেখতে লাগল। বেশিরভাগ ঘরেই সৈন্যরা থাকে। দেয়ালে ছাদে অনেক জায়গাতেই ছবি আঁকা। মোজেকের কাজ। বেশিরভাগ ঘরে আসবাবপত্র বিশেষ কিছু নেই। দেয়ালে বড়ো আয়না, সৈন্যদের পোশাক রাখার লম্বা বাক্স—এইসব দেখে ফ্রান্সিসের মনে হলো বাইজেন্টাইন সম্রাট পালাবার আগে কোথাও নিশ্চয়ই রাজমুকুটটা লুকিয়ে রেখে গেছেন। সেই সময় সম্রাটের দুর্গের অন্য ঘরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। অন্তঃপুর আর সজ্জাকক্ষ সম্রাট সেসময় ঐ দুটো জায়গাতেই গেছেন। ফ্রান্সিস কাভাল্লিকে বলল—এবার সজ্জাকক্ষে চলো। মাত্র ঘণ্টা দুয়েক ওখানে থাকবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
