তিন দিনের দিন দুপুর নাগাদ দূর থেকে খানিয়া বন্দরের জাহাজ, বাড়িঘর দেখা গেল। ফ্রান্সিসরা অনেকেই জাহাজের রেলিঙে এসে দাঁড়াল। আরো কিছুটা এগিয়ে বন্দরের স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততা নজরে পড়ল। সব খুঁটিয়ে দেখে কাভাল্লি বলল—খানিয়ার অবস্থা শান্তিপূর্ণ। ঐ দেখুন এখানে বিদেশি জাহাজও রয়েছে। ঐ একটা জাহাজ বন্দর ছেড়ে যাচ্ছে। এখন সবই স্বাভাবিক অবস্থায় এসেছে। এবার ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল—কী করবো হ্যারি? জাহাজ বন্দরে ভেড়াবে না কাছাকাছি কোথাও জাহাজ নোঙর করবে। সেখানে থেকে নৌকায় চড়ে তীরে নামা যাবে। হ্যারি একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল—দেখো, খানিয়ার দুর্গে তোমাকে যেতেই হবে,নইলে রাজমুকুট খুঁজে বের করবে কী করে? কাজেই গোপনীয়তার কোনো মানে হয় না। জাহাজ ঘাটাতেই জাহাজ ভেড়াবো আমরা। জাহাজঘাটা দিয়ে খানিয়ায় ঢুকবো।
বেশ। ফ্রান্সিস বলল। তারপর কাভাল্লির দিকে ফিরে বলল-কাভাল্লি তুমিও আমাদের সঙ্গে যাবে। কাভাল্লির চোখমুখে দুশ্চিন্তা ফুটে উঠল। ও বলল—দেখুন, বোনিফেসের সৈন্যরা আমাকে দেখলেই চিনে ফেলবে। এই সৈন্যরা অনেকেই তো বাইজেন্টাইন সম্রাটের সৈন্য ছিল। আমি কিন্তু বিপদে পড়বো তাহলে। ফ্রান্সিস বলল—কোনো ভয় নেই তোমার। রাজা বোনিফেস এখনও নিষ্মই রাজমুকুট খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঐ মহামূল্যবান রাজমুকুটের জন্য বোনিফেসের মতো লোভী লোক তো পাগল হবেই। আমরা ওর এই দুর্বলতার সুযোগটা নেব। দেখবে। তোমাকে আর বোনিফেস কোনো বিপদেই ফেলবে না।
আপনারা পারবেন আমাকে রক্ষা করতে?কাভাল্লি বলল।
নিশ্চয়ই পারবো। ফ্রান্সিস বলল—বোনিফেসের মতো ভীষণ লোভী রাজা এর আগেও দেখেছি। কাজেই এদের মতিগতি আমি ভালোই বুঝি। তুমি কিছু ভেবো না। এবার ফ্রান্সিস ভাইকিং বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল—ভাইসব, আমরা লুকোচুরির মধ্যে যাবো না। বন্দরেই জাহাজ ভেড়াবো। তারপর কাভাল্লিকে নিয়ে আমি, হ্যারি আর মারিয়া খানিয়া নগরে যাবো। নিখোঁজ রাজমুকুট খুঁজে বের করব। এতে কিছুদিন সময় লাগবেই। কাজেই আমরা যদি দু’একদিনের মধ্যে না ফিরি তোমরা চিন্তা করো না। রাজার সঙ্গে কথা হলে আর সবদিক থেকে আমরা নিরাপদ থাকলে আমরা কেউ এসে তোমাদের খবর দিয়ে যাবো। ফ্রান্সিস থামল। একজন ভাইকিং বন্ধু বলল—ঠিক আছে আমরা এখানে তোমাদের খবরের জন্য অপেক্ষা করবো।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ ধীরে ধীরে বন্দরে ভিড়ল। নোঙর ফেলা হলো। জাহাজঘাটা পর্যন্ত কাঠের পাটাতন ফেলা হলো। মারিয়া নিজের কেবিনে এলো। মোটামুটি সাজগোজ করে নিল। ফ্রান্সিস হ্যারি তৈরি হয়ে এলো। কাভাল্লি একজন ভাইকিংয়ের কাছ থেকে এক টুকরো কাপড় চাইল। ভাইকিংটি ওর কোমরের ফেট্টি থেকে কিছুটা কাপড় ছিঁড়ে দিল। কাভাল্লি সেইকাপড়ের টুকরোটা মাথা ও মুখের দুপাশে পেঁচিয়ে বাঁধল যাতে কেউ ওকে চিনতে না পারে।
তিনজনে জাহাজ থেকে নেমে এলো। কাভাল্লি ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল খানিয়া দুর্গের দিকে। পথে লোকজনের ভিড়। তারমধ্যে রাজা বোনিফেসের সৈন্যরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। দু’ধারে দোকানপাট। ঘোড়ায় টানা গাড়িও চলছে। কাভাল্লি চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগোচ্ছিল। তবু কাভাল্লি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারল না। একটা মোড়ের মাথায় দু’জন সৈন্যের মুখোমুখি পড়ে গেল। একজন সৈন্য চলেই যাচ্ছিল। অন্যজনের কিন্তু কাভাল্লির কাপড় ঢাকা দেওয়া মুখ দেখে সন্দেহ করলো। সে কাভাল্লির মুখের দিকে ভালো করে তাকাল। সন্দেহ বাড়ল। একটানে কাভাল্লির মুখের ঢাকা দেওয়া কাপড়টা খুলে ফেলল। এবার আর কাভাল্লিকে চিনতে অসুবিধা হলো না। সৈন্যটি বলল—তুমি কাভাল্লি। সম্রাটের সজ্জাকক্ষের পাহারাদার ছিলে। কাভাল্লি ভয়ে আর কথা বলতে পারল না। হ্যারি এগিয়ে এলো। ভাঙা গ্রীক ভাষায় বললও কাভাল্লি। ফ্রান্সিস আর মারিয়াকে দেখিয়ে বলল—আমরা তিনজন ভাইকিং। আমরা ওর সঙ্গে এসেছি।
কেন?
সেসব আমরা রাজা বোনিফেসকে বলবো।
এখন তো রাজসভা শেষ হয়ে গেছে। সৈন্য বলল।
ঠিক আছে। আমাদের দুর্গে নিয়ে চলো। হ্যারি বলল।
দুর্গে গিয়ে কী করবে?
এবার কাভাল্লি বলল—আমি দুর্গরক্ষীদের অধিনায়কের সঙ্গে দেখা করব। তারপর রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ব্যবস্থা করব।
সৈন্যটি বলল—বেশ চলো। কিন্তু কাভাল্লি, তুমি যদি আবার আমাদের চোখে ধুলো, দিয়ে পালাও—
না ও পালাবে না। হ্যারি বলল।
সৈন্য দু’জন ওদের নিয়ে চলল। তারা দু’জন সঙ্গে থাকায় দুর্গদ্বার দিয়ে ওদের ঢুকতে কোনো অসুবিধে হলো না। কাভাল্লি ওদের অপেক্ষা করতে বলে দুর্গের মধ্যে ঢুকে পড়ল। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে আছে। সৈন্য দুজনও। কিছুক্ষণ পরে কাভাল্লি ফিরে এলো। ওর সঙ্গে একজন বেশ সুসজ্জিত মধ্যবয়স্ক লোক এলো। কাভাল্লি হ্যারিকে বলল—ইনিই দুর্গরক্ষীদের অধিনায়ক।
হ্যারি বলল—দেখুন আমরা তিনজন ভাইকিং। কাভাল্লিকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এসেছি একটা উদ্দেশ্য নিয়ে।
কী সেই উদ্দেশ্য?
শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাটের নিখোঁজ রাজমুকুট খুঁজে বের করতে এসেছি। এইজন্য রাজা বোনিফেসের সাক্ষাৎপ্রার্থী আমরা।
অধিনায়ক একটু ভাবল। বলল—এখন কি রাজা দেখা করবেন?
আপনি শুধু রাজাকে এই সংবাদটুকু পৌঁছে দিন যে কাভাল্লিকে সঙ্গে নিয়ে তিনজন ভাইকিং এসেছে। কী জন্যে এসেছি তাও বলবেন। কপাল ভালো। অধিনায়ক রাজি হলো। কিন্তু সঙ্গের সৈন্য দু’জনকে বলল—দেখো, কাভাল্লি যেন পালাতে না পারে। অধিনায়ক দুর্গে ঢুকে পড়ল।
