মাতৃভূমির গান। মাটির গান। সবাই চুপ করে শুনতে লাগল। দেশ থেকে কতদুরে এক অজানা দেশের বন্দরে কানে আসছে দেশের গ্রামের মাটির গান।
বিস্কোর গান থামল। কেউ কোনো কথা বলল না। দেশের কথা মনে এলো। সকলেরই মন বেশ ভারী হয়ে গেল। মারিয়ারও মন খারাপ হয়ে গেল দেশের কথা ভেবে। ও মৃদুস্বরে ফ্রান্সিসকে বলল—ফ্রান্সিস—তোমার শরীর ভালো নেই। খানিয়া আর যাবো না। দেশে ফিরে যাই।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে হেসে বলল—না মারিয়া তা হয় না। খানিয়াতে শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাটের নিখোঁজ রাজমুকুট আমি খুঁজে করবোই।
কিন্তু কতদিন দেশ ছেড়ে এসেছি—মানে—মারিয়া কথাটা শেষ করতে পারল না। ফ্রান্সিস দৃঢ়স্বরে বলল—মারিয়া—তোমরা যদি কেউ না যাও—আমি একা যাবো। কেউ আমাকে সংকল্পচ্যুত করতে পারবে না। মারিয়া তাড়াতাড়ি বলল। না না—আমরা তোমার সঙ্গেই থাকবো। ফ্রান্সিস হেসে বলল দেশের গান শুনেছো তো—তাই তোমার মন খারাপ হয়ে গেছে। মন শক্ত করো।
এরপর আনন্দে উল্লাসে ভাটা পড়ল। আসল কথা দেশের কথা ভেবে প্রায় সবারই মন খারাপ হয়ে এলো।
রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে অনেকেই কেবিনঘরে শুয়ে পড়ল। বেশ গরম লাগছিল। শাঙ্কো কম্বলমতো মোটা কাপড়টা নিয়ে ডেক-এ উঠে এল। দেখল অনেকেই শুয়ে পড়েছে। শাঙ্কো জাহাজের মাথার কাছে কাপড় পেতে শুয়ে পড়ল। একসময় সমুদ্রের ঠাণ্ডা বাতাসে ওর চোখে ঘুম জড়িয়ে এলো।
তখন ভোর হয় হয়। জাহাজঘাটায় লোকজনের চিৎকার ডাকাডাকি চ্যাঁচামেচিতে শাঙ্কোর ঘুম ভেঙে গেল। ও উঠে দাঁড়াল। দেখল জাহাজঘাটায় লোকজনের খুব ব্যস্ততা। শাঙ্কো একবার ভাবল—নেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করে ব্যাপারটা কী? কিন্তু ও তো গ্রীক ভাষা জানে না। ও ছুটল জাহাজের সিঁড়ির দিকে। হ্যারির কেবিনঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকল—হ্যারি—হ্যারি।
হ্যারির ঘুম ভেঙে গেল। ও বেরিয়ে এলো।
—কী হয়েছে?
—জাহাজাঘাটায় দেখলাম—সব লোকজন ছুটোছুটি ডাকাডাকি করছে। কী ব্যাপার বুঝতে পারছি না।
—চলো তো। হ্যারি দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে ছুটল।
ডেক-এ উঠে দেখল বেশ কিছু ভাইকিং বন্ধু জাহাজের রেলিং ধরে জাহাজঘাটার দিকে তাকিয়ে আছে।
হ্যারি পাটাতন দিয়ে নামতে নামতে দেখল রাজা মার্কোর প্রায় শখানেক সৈন্য জাহাজঘাটায় সার দিয়ে দাঁড়াচ্ছে। সকলেই সশস্ত্র।
হ্যারি জাহাজঘাটায় নামল। সৈন্যদের দলপতিকে খুঁজতে লাগল। দেখল দলনেতা তলোয়ার হাতে সৈন্যদের সাজাচ্ছে। হ্যারি কাছে গেল। জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে বলুন তো? দলনেতা একবার হ্যারিকে দেখল। বলল—তোমরা কে?
—আমরা ভাইকিং। ওদের জাহাজ দেখিয়ে বলল—ঐ যে আমাদের জাহাজ।
—জাহাজ চালিয়ে শিগগির পালিয়ে যাও।
—কেন?
—বিদ্রোহী এনরিকো পোলিরিনা দখল করেছে। তারপর এই নাক্সোস আক্রমণ করতে আসছে। অনেক কাছে চলে এসেছে। গুপ্তচর খবর এনেছে একটা যুদ্ধজাহাজ বোঝাই সৈন্য নিয়েই এই বন্দরের দিকে আসছে। আমরা লড়াইয়ের জন্যে তৈরি হচ্ছি। তোমরা পালাও। নইলে মরবে।
হ্যারি চিন্তায় পড়ল। ও দ্রুত ছুটল ওদের জাহাজের দিকে। ফ্রান্সিসকে জাহাজ ডেক এই পেল। ততক্ষণে সবাই ডেক-এ এসে দাঁড়িয়েছে। এত হৈ চৈ সৈন্য সাজানো কেন জানবার জন্যে। হ্যারি ফ্রান্সিসকে সব কথা বলল। ফ্রান্সিস একটুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবল। তারপর মাথা তুলে ডাকল
—পেড্রো? পেড্রো এগিয়ে এলো।
—শিগগির মাস্তুল ওঠো। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখো কোনো জাহাজ দেখতে পাও কিনা। পেড্রো তর তর করে মাস্তুল বেয়ে উঠে গেল। একটু পরে চিৎকার করে বলল—একটা জাহাজ আসছে—ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল—কত জোরে আসছে— কতক্ষণের মধ্যে এখানে এসে পৌঁছবে? পেড্রো একটুক্ষণ চুপ করে বোধহয় জাহাজের গতিবেগ হিসেব করল। বলল—আর ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে এখানে পৌঁছবে।
—কোনদিকে থেকে জাহাজটা আসছে? ফ্রান্সিস গলা জড়িয়ে বলল।
—বাঁ দিকে থেকে। পেড্রো গলা চড়িয়ে উত্তর দিল। ফ্রান্সিস উত্তরটা শুনেই সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুদের দিকে তাকল। গলা চড়িয়ে বলল—ভাইসব আমরা এই যুদ্ধে জড়াবো না। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা চলবে না। নোঙর তোল—পাল খাটাও—দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে চলে যাও যত দ্রুত সম্ভব জাহাজ চালাও—ডানদিক লক্ষ্য করে। জাহাজে সাজো সাজো রব পড়ে গেল। মাস্তুল বেয়ে দ্রুত উঠল কয়েকজন। পালের দড়িদড়া টেনে পাল খুলে দিতে লাগল। শাঙ্কো আর বিস্কো ছুটে গিয়ে ঘর ঘর শব্দে নোঙর তুলে ফেলল। দাঁড়িরা সমুদ্রের জলে দাঁড় ফেলতে লাগল—ছপ ছপ। জাহাজ ঘাট থেকে আস্তে আস্তে সরে এলো। একটু দূরে আসতেই ভাইকিংরা সব পাল খুলে দিল। দাঁড়িরা জোর দিল দাঁড় টানায়। জাহাজ গতি পেল। ফ্রান্সিস ডাকল-কাভাল্লি। কাভাল্লি এগিয়ে এলো।
—এসো—তুমি—চালককে সাহায্য করো। দিক ঠিক করে খানিয়া বন্দরের দিকে জাহাজ চালাও। ফ্রান্সিস বলল। একটু পরেই জাহাজের গতি বাড়ল। দূরে মিলিয়ে গেল নাক্সোস বন্দর। জাহাজ মাঝ সমুদ্রে চলে এলো।
জোর বাতাসে পালগুলো ফুলে উঠল। দাঁড় বাওয়ার ছপ ছপ শব্দ উঠল সমুদ্রে। সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে জাহাজ খানিয়ার দিকে পূর্ণবেগে চলল।
দু’দিন কাটল। বাতাস বেগবান। পালগুলো ফুলে রয়েছে। দাঁড়ও বাইতে হচ্ছে না। নির্বিঘ্নে চলছে জাহাজ।
