সেদিন দুপুরের একটু পরে হ্যারি রা ফ্রান্সিসকে নিয়ে জাহাজঘাটার দিকে রওনা হল। মারিয়া ফ্রান্সিসের হাত ধরে ওর পাশে পাশে চলল। দু’পাশে পেছনে রইল বিস্কো শাঙ্কোরা। ফ্রান্সিস বেশ আস্তে আস্তে হাঁটছিল। হ্যারি বলেছিল ফ্রান্সিসকে—তোমার শরীর দুর্বল। তুমি কাঠের তক্তায় পাতা বিছানায় বসো আমরা ধরে নিয়ে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস রাজি হয় নি।
ফ্রান্সিস চলার মধ্যেই একটু থেমে থেমে চলল। জাহাজঘাটায় এলো ওরা। সরু পাটাতনের ওপর দিয়ে উঠতে গিয়ে ফ্রান্সিসের মাথাটা একটু ঘুরে উঠল। টাল খেল ও। পেছন থেকে বিস্কো ফ্রান্সিসকে জোরে জড়িয়ে ধরল। সামনে উঠেছিল শাঙ্কো। সেও ফ্রান্সিসকে ধরল। আস্তে আস্তে ওরা ফ্রান্সিসকে নিয়ে জাহাজে উঠল।
খাওয়া-দাওয়া বিশ্রাম। কয়েকদিনের মধ্যেই ফ্রান্সিস সম্পূর্ণ সুস্থ হল।
সেদিন ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা জাহাজে উৎসবের আয়োজন করল।
হ্যারি ফ্রান্সিস মারিয়ার কেবিনঘরে এলো। দেখল—ফ্রান্সিস সেই আগের মতোই প্রাণবন্ত। কী একটা কথা নিয়ে ফ্রান্সিস আর মারিয়া হাসাহাসি করছে।
—এসো হ্যারি। ফ্রান্সিস হাসতে হাসতেই বলল। হ্যারি এগিয়ে এসে বলল ফ্রান্সিস-রাজবৈদ্য তোমাকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছেন। এবার তাকে তো তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক দিতে হয়। ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল—মারিয়া—চিকমা থেকে কিছু দামি জিনিস আনতে পারলে ভালো হত। একবারে শূন্য হাতে চলে এলাম।
—তাতে আমি মোটেই দুঃখিত নই। মারিয়া বলল। তারপর বিছানার একপাশ থেকে একটা কালো চকচকে কাঠের বাক্স বের করল। বাক্স খুলে বের করল একটা মোটা সোনার চেন-এর হার। তাতে লকেটের মতো ঝুলছে একটা প্রায় হাঁসের ডিমের মতো মুক্তো। ফ্রান্সিস দেখেই চিনল। এই সবচেয়ে বড়ো মুক্তোটা ও মারিয়ার জন্যে মুক্তোর সমুদ্র থেকে এনেছিল। ফ্রান্সিস একটু মনঃক্ষুণ্ণ হ’ল। বলল—মারিয়া—এটা আমাদের স্মৃতির জিনিস।
—ঠিক—মারিয়া বলল—কিন্তু যিনি তোমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন তাঁকে তো আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাই দিতে হবে। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে দেখে বলল—এতে তোমার কোনো কষ্ট হবে না তো।
—বিন্দুমাত্র না—মারিয়া হেসে বলল—তোমার চেয়ে মূল্যবান আমার কাছে অন্য কিছুই নয়। চলো হ্যারি
হ্যারি আরমারিয়া রাজবৈদ্যর বাড়ি এলো। রাজবৈদ্যর তখন শেষ রোগীটা দেখা হয়ে গেছে। হ্যারি আরমারিয়াকে দেখে হেসে বসতে বললেন। ওরা বসল। রাজবৈদ্য মারিয়াকে বললেন—সেদিন আপনাকে ঘরের বাইরে চলে যেতে বলেছিলাম কেন জানেন? আপনার স্বামীর ফোলা হাতের ঘা দেখলে আপনি আতঙ্কগ্রস্ত হতেন। আপনি সহ্য করতে পারতেন না। হ্যারি রাজবৈদ্যরকথাটা মারিয়াকে বুঝিয়ে বলল। মারিয়ার মন রাজবৈদ্যর প্রতি শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। এবারমারিয়া বলল—আপনি এত মহৎ হৃদয়ের মানুষ। আমার স্বামীর জীবনদান করেছেন। এই ঋণ পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস দিয়েও শোধ করা যায় না। তবু আমার প্রার্থনা এই হারটি গ্রহণ করে আমাদের ধন্য করুন। এবার হ্যারি মারিয়ার কথাগুলো গ্রীক ভাষায় রাজবৈদ্যকে বোঝাল। রাজবৈদ্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। আর আস্তে আস্তে বললেন—মা—তোমার এই শ্রদ্ধার উপহার আমি নিলাম। কয়েকদিন পরে আমার নাতনির, বিবাহ। এই উপহার তাকে একজন বিদেশিনী মা’র উপহার হিসেবে দেব। হ্যারি কথাটা বল মারিয়াকে বুঝিয়ে বলল। মারিয়া এত খুশি হ’ল যে ওর চোখে জল এসে গেল। ও বার বার মাথা নুইয়ে রাজবৈদ্যকে শ্রদ্ধা জানাল। তারপর ওরা জাহাজে ফিরে এলো। উৎসবের দিন সন্ধেবেলা ভাইকিংরা যে যা কিছু ভালো পোশাক এনেছিল তাই পরল। সবাই জড়ো হলো ডেক-এ। ফ্রান্সিস এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। সবাই আনন্দ করতে লাগল।
ওদিকে ফ্রান্সিসের একটা ভালো পোশাক যে মারিয়া সঙ্গে এনেছিল সেটা ফ্রান্সিস জানতো না। রাজবাড়ির অনুষ্ঠানে যাবার পোশাক সেটা। মারিয়া সেই পোশাক বের করে ফ্রান্সিসের হাতে দিল। ফ্রান্সিস তো অবাক। এসব শৌখিন জমকালো পোশাক ফ্রান্সিস কিছুতেই পরতে চায় না। ওর অস্বস্তি হয়। কিন্তু আজকে ওর রোগমুক্তির জন্যে উৎসব। কাজেই, ফ্রান্সিসকে পরতে হ’ল সেই পোশাক। মারিয়াও পরল হালকা নীল রঙের গোড়ালি ঢাকা গাউন। একটু সাজগোজও করল। তারপরে দু’জনে হাত ধরাধরি করে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। দেখল লাল নীল নানা রঙের কাগজ দিয়ে ডেক সাজানো হয়েছে।
হ্যারি শাঙ্কো বিস্কোরাও যা ভালো পোশাক সঙ্গে ছিল পরেছে। ফ্রান্সিস ও মারিয়া আসতেই সবাই চিৎকার করে ধ্বনি তুলল—ও—হো—হো—। জাহাজে যা সামান্য কিছু বাজি ছিল তাই ফাটানো হল। শুরু হ’ল নাচ গান। পেড্রো ধুলোটুলো ঝেড়ে ওর বেহালা মতো বাজনাটা নিয়ে এলো। সেটার আটটা তারের মধ্যে দুটোই ঘেঁড়ে গেছে। পেড্রো মনের আনন্দে সেই বাজনাই বাজাতে লাগল।
রাত বাড়ল। এবার ডেক-এর একপাশে একটা কাঠের আসনে ফ্রান্সিস ও মারিয়া বসল। ওদের ঘিরে দাঁড়াল বন্ধুরা। একজন বিস্কোকে বলল—বিস্কো তুমি সেদিন দাঁড়ঘরে গান গেয়ে আমাদের তালে তালে দাঁড় চালাতে সাহায্য করেছিল। সেই গান গাওনা ভাই। বিস্কো একটু হাসল। তারপর ওদের দেশের চারণ কবিরা যেসব গান গেয়ে গ্রাম গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়ায় সেই গান ধরল।
