ঘরে এসে হ্যারি মারিয়াকে সেকথা বলল। তারপর অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে একজন তো একবাটি খাবার জলও নিয়ে এলো। বাটিতে একটা ছোটো কাঠের হাতা রাখা! মারিয়া আস্তে আস্তে ডাকল ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস চোখ বন্ধ করে ছিল। চোখ খুলে তাকাল। মারিয়া বলল—একটু খেয়ে নাও। ফ্রান্সিস মুখ হাঁ করল। মারিয়া হাতায় করে খাবার খাইয়ে দিতে লাগল।
ফ্রান্সিস খাবার খেয়ে জল খেয়ে একটু যেন ভালো বোধ করতে লাগল। চোখ বন্ধ করল। হ্যারি বলল—রাজকুমারী-জাহাজে চলুন। কাল থেকে আপনি এক ফোঁটা জলও খান নি। মারিয়া মাথা নাড়ল।
—অবুঝ হবেন না রাজকুমারী। এভাবে না খেয়ে থাকলে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। ফ্রান্সিস তো এখন কিছুটা সুস্থ। আসুন। হ্যারি বলল।
মারিয়া আর আপত্তি করল না। আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠল। হ্যারি মারিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ঘরের বাইরে এলো। শাঙ্কো এগিয়ে এলো। হ্যারি বলল—শাঙ্কো তোমরা ফ্রান্সিসের কাছে থাকো। আমরা জাহাজে খেতে যাচ্ছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসবো।
তখন সন্ধে হয়ে গেছে। অসুস্থ ফ্রান্সিসের ঘরে একটা মোটা মোমবাতি জ্বলছে। ফ্রান্সিসের শিয়রে মারিয়া বসে আছে। হ্যারি শাঙ্কো মেঝেয় মোটা কম্বলমতো পেতে বসে আছে।
সহকারীকে নিয়ে রাজবৈদ্য এলেন। ফ্রান্সিসের বিছানায় বসলেন। ফ্রান্সিস চোখ বুজে ছিল। মারিয়া মুখ নামিয়ে বলল—ফ্রান্সিস-রাজবৈদ্য এসেছেন। ফ্রান্সিস চোখ মেলে তাকাল। রাজবৈদ্য হেসে গ্রীক ভাষায় বললেন—কেমন আছেন? ফ্রান্সিস বুঝল না। হ্যারি বলে উঠল—ফ্রান্সিস তুমি কেমন আছো রাজবৈদ্য তাই জানতে চাইছেন। ফ্রান্সিস শুকনো ঠোঁটে একটু হাসি ফুটিয়ে মাথা নেড়ে বোঝাল-ভালো। রাজবৈদ্য ফ্রান্সিসের কপালে গলায় গায়ে পায়ে হাত দিয়ে দেখলেন। তারপর হাত দুটো তুলে দেখলেন। ফ্রান্সিস একটু চোখ মুখ কোঁচকাল। রাজবৈদ্য সেটা লক্ষ্য করলেন। সহকারীকে মৃদুস্বরে বললেন। তারপর যখন চলে যাচ্ছেন হ্যারি এগিয়ে গিয়ে বলল—কেমন দেখলেন? রাজবৈদ্য পাকাদাঁড়ি গোঁফের ফাঁকে হেসে বললেন—অনেকটা ভালো। কাল সকালে আবার ওষুধ পড়বে। জ্বর ছেড়ে যাবে। জ্বালা যন্ত্রণাও অনেক কমে যাবে। তিনি চলে গেলেন। ওদিকে সহকারী কাপড়ের পুটুলি থেকে বড়ি বের করে মারিয়াকে ইঙ্গিতে খাইয়ে দিতে বলল। ওষুধ খেয়ে ফ্রান্সিস আবার চোখ বুজে শুয়ে রইল।
রাত হ’ল। হ্যারি মারিয়া শাঙ্কো আর বন্ধুরা কয়েকজন পালা করে জাহাজ থেকে খেয়ে এলো। রাজবৈদ্যর সহকারী ফ্রান্সিসের খাবার দিয়ে গেল। ফ্রান্সিস খাবে বলে উঠে বসতে গেল। পারল না। শুয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল। মারিয়া ব্যস্ত হয়ে বলল—তোমাকে উঠতে হবে না। আমি খাইয়ে দিচ্ছি। মারিয়া ফ্রান্সিসকে খাইয়ে দিতে লাগল।
রাত বাড়তে লাগল। সেই ঘরের মেঝেয় মোটা কম্বলমতো পেতে হ্যারি আর শাঙ্কো শোবে ঠিক করল। হ্যারি শুয়ে পড়ার আগে বলল—রাজকুমারী—আপনি এখন ঘুমিয়ে নিন। আমরা আছি। মারিয়া মাথা নাড়ল। হ্যারি আর শাঙ্কো শুয়ে পড়েই ঘুমিয়ে পড়ল। এত ক্লান্ত ছিল ওরা যে চোখ মেলে তাকাতে পারছিল না।
রাত শেষ হয়ে এসেছে তখন। হঠাৎ হ্যারির ঘুম ভেঙে গেল। ও সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল। দেখল মারিয়া বিছানায় গুটিসুটি হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। ও আর মারিয়াকে ডাকল না।
হ্যারি বসে রইল। কিছুক্ষণ পরেই বাইরে একটা পাখির ডাক শুনল। তারপর আরো দু’তিনটি পাখির ডাকে বুঝল ভোর হয়ে এসেছে।
হঠাৎ ফ্রান্সিসের অস্ফুট ডাক শুনল—মারিয়া। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসের কাছে গেল। মারিয়ার কানে ডাকটা যায় নি। ও তখন অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ফ্রান্সিস হ্যারিকে দেখে হাসল। বলল—হ্যারি—দেখতো মনে হচ্ছে জ্বরটা ছেড়ে গেছে। হ্যারি তাড়াতাড়ি ফ্রান্সিসের কপালে হাত রাখল। ঠাণ্ডা। আনন্দে হ্যারির চোখে জল এসে গেল। ও দু’হাতে চোখের জল মুছে ফেলল। ফ্রান্সিস হেসে দুর্বল কণ্ঠে বলল—এই—ছেলেমানুষি করো না। একটু থেমে বলল—হ্যারি—যে জীবন আমরা মেনে নিয়েছি সেখানে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কোনো স্থান নেই। আছে শুধু বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে লড়াই। সংকল্প সাধনের জন্যে লড়াই। সমস্ত দুঃখ কষ্ট ব্যথা বেদনা দাঁত চেপে সহ্য করে লক্ষ্যে পৌঁছোতে হবে। এখানেই মানুষের জীবনের সার্থকতা। ফ্রান্সিস কথাগুলো বলে একটু হাঁপাতে লাগল। হ্যারি বলল বেশি কথা বলো না ফ্রান্সিস তোমার শরীর এখন ভীষণ দুর্বল।
ওদের কথাবার্তাতেই বোধহয় মারিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। ও লাফিয়ে উঠে বসল। হ্যারির দিকে তাকিয়ে—আকুলস্বরে বলে উঠল—কী হয়েছে হ্যারি? হ্যারি হেসে বলল—ভয়ের কিছু নয়। ফ্রান্সিসের জ্বর একেবারে ছেড়ে গেছে।
—এ্যাঁ। মারিয়া তাড়াতাড়ি ফ্রান্সিসের কপালে হাত রাখল। গলায় হাত রাখল। তারপর দু’হাত মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিস হেসে বলল—এই কেঁদো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। হ্যারি আস্তে আস্তে এসে নিজের জায়াগায় শুয়ে পড়ল। মারিয়া তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে!
তিন দিন কাটল। চারদিনের দিন ফ্রান্সিসের দু’হাতের পট্টি রাজবৈদ্যি এসে খুললেন। দেখা গেল হাতের ফোলা একেবারেই নেই। ঘাও শুকিয়ে গেছে। এর মধ্যে ফ্রান্সিস বিছানায় উঠে বসেছে। মেঝেয় একটু একটু পায়চারি করেছে। দেখেশুনে ফ্রান্সিসকে পরীক্ষা করে রাজবৈদ্য পাকা দাঁড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন—এবার আপনি আপনাদের জাহাজে ফিরে যেতে পারেন! আর কয়েকদিনের মধ্যেই আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে রাজবৈদ্যর ডান হাত আস্তে ধরল। রাজবৈদ্য সস্নেহে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
