মারিয়া দ্রুত ঘরে ঢুকল। হ্যারিকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখে মারিয়া কেমন বিহ্বলের মতো বলে উঠল—তাহলে ফ্রান্সিস কি—আমাকে এই জন্যেই এখানে থাকতে দেওয়া হয় নি। হ্যারি তাড়াতাড়ি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-না-না রাজকুমারী। রাজবৈদ্য বলছেন—ফ্রান্সিস সুস্থ হবে। আস্তে আস্তে ওর জ্বর কমবে জ্বালা যন্ত্রণা কমবে। ভয়ের কিছু নেই।
মারিয়া কোনো কথা বলল না। আস্তে আস্তে গিয়ে ফ্রান্সিসের শিয়রের কাছে বসল। একটা হাত আস্তে আস্তে তুলে কোলে রাখল। হাত বুলোত লাগল।
সময় কাটতে লাগল। তখনও ঘরের মধ্যে হ্যারি বিস্কো শাঙ্কো। বাইরে অন্য বন্ধুরা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
ঘণ্টা দুয়েক কাটল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকাল। মারিয়া ঝুঁকে বলল—ফ্রান্সিস—এখন কেমন লাগছে? মারিয়া দেখল ফ্রান্সিসের চোখের লাল ভাবটা অনেক কম। কপালে হাত দিল। জ্বর অনেক কম। ফ্রান্সিসের চোখের দৃষ্টিও স্বাভাবিক এখন। ফ্রান্সিস অস্ফুটস্বরে বলল—একটু ভালো।
—কোনো ভয় নেই। ফ্রান্সিস—রাজবৈদ্য বলেছেন তুমি ভালো হয়ে যাবে। মারিয়া বলল। ফ্রান্সিস শুনো ঠোঁটে হাসল। ক্লান্তস্বরে বলল—জল। হ্যারি ছুটে গেল। একটু পরেই একটা কাঠের পাত্রে খাবার জল নিয়ে এলো। মারিয়া আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসকে জল খাইয়ে দিল। জল খেয়ে ফ্রান্সিস বোধহয় ঘুমিয়ে পড়ল।
হ্যারির মুখে এতক্ষণে হাসি ফুটল। ও হেসে বিস্কো আর শাঙ্কোর দিকে তাকাল। ওরাও হাসল। শাঙ্কো এক লাফে ঘরের বাইরে এলো। বন্ধুরা অনন্ত অনড় দাঁড়িয়ে আছে। শাঙ্কো চাপা গলায় বলল—ভাইসব—ফ্রান্সিস এখন অনেকটা সুস্থ। রাজকুমারীকে চিনতে পেরেছে। কথা বলেছে। জল খেয়েছে। সবাইয়ের মুখে হাসি ফুটল। অন্য সময় হলে হয়তো—ও—হো—হো করে চিৎকার জুড়তো। এখন সবাই চুপ। একজন দু’জন করে ওরা বারান্দার পাথুরে মেঝেতে বসে পড়ল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। গতকাল সারা রাত ওরা শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে জাহাজের দাঁড় বেয়েছে। এখন এই বেলা পর্যন্ত কেউ কিছু খায় নি। ক্লান্তিতে অবসাদে সবাই তখন খাওয়ার কথাও ভুলে গেছে। অবশ্য ফ্রান্সিসের অসুস্থতার কথা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে নি এতক্ষণ। ফ্রান্সিস সুস্থ আছে জেনে এবার ওরা নিশ্চিন্ত হ’ল। উৎকণ্ঠা কেটে গেল। এতক্ষণে ওরা বুঝতে পারল ওরা কী ভীষণ ক্লান্ত।
হ্যারি ওদের কাছে এলো। বলল, ভাইসব—ফ্রান্সিস এখন অনেকটা সুস্থ। গতরাতে তোমরা অমানুষিক পরিশ্রম করে সময়কে জয় করেছিলে। তাই ফ্রান্সিসকে বাঁচাতে পারলাম আমরা। এবার জাহাজে ফিরে যাও। রাঁধুনিকে বলো রান্না করতে। তোমরা খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করো। আমি শাঙ্কো আর রাজকুমারী এখানে রইলাম। তোমরা খেতে যাও। আমরা পরে খাবো।
ভাইকিং বন্ধুরা চলে গেল জাহাজে। হ্যারি রাজবৈদ্যের কাছে গেল। বলল—আপনাকে কী করে কৃতজ্ঞতা জানাবো। রাজবৈদ্য হেসে হাত তুলে হ্যারিকে থামালেন। বললেন শুনুন আপনাদের যা শরীরের অবস্থা তাতে তাকে টানাটানি করা তাঁর পক্ষে ক্ষতিকর হবে। রোগী ঐ ঘরেই থাকবে। আমার সহকারী সব ব্যবস্থা করবে।
—তাহলে তো খুবই ভালো হয়। হ্যারি বলল—আমরা কয়েকজন এখানে থাকবো দিন রাত—রাজকুমারী মারিয়া সেবা-শুশ্রূষা করবেন।
হ্যারি ঘরে ফিরে এলো। দেখল মারিয়া ফ্রান্সিসের ডান হাতটা কোলে নিয়ে সেই একইভাবে চুপ করে বসে আছে। হ্যারি আস্তে আস্তে বলল-রাজকুমারী-রাজবৈদ্য বললেন ফ্রান্সিসকে এই ঘরে থাকতে হবে। ওর শরীরের এই অবস্থায় ওকে জাহাজে আনা নেওয়া নাড়াচাড়া করা উচিত হবে না। আমি তাতে রাজি হয়েছি। এখন আপনি বলুন। মারিয়া মাথা নিচু করে শান্তভাবে বলল—তোমরা যা চাইবে তা হবে। আমার মাথার ঠিক নেই। আমি কিছু ভাবতে পারছি না।
—তাহলে ফ্রান্সিস এখানেই থাক। আমরা কয়েকজন পালা করে এখানে থাকবো। আপনাকে সাহায্য করবো। হ্যারি বলল। মারিয়া শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কোনো কথা বলল না।
হ্যারি ঘরের বাইরে বারান্দায় এসে বসল। অপেক্ষা করতে লাগল কখন শাঙ্কো বিস্কো ওর জাহাজ থেকে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আসে।
বেলা বাড়তে লাগল। হ্যারি বারান্দায় পাথরের দেওয়ালের ঠেস দিয়ে বসে রইল। ফ্রান্সিস এখন কিছুটা সুস্থ। আর ফ্রান্সিসের জীবনের আশঙ্কা নেই—রাজবৈদ্য তো তাই বললেন, এতক্ষণে হ্যারি বুঝতে পারল—ও কতটা শ্রান্ত, ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত। হ্যারি দু’চোখ বুজল। আস্তে আস্তে ঐ অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়ল।
বিস্কোর ডাকে হ্যারির ঘুম ভেঙে গেল। হ্যারি চোখ খুলে দেখল—বিস্কো শাঙ্কো ওরা কয়েকজন ওর পাশে এসে বসল।
হ্যারি উঠে দাঁড়াল। ঘরে ঢুকল। দেখল মারিয়া ফ্রান্সিসের কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ফ্রান্সিস ঘুম ভেঙে চেয়ে আছে। হ্যারি আস্তে আস্তে ডাকল—ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে মুখ ফিরিয়ে ওর দিকে তাকাল। হ্যারি বলল—কিছু খাবে? ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না। আস্তে মাথা ওঠানামা করে চাইল। হ্যারি বলল—দেখি রাজবৈদ্যর সহকারী কী বলে? হ্যারি ভেতরের উঠোন মতো জায়গাটায় গেল। দেখল সহকারী যারা ওষুধ জ্বাল দিচ্ছে তাদের নির্দেশ দিচ্ছে। হ্যারি কাছে গিয়ে বলল—আমাদের বন্ধু—ফ্রান্সিস ও এখন একটু ভালো। ও খেতে চাইছে। ওকে কী খেতে দেব? সহকারী বলল—তাকে তো শক্ত খাবার দেওয়া যাবে না। আমি খাবার তৈরি করিয়ে দিচ্ছি। আপনারা খাইয়ে দিন।
