হ্যারি ইঙ্গিতে বিস্কোকে কাঠের তক্তার বিছানাটা ধরতে বলল। দু’জনে বিছানা পাতা তক্তাটা বিছানায় তুলে ফ্রান্সিসের পাশে রাখল। তারপর কয়েকজন ভাইকিংকে ইঙ্গিতে ডাকল। পাঁচ ছ’জন মিলে আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসকে তুলল। ফ্রান্সিস গোঙাতে লাগল। ফ্রান্সিসের অসহ্য কষ্ট বেদনার কথা ভেবে বন্ধুদের কারো কারো চোখে জল এলো। হ্যারি চাপাস্বরে বলল—কেউ কেঁদো না। তোমাদের চোখে জল দেখলে ফ্রান্সিস দুর্বল হয়ে পড়বে।
আস্তে আস্তে ওরা ফ্রান্সিসকে ধরে বিছানাপাতা তক্তায় শুইয়ে দিল। মারিয়া ফ্রান্সিসের হাত দুটো আস্তে আস্তে বিছানাটার দু’পাশে নামিয়ে রাখল। বোধহয় অসহ্য হাতের যন্ত্রণার জন্যেই ফ্রান্সিস চোখমুখ কুঁচকে মাথা নাড়ল। ওর গলায় গোঙানির শব্দ হল। ফ্রান্সিস একবার চোখ মেলে মারিয়া আর বন্ধুদের ঝুঁকে পড়া মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু কাউকেই চিনল না বোধহয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু’চোখ বন্ধ করল। আটদশজন ভাইকিং বন্ধু হ্যারি আর বিস্কো বিছানা-পাতা তক্তাটা এবার আস্তে তুলল। খুব সাবধানে, হাতে ধরাধরি করে কেবিনঘরের বাইরে নিয়ে এলো। আস্তে আস্তে ডেক-এ ওঠার সিঁড়ির দিকে চলল।
সিঁড়ি বেয়ে সাবধানে সযত্নে উঠে ডেকে-এ এলো। তারপর ধরাধরি করে নিয়ে চলল কাঠের পাটাতনের দিকে। কাঠের পাটাতন তো খুব বড়ো হয় না। মাত্র দুজন সামনে পেছনে নামতে পারে। এবার শাঙ্কো ছুটে এসে বিছানাটার সামনে ধরল। আর একপাশে ধরল বিস্কো। দুজনে মিলে এবার বিছানাপাতা তক্তাটা নিয়ে পাটাতন দিয়ে নামতে লাগল। একে ফ্রান্সিসের শরীরের ভার তার ওপর সরু পাটাতন। শাঙ্কো আর বিস্কোর ভীষণ কষ্ট হতে লাগল। হাত দুটো যেন ছিঁড়ে যাবে এরকম অবস্থা। কিন্তু ওরা দাঁত চেপে সেই কষ্ট সহ্য করল। আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসকে জাহাজঘাটায় নামিয়ে আনল। এবার আট-দশজন বন্ধু ছুটে এলো। ওরা সবাই মিলে সেই বিছানাপাতা তক্তাটা ধরাধরি করে আস্তে আস্তে সাবধানে নিয়ে চলল। ফ্রান্সিস এরমধ্যে একবার মাত্র চোখ চেয়েছিল। মাথা এপাশ-ওপাশ করছিল। ওর গলা থেকে বেরিয়ে এসেছিল গোঙানির শব্দ।
আস্তে আস্তে ওরা রাজবৈদ্যের বাড়ি পৌঁছল। রাজবৈদ্য সহকারী এগিয়ে এলো। পাশের ঘরে একটা কাঠপাতাশয্যায় ফ্রান্সিসকে শুইয়ে দিতে ইঙ্গিত করল। বন্ধুরা সেখানে ফ্রান্সিসকে শুইয়ে দিয়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল। শয্যার পাশে বসল মারিয়া। নিশ্চল পাথরের মতো বসে রইল। হ্যারি আর বিস্কো সেই ঘরে দাঁড়িয়ে রইল।
একটু পরে রাজবৈদ্য এলেন। ফ্রান্সিসের বিছানায় বসলেন। ফ্রান্সিসের কপালে গলায় হাত দিয়ে বোধহয় জ্বর কেমন দেখলেন। পায়ের কাছে কম্বল সরিয়ে পা দুটো টিপে হাত বুলিয়ে দেখলেন। তারপর পট্টি বাঁধা হাত দুটো আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। এবার সহকারীর দিকে তাকিয়ে কী বললেন। সহকারী দ্রুত বেরিয়ে গেল। একটু পরে কালো কাঠের গামলা নিয়ে এলো। তাতে গরম জল। ধোঁয়া উঠছে। সহকারী কিছু মোটা সাদা কাপড়ের টুকরো নিয়ে এলো। সেসব রাজবৈদ্যকে দিল। তারপর একটা ছোট্ট পুঁটুলিমতো বের করল। সেটা গরম জলে চুবিয়ে নাড়তে লাগল। বেগুনি রঙ হয়ে গেল জলটার।
রাজবৈদ্য বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ফ্রান্সিসের বাঁ হাতটা আস্তে আস্তে তুললেন। তারপর কিছুটা সাদা ন্যাকড়া ছিঁড়ে নিয়ে ঐ গামলার জলে চুবিয়ে ভেজালেন। সেটা হাতের পট্টির গায়ে লাগিয়ে ভেজালেন। আস্তে আস্তে পট্টিটা খুলতে লাগলেন। কিছুটা খুলতেই দগদগে ঘামতে দেখা গেল। রাজবৈদ্য এবার হ্যারির দিকে তাকালেন। মারিয়াকে দেখিয়ে আস্তে বললেন—এই ভদ্রমহিলাকে বাইরে যেতে বলুন। গ্রীকভাষা মারিয়া বুঝল না। হ্যারি মারিয়াকে বলল-রাজকুমারী, আপনি একটু বাইরে যান। মারি। কোনো কথা
বলে ঘরের বাইরে চলে গেল। রাজবৈদ্য সেই গামলার বেগুনি রঙের জলে ন্যাকড়া ভিজিয়ে ভিজিয়ে ফ্রান্সিসের দু’হাতের পট্টি আস্তে আস্তে খুলে ফেলল। দেখা গেল দুটো হাতেই কাটা জায়গাগুলো ঘায়ের মতো হয়ে গেছে। হাত দুটো বেশ ফুলেও গেছে। রাজবৈদ্য সহকারীকে কী বললেন। সহকারী ছুট্টে গিয়ে একটা তিনকোণা পাতায় জড়ানো হলুদ রঙের আঠামতো কী নিয়ে এলো। রাজবৈদ্য সেই জিনিসটা থেকে কিছুটা নিয়ে আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের হাতের ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস অস্ফুট
আর্তনাদ করে একবার মাথা তুলল। আবার মাথা নামাল বালিশের ওপর। জোরে জোরে, শ্বাস নিতে লাগল। রাজবৈদ্য সমস্ত ওষুধটাই দু’হাতের ক্ষতস্থানে আস্তে আস্তে লাগিয়ে দিলেন। তাকিয়ে রইলেন ফ্রান্সিসের মুখের দিকে।
কিছুক্ষণ সময় কাটল। ঘরের সবাই তাকিয়ে আছে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে। ফ্রান্সিস মাঝে মাঝেই চোখ মুখ কোঁচকাচ্ছিল। আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হ’ল। নাকমুখ কোঁচকানো বন্ধ হ’ল। ফ্রান্সিস চুপ করে চোখ বোজা অবস্থায় শুয়ে রইল। বোঝা গেল যেন ওর কষ্ট একটু কমল।
রাজবৈদ্য এবার শুকনো মোটা সাদা কাপড় দিয়ে আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের হাত দুটো বেঁধে দিলেন। দুটো হাত বিছানায় পেতে দিলেন। বিছানা ছেড়ে উঠলেন। হ্যারি রাজবৈদ্যর সামনে এগিয়ে এলো। বলল—আমাদের বন্ধু—সুস্থ হবে তো? রাজবৈদ্য পাকা দাড়ি গোঁফের ফাঁকে হাসলেন। বললেন—আর ঘণ্টা পাঁচ-ছয় দেরি হলে আপনাদের বন্ধুকে বোধহয় বাঁচানো যেত না। যা হোক—ওষুধে কাজ হয়েছে এখন আস্তে আস্তে জ্বর কমবে। ব্যথা জ্বালা যন্ত্রণাও কমবে। বন্ধুটি সুস্থ হবে। হ্যারি রাজবৈদ্যর ডানহাতটা দুহাতে জড়িয়ে ধরল। তারপর হাত ছেড়ে দিয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রাজবৈদ্য হ্যারির পিঠে আস্তে আস্তে চাপড় দিয়ে ওকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে গেলেন।
