ঘরে লম্বাটে কাঠের পাটাতন পাতা। রোগীরা বসে আছে। হ্যারি শাঙ্কো আর কাভাল্লিকে ইঙ্গিতে বসতে বলল। নিজে দাঁড়িয়ে রইল।
তখনই পাকা দাড়িগোঁফওলা একজন বৃদ্ধ আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকলেন। বৃদ্ধের পরনে ঢোলা সাদা মোটা কাপড়ের জোব্বামতো। কোমরে রেশম কাপড়ের বন্ধনী। হ্যারি বুঝল, ইনিই রাজবৈদ্যি পাসকাতোর। হ্যারি এবার অন্য রোগীদের দিকে তাকিয়ে ভাঙা ভাঙা গ্রীক ভাষায় বলল—ভাই আমাদের এক বন্ধু গুরুতর অসুস্থ। আমি আগে মাননীয় রাজবৈদ্যির সঙ্গে কথা বলবো। রোগীদের দুজন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। অন্যেরা কোনো কথা বলল না।
এবার হ্যারি এগিয়ে গেল। পাসকাতোর ততক্ষণে আসনে বসেছেন। হ্যারি মাথা একটুনুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল, রাজবৈদ্য মহাশয়—আমরা বিদেশি ভাইকিং। আমাদের জাহাজে আমাদেরই এক বন্ধু ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমরা আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো যদি আপনি দয়া করে আমাদের সঙ্গে জাহাজে এসে আমাদের অসুস্থ বন্ধুকে একটু দেখেন—চিকিৎসা করেন। পাসকাতোর একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি। জাহাজে ওঠানামা করতে খুবই কষ্ট হবে। আপনার যদি আপনাদের অসুস্থ বন্ধুকে এখানে আনতে পারেন তাহলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা আমি করবো। হ্যারি একটু ভাবলো কী করবে এখন? পরক্ষণেই ভাবল অন্য কোনো উপায় নেই। ফ্রান্সিসকে প্রাণে বাঁচাতে হলে যে ভাবেই হোক ফ্রান্সিসকে এখানে আনতে হবে। ও বলল—বেশ আমরা এক্ষুণি অসুস্থ বন্ধুকে নিয়ে আসছি।
হ্যারি,শাঙ্কো আরকাভাল্লিকেইশারায় ডেকেঘরের বাইরে এলো। হ্যারি বলল—জাহাজে চলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফ্রান্সিসকে এখানে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
হ্যারি রাস্তা দিয়ে ছুটে চলল। শাঙ্কো ও কাভাল্লিও চলার বেগ বাড়াল।
জাহাজে উঠেহ্যারি ছুটল ফ্রান্সিস ও মারিয়ার কেবিনঘরের দিকে। ঘরে ঢুকে দেখল—ফ্রান্সিস চোখ বুজে শুয়ে আছে। কিন্তু স্থির হয়ে শুয়ে নেই। মাঝে মাঝেই জোরে মাথা এপাশ-ওপাশ করছে। গলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে কষ্টের গোঙানি। ফ্রান্সিসের শিয়রের দুপাশে বসে মারিয়া আর ওদের বৈদ্যি ফ্রান্সিসের দু’টো হাত কোলে নিয়ে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। দুঃখে বেদনায় হ্যারির বুক ভরে উঠল। ফ্রান্সিসের মতো শক্ত মনের মানুষ কী প্রচণ্ড কষ্টে এই রকম মাথা নাড়ছে গোঙাচ্ছে এটা বুঝতে পেরে হ্যারি অস্থির হয়ে উঠল। ওর দু’চোখ জলে ভিজে উঠল। পরক্ষণেই হ্যারি চোখ মুছে ফেলল। এখন। মন দুর্বল হলে চলবে না এখন অনেক কাজ।
ততক্ষণে বিস্কো আর কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু ঘরে ঢুকল। ওরা শাঙ্কোর মুখে শুনেছে অসুস্থ ফ্রান্সিসকে রাজবৈদ্যির বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। বিস্কোর শরীর এখনও দুর্বল। কিন্তু সেই দুর্বলতা ও গায়ে মাখলনা। হ্যারি ডাকল—রাজকুমারী! মারিয়া আস্তে আস্তে মুখ তুলে হ্যারির দিকে তাকাল। হ্যারি-বলল—একটুকথা ছিল। মারিয়া বিছানা থেকে উঠে হ্যারির কাছে এলো। হ্যারি দেখল-মারিয়ার দুচোখ লাল। চোখের নীচে গভীর কালি। মুখ শুকিয়ে গেছে। দু’গালের চোখের জলের দাগ। হ্যারির বুকব্যথায় ভরে উঠল। মারিয়ার মাথার চুল সারা মুখে ছড়ানো। এলোমেলো। বেদনার প্রতিমূর্তি যেন। আজ বোঝার উপায় নেই মারিয়া কত হাসিখুশি কত প্রাণবন্ত মেয়ে। হ্যারি আস্তে আস্তে মারিয়াকে সব বলল। সব শুনে মারিয়া বলল—তাহলে ফ্রান্সিসকে যে নিয়ে যেতেই হবে। কিন্তু এতে ওর কষ্ট বাড়বে না তো?
—আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো ফ্রান্সিসকে সাবধানে সযত্নে নিয়ে যেতে, যাতে ওর কোনো কষ্ট না হয়—বিস্কো বলল।
—বেশ। মারিয়া আর কিছু বলল না। ফিরে গিয়ে বিছানায় বসল। ফ্রান্সিসের একটা পট্টি বাঁধা হাত কোলে তুলে নিল।
এদিকে জাহাজ সাজো সাজো রব উঠল। অসুস্থ ফ্রান্সিসকে রাজবৈদ্যের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
বিস্কো ছুটে গেল কেবিন ঘরগুলোর পেছনে। একটুকারমতো জায়গাটায় অনেকগুলো কাঠের তক্তা থাকে থাকে সাজানো। জাহাজ মেরামতের জন্যে ওগুলো লাগে। বিস্কোর সঙ্গে কয়েকজন বন্ধুও ছুটে এসেছিল। ওরা ধরাধরি করে একটা লম্বাটে কাঠের তক্তা বের করল। নিয়ে এলো ফ্রান্সিসের ঘরে। তক্তা মেঝেয় পেতে তার ওপর মোটা কম্বলমতো পাতল দু’টো। রাখল বালিশ। বিছানামতে হ’ল। হ্যারি হাত চেপে পরীক্ষা করে দেখল বেশ নরম হয়েছে। ও একটা মোটা চাদর পেতে দিল। এবার ফ্রান্সিসকে বিছানা থেকে এনে এখানে শোয়াতে হবে। তারপর বিছানা-পাতা তক্তাটা নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে যেতে হবে রাজবৈদ্যির বাড়ি।
এবার হ্যারি ওরা চিন্তায় পড়ল। নাড়াচাড়া করতে গেলে যদি ফ্রান্সিসের কষ্ট বাড়ে। হ্যারি কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ওদের ইতস্তত ভাব দেখে মারিয়া বলল—হ্যারি হয়তো এভাবে নিয়ে যেতে গেলে ফ্রান্সিসের কষ্ট বাড়বে। কিন্তু এক্ষুণি তো নিয়ে যেতেই হবে! ওদের বৈদ্যি বন্ধু তখনও বিছানায় মাথা নিচু করে বসেছিল। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল—যত কষ্ট হোকফ্রান্সিসকে এক্ষুণি নিয়ে যাও। নইলে-ফুঁপিয়ে উঠে বলল—ফ্রান্সিসকে বাঁচানো যাবে না।
কথাটা শুনে হ্যারি বলে উঠল-রাজকুমারী—ফ্রান্সিসকে তুলে আনতে আপনি সাহায্য করুন। রাজকুমারী আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের কাঁধের নীচে হাত দিয়ে ফ্রান্সিসকে ডাকল—ফ্রান্সিস ? ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে চোখ খুলল। চোখ দুটো লাল।—তোমাকে রাজবৈদ্যির কাছে নিয়ে যেতে হবে। ফ্রান্সিস কোনো কথা না বলে আবার চোখ বুজল। মারিয়া ফ্রান্সিসের ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়েই বুঝেছিল প্রচণ্ড জ্বর ফ্রান্সিসের। ফ্রান্সিস আবার মাথা দু’একবার এপাশ-ওপাশ করে গোঙাল।
