এবার হ্যারি শাঙ্কোকে বলল—শাঙ্কো—একমুহূর্তেও দেরি করা চলবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফ্রান্সিসের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যাও—কাভাল্লিকে ডেকে নিয়ে এসো। শাঙ্কো ছুটে চলে গেল। একটু পরেই কাভাল্লিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলো।
ততক্ষণে জাহাজের সেই দ্রুত গতি পড়ে গেছে। জাহাজ আস্তে আস্তে চলল জাহাজঘাটার দিকে। হ্যারি শাঙ্কো আর কাভাল্লি জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তিন-চারজন ভাইকিং বন্ধু কাঠের পাটাতনটা হাতে নিয়ে তৈরি হ’ল। আস্তে আস্তে জাহাজটা পাথুরে ঘাটটার গায়ে এসে লাগল। একটা বেশ জোর ঝাঁকুনি খেয়ে জাহাজটা থেমে গেল। দ্রুত পাটাতন ফেলা হ’ল। ঘড়ঘড় শব্দে নোঙ্গর ফেলা হ’ল। পাটাতন দিয়ে হারি ওরা দ্রুত পায়ে জাহাজ ঘাটায় নামল। নামতে নামতে কাভাল্লি বলল—সত্যি তোমরা বীরের জাতি। অসম্ভবকে সম্ভব করলে। এত তাড়াতাড়ি জাহাজ চালিয়ে এলে ভাবাই যায় না। হ্যারি ম্লান হেসে বলল—আমরা ভাইকিং—আমরা যা সংকল্প নিই—তা করে তবে ক্ষান্ত হই। মোটামুটি সমতল পাথর বাঁধানো রাস্তায় উঠতেই তিনজন সৈন্য এগিয়ে এসে ওদের থামতে ইঙ্গিত করল। হ্যারি রা দাঁড়িয়ে পড়ল। হ্যারি চিন্তায় পড়ল। সৈন্যরা আটকে দিলে ঝামেলায় পড়তে হবে। হ্যারি কাভাল্লিকে বলল-কাভাল্লি আমি ভালো করে গ্রীক ভাষা বলতে পারবো না। তুমি একটা কথাই ওদের বোঝাও যে আমরা ভাইকিং। জাহাজে আমাদের এক বন্ধু মরণাপন্ন। তার সুচিকিৎসার জন্যে আমরা এখানকার রাজা ডিউক মার্কোকে অনুরোধ করতে যাচ্ছি।
সৈন্য তিনজন কোমরবন্ধ থেকে তলোয়ার খুলল। হ্যারি দের ঘিরে দাঁড়াল। হ্যারি ওরা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। সৈন্যদের একজন গ্রীক ভাষায় বলল—তোমরা কারা? এখানে এসেছো কেন? এবার কাভাল্লি একটু এগিয়ে গেল সৈন্যদের দিকে। হ্যারি যা বলে দিয়েছিল তাই গড় গড় করে বলে গেল। সৈনিকদের একজন বলল—কিন্তু তোমরা বিদ্রোহী এনরিকোর গুপ্তচরও তো হতে পারো। এবার হ্যারি ভাঙা ভাঙা গ্রীক ভাষায় বলল—কে বিদ্রোহী এনরিকো?আমরা এনরিকোর নামই শুনি নি। হ্যারি বুঝল এখন মিথ্যে কথা না বলে উপায় নেই। সৈন্যরা ওদের যত দেরি করিয়ে দেবে ফ্রান্সিসের বিপদ তত বাড়বে। সৈন্য তিনজন পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। হ্যারির কথা যে জন্যেই তোক ওরা বিশ্বাস করল। খোলা তলোয়ার কোমরে গুঁজে রাখল। একজন সৈন্য বলল—যাও তবে রাজা মার্কোর রাজসভা শুরু হতে এখনও ঘণ্টা দুয়েক বাকি। সৈন্য তিনজন চলে গেল। হ্যারি বলল—শাঙ্কো—যা বুঝছি—এখন রাজার সাহায্য চাইতে গেলে অনেক সময় নষ্ট হবে!দু’ঘণ্টা পর রাজা রাজসভায় আসবেন। বেশ সময় যাবে রাজাকে আমাদের আবেদন জানাতে। তিনি আমাদের আবেদনে সাড়া দেবেন কিনা তাও আগে থেকে বলা সম্ভবনা। যদি সাড়া না দেন তাহলে ঘণ্টা তিনেরও বেশি সময় নষ্ট হবে। অথচ ফ্রান্সিসের শরীরের যা অবস্থা তাতে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করা চলবে না। শাঙ্কো ভাবল কথাটা। বলল—এখন কী করবে তাহলে?
—এইনগরে একজন ভালো বৈদ্যিকে খুঁজে বের করতে হবে। হ্যারি বলল। তারপর কাভাল্লিকে বলল—কোনো ভালো বৈদ্যিকে চেনেনা তুমি? কাভাল্লি মাথা নাড়ল।
—ঠিক আছে—চলো। হ্যারি পাথর বাঁধানো রাস্তা ধরে দ্রুত পায়ে চলল। রাস্তায় কত লোকচলাচল করছে। হ্যারির সেদিকে চোখ নেই। ও খুঁজছে একটা ওষুধের দোকান। হ্যারি দু’পাশে তাকাতে তাকাতে চলেছে। হঠাৎ ওর নজরে পড়ল একটা ঝাকড়া মাথা গাছের নীচে পাথর বাঁধানো বেদীমতো। তার ওপর কিছু শুকনো আর টাটকা গাছ গাছড়া। নানা রকম শুকনো শেকড়বাকড়—এসব নিয়ে দু’জন লোক বসে আছে। দু’চারজন খরিদ্দার গাছ পাতা শেকড়বাকড় নেড়েচেড়ে দেখছে। হ্যারি দ্রুত তোক দুটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল, জিজ্ঞেস করল—এসব কি ওষুধ তৈরির গাছ-গাছড়া? লোক দুটি কথাটা কিছু বুঝল। মাথা নেড়ে একজন বলল, হ্যাঁ।
—এই নগরের বৈদ্যিরা এসব কেনেন—তাই না? হ্যারি বলল। লোকটি আবার মাথা নেড়ে বলল—হ্যাঁ।
—এখানকার কোনো ভালো বৈদ্যিকে চেনো? হ্যারি বলল। লোকটি মাথা নেড়ে বলল—পাসকাতোর-রাজবদ্যি।
—কোথায় থাকেন পাসকারে। হ্যারি জানতে চাইল। লোকটা এবার হাত নেড়ে নেড়ে কি গড় গড় করে বলে গেল। হ্যারি সব কথা বুঝল না। কাভাল্লির দিকে তাকাল। কাভাল্লি—মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-বুঝেছি—পাসকালতারমানে রাজবৈদ্যি থাকেন কাছেই। চলো আমার সঙ্গে। তিনজনে পথ দিয়ে চলল। কিছুটা যেতেই একটা মোড় পড়ল। মোড়ের ডান পাশে একটা সবুজ ঘাসে ঢাকা উপত্যকা মতো। কাভাল্লি উপত্যকা দিয়ে চলল। পেছনে হ্যারি আর শাঙ্কো।
দু’পাশে উঁচু উঁচু টিলামতো। তার মাঝখানে দিয়ে পথ। ওরা চলল। কিছুটা যেতেই কাভাল্লি এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। একটা উঁচু পপলার গাছের নীচে পাথরের বাড়িঘর কিছু। কাভাল্লি সেদিকে চলল। একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। দেখা গেল বাইরের ঘরের দরজা খোলা। কিছু লোকজন ঘরে বসে আছে। কাভাল্লি এগিয়ে গিয়ে সেই লোকজনের সঙ্গে কথা বলল। হ্যারি দের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল—এটাই রাজবৈদ্যির বাড়ি। উনি এখনি আসবেন।
হ্যারি ও শাঙ্কো ঘরটায় ঢুকল। দেখল ঘরের একদিকে—একটা পাথরের বেদীমতো। তাতে পাখির পালকের আসন পাতা। আর একপাশে পাথরের তাকওলা আলমারিমতো। তাতে অনেক কাঠের কৌটো রাখা। নীচের তাকে অনেক শুকনো শেকড়বাকর রাখা। ঘরটার ওপাশের দরজা দিয়ে দেখা গেল উঠানমতো। তা’তে পাথর পাতা উনুন জ্বলছে। বিরাট বড়ো মাটির গামলামতো কী বসান। তাতে নানা গাছপাতা সেদ্ধ হচ্ছে। গামলা থেকে ধোঁয়া উঠছে। হ্যারি বুঝল-কাঠের কৌটোগুলো ওষুধের কৌটো। উনুনে জ্বাল দিয়ে ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে।
