ওদিকে মাস্তুলের মাথায় উঠে পড়েছে নজরদার পেড্রো। আট-দশজন ভাইকিং মাস্তুলে পালের কাঠ দড়িদড়া বেয়ে উঠে পড়েছে। সব ক’টা পাল টান টান খুলে দিল। বাড়তি দু’টো পালও লাগাচ্ছে, তখনই শুনল দাঁড় ঘর থেকে বন্ধুদের ও—হো—হো— ধ্বনি। ওরাও চিৎকার করে জবাব দিল—ও—হো—হো—। বাড়তি দুটো পাল লাগানো হল। সব পালগুলো ফুলে উঠল বাতাস লেগে। জাহাজের গতি আরো বাড়ল।
রাত শেষ হয়ে এলো। পুবের আকাশে লাল রঙ ধরল। তখনই হঠাৎ দক্ষিণ মুখো বাতাস খুব জোরে ব’য়ে এলো। ফুলে উঠল পালগুলো। ডেক-এ দাঁড়ানো ভাইকিংরা বাতাসের বেগ দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল—ও—হো—হো—। দাঁড়ঘরে সেই ধ্বনি পৌঁছল। ওরাও চিৎকার করে সাড়া দিল। জাহাজটা যেন জল ছুঁয়ে উড়ে চলল।
আস্তে আস্তে পুব আকাশে সূর্য উঠল। নরম রোদ এসে পড়ল সমুদ্রের ঢেউয়ে জাহাজের গায়ে।
দাঁড়ঘরে তখনও চলছে পূর্ণোদ্যমে দাঁড় বাওয়া। বিস্কোর গলা ভেঙে গেছে। তালে তালে দুলতে দুলতে ওর শরীর যেন আর সাড়া নেই। তবুও ও একটু থেমে থেমে দম নিয়ে নিয়ে গেয়ে চলেছে ওদের চারণ কবিদের গান। দাঁড়িরা ঘেমে নেয়ে উঠেছে যেন। জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। দম নেই যেন আর। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যেও থামছে না কেউ। শরীরের সমস্ত শক্তি উজাড় করে দিয়ে ওরা দাঁড় বেয়ে চলেছে।
এর মধ্যে হ্যারি একবার অসুস্থ ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে গিয়েছিল। দেখল ফ্রান্সিসের শিয়রে পাথরের মূর্তির মতো মারিয়া ফ্রান্সিসের ডান হাতটা কোলে নিয়ে বসে আছে। পায়ের কাছে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে বসে আছে ওদের জাহাজের বদ্যি। বদ্যি তার জ্ঞানমতো চিকিৎসার সব ব্যবস্থাই করেছে। কিন্তু তাতে বোধহয় ফ্রান্সিসের খুব একটা উপকার হয় নি। হ্যারি দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই দেখল ফ্রান্সিস অসহ্য ব্যথায় মাথা এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। কষ্টের গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এলো ফ্রান্সিসের মুখ থেকে। ফ্রান্সিসের চিরসঙ্গী হ্যারি কতবার দেখেছে কী প্রচণ্ড কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করেছে ফ্রান্সিস আজকের কষ্ট বোধহয় এত প্রচণ্ড এত যন্ত্রণাদায়ক যে ফ্রান্সিসের মতো শক্ত ধাতুতে গড়া মানুষও তা সহ্য করতে পারছে না। ফ্রান্সিসকে এত অসহায় এত ব্যথাকাতর হ্যারি কোনোদিন দেখে নি। ফ্রান্সিসের এই কষ্ট হ্যারি আর দেখতে পারল না। মুখ চোখ দুহাতে চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল হ্যারি পাছে ওর কান্নার শব্দ ফ্রান্সিস বা মারিয়ার কানে যায় এই ভয়ে এক ছুটে হ্যারি সেই ঘর থেকে পেরিয়ে এলো।
সিঁড়ি দিয়ে ডেক-এ উঠতে উঠতেই হ্যারি দেড্রোর খুশির চিৎকার শুনতে পেল—ডাঙা—ডাঙা দেখা যাচ্ছে। হ্যারি লাফিয়ে সিঁড়ি পার হয়ে ডেক-এ উঠে এলো। ছুটল, রেলিঙের দিকে। ততক্ষণে পালের তদারকিতে যারা পালের কাঠে বসে পাল এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে বেশ বাতাস ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল তারা চিৎকার করে উঠল—হো-ও-ও। দাঁড়িঘরেও চিৎকার উঠল—হো-ও-ও। সারা জাহাজে খুশির হাওয়া বইল। জাহাজ দ্রুত এগিয়ে চলল ডাঙার দিকে।
রেলিঙে ঝুঁকে হ্যারি দেখতে লাগল ডাঙার অবস্থা। জাহাজঘাটা এদিকটাতেই। তিনটে ছোটো জাহাজ জাহাজঘাটায় দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজঘাটার পরেই বেশ সমতল একটা পাথরকুচি ছড়ানো রাস্তা চলে গেছে।
জাহাজ আরো কাছে আসতে হ্যারি দেখল জাহাজঘটার পরে রাস্তায় দু’খানা পাথরের বাড়িঘর। লোকজন পথে যাতায়াত করছে। দু’তিনজন সৈন্যকেও দেখল জাহাজঘাটার দিকে হেঁটে আসছে। পরনে গ্রীক সৈন্যদের মতোই লোহার বর্ম উষ্ণীব।
জাহাজ চালক হালের চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে ডাকল—হ্যারি হ্যারি ছুটে ওর কাছে গেল। চালক বলে উঠল শিগগির পাল গোটাতে বলো। দাঁড় বাওয়া বন্ধ করতে বলো—নইলে যে গতিতে জাহাজ ছুটছে পাথুরে জাহাজঘাটায় ধাক্কা খেয়ে জাহাজ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে ডেক-এর উপর দিয়ে ছুটল দাঁড়ঘরের দিকে। যেতে যেতে ওপরের দিকে পালের কাঠে খুঁটিতে বসা ভাইকিং বন্ধুদের চিৎকার করে বলতে লাগল—শিগগির পাল গোটাও—পাল গোটাও। ওরা সঙ্গে সঙ্গে পালের দড়ি ধরে টানাটানি করে পাল গুটিয়ে ফেলতে লাগল।
হ্যারি ছুটে এলো দাঁড়ঘরে। দাঁড়িরা তখনও প্রাণপণে দাঁড় বেয়ে চলেছে। হ্যারি চিৎকার করে বলল—ভাইসব—ডাঙা-ডাঙায় এসে গেছি। দাঁড় বাওয়া বন্ধ করো। দাঁড়িরা দাঁড় বাওয়া বন্ধ করল। হ্যারি দেখল বিস্কোর গলা ভেঙে গেছে। তবুও ফ্যাসফ্যাসে গলায় ও গান গেয়ে চলেছে। দাঁড়িদের উৎসাহ জোগাচ্ছে। হ্যারি ছুটে বিস্কোর কাছে গেল। চেঁচিয়ে বলল—বিস্কো ডাঙা দেখা গেছে। নাক্সোস-এ পৌঁছে গেছি আমরা। বিস্কো গান থামাল। হ্যারির দিকে তাকাল। তারপর সমস্ত গা ছেড়ে দিয়ে কাঠের মেঝেয় পড় পড় হ’ল। হ্যারি দু’হাত ওকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু বিস্কোর দেহে কোনো সাড় নেই। ও চোখ বুঝে আছে। অজ্ঞান হয়ে গেছে। হ্যারি বরাবরই শরীরের দিক থেকে দুর্বল। ও বিস্কোর শরীরের ভার ধরে রাখতে পারল না। আস্তে আস্তে বিস্কোকে কাঠের মেঝেয় শুইয়ে দিল। বিস্কো প্রচণ্ড ক্লান্তিতে চোখ বুজে হাত পা ছড়িয়ে কাঠের মেঝেয় শুইয়ে রইল। হ্যারি দেখল—সব দাঁড়িরা কেউ কাঠের আগুনে শুয়ে। কেউ দাঁড়ের গায়ে মাথা রেখে বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউ কাঠের মেঝেয় শুয়ে পড়েছে। কারো শরীরে কোনো সাড়া নেই। সারারাত না ঘুমিয়ে এতক্ষণ একটানা প্রাণপণে দাঁড় চালিয়ে সকলেই অসহ্য ক্লান্তিতে হাত পা ছেড়ে গেছে। ফ্রান্সিসের প্রতি এই বন্ধুদের এই গভীর ভালোবাসা দেখে হ্যারি অবাক হয়ে গেল। ও আর কাউকে ডাকল না। বিশ্রাম করুক ওরা। হ্যারি আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে ডেকে-এ উঠে এলো। এতক্ষণে হ্যারি বুঝল ও নিজেও কম ক্লান্ত নয়। ডেকেই শরীর এলিয়ে পড়তে চাইছে। কিন্তু এখনও বিশ্রামের সময় আসে নি। আসল কাজ এখনও বাকি। ওকে ডেক এ উঠে আসতে দেখে কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু ছুটে এলো। শাঙ্কোও ছিল তার মধ্যে। বলল—হ্যারি এখন কী করবে? হ্যারি ক্লান্তস্বরে বলল—জাহাজ ঘাটে লাগলে আমি তোমাকে নিয়ে নামবো। কাভাল্লিকেও সঙ্গে নেবো। ও থাকলে সুবিধে। ও এখানকার রাজা রাজবাড়ি পথ-ঘাট চেনে।
