হ্যারি চোখ মুছল। সত্যিই তো। এই মুহূর্তে ভেঙে পড়লে চলবে কেন। হঠাৎ ওর কাভাল্লির কথা মনে হ’ল। চারিদিকে তাকাল হ্যারি দেখল দরজায় হাত রেখে কাভাল্লি বিষণ্ণমুখে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যারি ডাকল—কাভাল্লি এদিকে এসো। কাভাল্লি এগিয়ে এসে হ্যারির সামনে দাঁড়াল। হ্যারি বলল—
—কাভাল্লি-খানিয়া পৌঁছতে আমাদের আর ক’দিন লাগবে?
কাভাল্লি একটু ভেবে বলল—তা দিন তিন-চার।
—কিন্তু ততদিন তো—হ্যারি বলল—আচ্ছা—এই সমুদ্রপথে ধারে কাছে কোনো বন্দর বা দ্বীপ নেই? কাভাল্লি মাথা নিচু করে একটু ভাবল। তারপর মাথা তুলে বলল উত্তর ক্রীটের একটি লম্বাটে অংশ এই সমুদ্রের দিকে বেরিয়ে আছে। ঠিক তার মাথায় আছে নাক্সোস নামে একটা শহর বন্দর। আমি মাত্র একবার খানিয়া থেকে নাক্সোসে এসেছিলাম। তখন নাক্সোসে রাজত্ব করছিলেন একজন ভেনিসের ডিউক ডিউকমার্কো। মার্কো সম্বন্ধে যতটুকু শুনেছি—ভেনিসের ডিউক হলেও উনি ক্রীট দেশীয় প্রজাদের মঙ্গলই করেছেন।
—ঠিক আছে হ্যারি বলল—এখন বলো নাক্সোস বন্দরশহর কেমন। ওখানে ভালো চিকিৎসক পাওয়া যাবে কি না।
তা পাবেন বৈ কি। বড়ো বন্দর শহর। অনেক ভেনিসীয় মানুষের বাস। তারা সুশিক্ষিত। তাদের মধ্যে ভালো চিকিৎসক নিশ্চয়ই আছে। কাভাল্লি বলল।
—এখন নাক্সোস পৌঁছতে কত সময় লাগবে?হ্যারি জানতে চাইল। কাভাল্লি আবার মাথা নিচু করে কী হিসেব করল। তারপর মাথা তুলে বলল—গ্রামভাউসা থেকে বেশ দূরে চলে এসেছি আমরা। এখন জাহাজ দক্ষিণ মুখো ঘোরাতে হবে। একটু দ্রুত জাহাজ চালাতে পারলে আমরা কাল সন্ধের মধ্যেই নাক্সোস পৌঁছে যাবো।
—না—না—হ্যারি মাথা নেড়ে বলল—যে করেই হোক আমাদের কাল সকালের মধ্যে নাক্সোস পৌঁছতে হবে। কাভাল্লি বলল—রাত তো প্রায় শেষ হয়ে এলো। পারবেন অত তাড়াতাড়ি জাহাজ চালিয়ে পৌঁছতে।
—পারতেই হবে। ফ্রান্সিসকে সুচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেই হবে। হ্যারি বলল। এবার হ্যারি ঘরের বাইরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইকিং বন্ধুদের দিকে তাকাল। সবার মুখের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে নিল। হ্যারি আস্তে আস্তে দু’হাত ওপরে তুলল। তারপর একটু গলা জড়িয়ে বলতে লাগল ভাইসব—আমাদের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ফ্রান্সিস গুরুতর অসুস্থ। ওকে বাঁচাতে হলে এক্ষুণি যতটা সম্ভব দ্রুতবেগে দক্ষিণ মুখো জাহাজ চালাতে হবে। কাভাল্লি বলছে—নাক্সোস পৌঁছোতে কাল সন্ধে হয়ে যাবে। কিন্তু আজ ফ্রান্সিস এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের নাক্সোস পৌঁছোতে হবে। সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। একটু থেমে হ্যারি বলল—ভাইসব, আমরা সময়কে জয় করবো। এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে জাহাজ চালাও। কাল সকালের মধ্যে আমাদের নাক্সোসে পোঁছোতেইহবে। ফ্রান্সিসকে তোমরা কত ভালোবাসা আজকের পরীক্ষার দিন এসেছে। হ্যারি আবেগপ্লুতস্বরে সব ভুলে চিৎকার করে বলে উঠল—ভাইসব—প্রচন্ড বেগে জাহাজ চালাও-সময়কে জয় করবো আমরা। হ্যারির চিৎকার কানে যেতে প্রায় অচেতন ফ্রান্সিস মাথাটা এপাশ-ওপাশ করে চোখ মেলে তাকাল। দুর্বলস্বরে ডাকল মারিয়া। মারিয়া এতক্ষণ মাথা নীচু করে আস্তে আস্তে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ফ্রান্সিসের ডাক কানে যেতে দ্রুত ফ্রান্সিসের মুখের ওপর ঝুঁকে ডাকল—ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস একটুক্ষণ মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মারিয়া বলল—ফ্রান্সিস শরীর খুব খারাপ লাগছে?ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না। আস্তে আস্তে দু’চোখ বন্ধ করল, নির্জীবের মতো শুয়ে রইল। ওর মুখে থেকে গোঙানির শব্দ ভেসে আসতে লাগল। মারিয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আবার জলপট্টি দিতে লাগল।
অন্য সময় হলে ভাইকিং বন্ধুরা হ্যারির কথা শুনে ও—হো—হো—শব্দের চিৎকার করে উঠতো। কিন্তু এই ঘরে প্রায় অজ্ঞান ফ্রান্সিসের সামনে ওরা কোনো শব্দ করতে চাইল না। সবাই ছুটল যে যার কাজে। হ্যারি কাভাল্লিকে নিয়ে প্রায় ছুটে জাহাজের ডেক এ চলে এলো। দু’জনে ছুটে এলো জাহাজ-চালকের কাছে। হ্যারি জাহাজ চালককে বলল কাভাল্লিকে এনেছি। ও যেদিকে যে পথে জাহাজ চালাতে বলে চালাও। কাভাল্লি এগিয়ে এসে জাহাজ-চালকের সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
হ্যারি আকাশের দিকে তাকাল। দেখল অন্ধকার আকাশ মেঘহীন। হাজার হাজার তারা জ্বল জ্বল করছে। হাওয়া বইছে একটু কমে জোরে। জাহাজের গতি বাড়াতে হলে দাঁড় টানতে হবে।
ওদিকে সব ভাইকিংরা প্রচণ্ড তৎপরতায় কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল। একদল চলে গেল দাঁড় ঘরে। দাঁড়ে হাত লাগাল। বিস্কো দুসারি দাঁড়িদের মাঝখানে দাঁড়াল। তারপর দাঁড় টানার তালে তালে বিস্কো শরীরমাথা তালে তালে দুলিয়ে শুরু করল ওদের চারণ কবিদের গান। দাঁড়িদের মধ্যে জাগল প্রচণ্ড উৎসাহ। সমুদ্রের জলে ছপ ছপ শব্দ উঠল। একে বাজছে দেশের কথা গানের পাগল করা সুর, অন্যদিকে অসুস্থ ফ্রান্সিসকে সকালের মধ্যেই বন্দর শহর নাক্সোসে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা। বিস্কোর গান চলল। দাঁড় বওয়া চলল—ছপ ছপ শব্দ জলে। বিস্কো হঠাৎ তালের ছন্দ বাড়িয়ে দিল। তাল মেলাতে আরো দ্রুত দাঁড় টানতে হল দাঁড়িদের। এতে ওরা খুশিই হ’ল। ওরা উৎসাহে চিৎকার করে উঠল—, ও—হো—হো—একজন দাঁড়ি চেঁচিয়ে বলল—বিস্কো আরো জোরে। বিস্কো গানের তাল আরো বাড়াল। দাঁড়িরা চিৎকার করে উঠল—ও—হো—হো—। অতি দ্রুত দাঁড় পড়তে লাগল সমুদ্রের জলে। জাহাজের গতি অনেক বেড়ে গেল। বিস্কো একটু গান থামিয়ে তালের সঙ্গে দুলতে দুলতে চিৎকার করে বলে উঠল—ফ্রান্সিসকে বাঁচাবো আমরা। সময়কে জয় করবো। সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল—ও—হো-হো—। জাহাজ চলল পূর্ণ বেগে।
