হ্যারি আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের পায়ের কাছে বিছানায় বসল। কম্বলটা দিয়ে ভালো করে ফ্রান্সিসের পাদুটো ঢেকে দিল।
রাত বাড়তে লাগল। ফ্রান্সিসের তখন একআচ্ছন্ন অবস্থা চলেছে। ও কোথায় আছে—এখন রাত না দিন কোনো বোধই ওর নেই।
হঠাৎ ফ্রান্সিসের মনে হ’ল শরীরটা যেন খবু হালকা হয়ে গেছে। হাতের আঙ্গুলের জ্বালা যন্ত্রণা আর নেই। হালকা শরীর নিয়ে ও যেন ওর দেশের বাড়ির ফুলের বাগানে আস্তে আস্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পায়ের নীচে নরম ঘাস। দিনটা একটু কুয়াশা জড়ানো সূর্যের আলো নিস্তেজ। হঠাৎ সদর দরজা খুলে মা বেরিয়ে এলো। কুয়াশায় অস্পষ্ট দেখাচ্ছে মাকে। তবে মা’র মুখ পোশাক মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। মা আরো এগিয়ে এলো। ওর দিকেই। সেই ছোটোবেলা মা’র যেমন মুখ দেখতো। সেই বয়েসের মা। এবার পোশাকটা দেখা গেল। কাঁধ পর্যন্ত ঢেউ তোলা চক্চকে জমকালো পোশাক। এরকম পোশাক পরেই মা রাজবাড়ির উৎসবে, ভোজে, অনুষ্ঠানে যেতো। পরে অবশ্য এসব পোশাক মা কমই পরতো। রাজবাড়িতেও কম যেতো। ফ্রান্সিস ভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে ছুটল মা’র দিকে। হঠাৎ একঝলক জোর হাওয়া এলো। ভেজা ভেজা খুব ঘন কুয়াশা ছুটে এলো। মা তখন হাসি মুখে দু’হাত সামনে ছড়িয়ে ওকে ডাকছে। ঘন কুয়াশায় মা ঢাকা পড়ে গেল। ফ্রান্সিস ও হোঁচট খেয়ে ভেজা ঘাসে পড়ে গেল। ঘন কুয়াশায় সাদাটে অন্ধকারে সব ঢেকে গেল। ফ্রান্সিস আর্তস্বরে ডেকে উঠল মা। সত্যি—ফ্রান্সিসের গলা থেকে বেরিয়ে এলো—মা—ফ্রান্সিস চোখ খুলল।
মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিসের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। বলল—ফ্রান্সিস—কী হয়েছে। ফ্রান্সিস কিছু বলল না। চোখ বুজল।
মারিয়া এবার ফ্রান্সিসের জল ভেজা কপালে হাত দিল। কী গরম। জলপট্টির জল মুহূর্তে শুষে যাচ্ছে। হ্যারি ও ফ্রান্সিসের মা’ ডাক শুনে তাকিয়েছিল। মারিয়া ভয়ার্ত চোখে ওর দিকে তাকাতেই হ্যারি দ্রুত সরে এসে ফ্রান্সিসের গলায় বুকে হাত দিল। প্রবল জ্বর। ভয়ে হ্যারির মুখ শুকিয়ে গেল। হ্যারি বলল—রাজকুমারী—জলপট্টি দিতে থাকুন। আমি বৈদ্যিকে নিয়ে আসছি।
হ্যারি বৈদ্যির কাছে যাওয়ার পথে বিস্কোর কেবিনঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়ে জোরে ডাকল—বিস্কো—ফ্রান্সিসের শরীর খুব খারাপ। বিস্কোর ঘুম ভেঙে গেল ও ছুটে ঘরের বাইরে এলো। তারপর ছুটল ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরের দিকে। হ্যারির ডাকাডাকি ছুটোছুটি বৈদ্যির দ্রুত ছুটে আসা দু’জন একজন করে সব ভাইকিংদের ঘুম ভেঙে গেল। সবাই জানল—ফ্রান্সিসের শরীর খুব খারাপ। সবাই এল ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের কাছে। ঘরের ভেতরে জায়গা কম। ঘরে পথে সবাই ভীড় করে দাঁড়াল। কারো মুখে কথা নেই।
বৈদ্যি ফ্রান্সিসের গলায় বুকে হাত দিয়ে দেখল। কম্বল সরিয়ে পায়ের পাতায় হাত চেপে দেখল। তারপর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—জুর অতো বেড়েছে। তবে কালকের দিনটা দেখতে হবে। ব’লে কোমরের ফেট্টি থেকে একটা মোটা কাপড়ের থলে বের করল। থলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দুটো কালো বড়ি বের করে মারিয়ার হাতে দিল। বলল—এখন একটা বড়ি আর ঘণ্টা চারেক পরে আর একটা বড়ি খাইয়ে দিন। জ্বর আর বাড়বে না। জ্বালা যন্ত্রণা কমবে। তবে কথাটা আর শেষ করল না।
হ্যারি ঘরের কোণায় রাখা কাঠের পাত্র থেকে কাঠের গ্লাসে জল ভরে মারিয়াকে দিল। মারিয়া জলের গ্লাস নিয়ে আস্তে আস্তে ডাকল—ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে চোখ খুলল। মোমবাতির আলোয় মারিয়া দেখল চোখ দুটো টকটকে লাল। মরিয়া চমকে উঠল। ওর হাত কেঁপে উঠল। গ্লাস পড়ে যায় যায়। বৈদ্যি গ্লাসটা ধরে ফেলল। মারিয়া মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে উঠল। বৈদ্যি মারিয়ার হাত থেকে বড়ি দু’টো নিল। ফ্রান্সিসের মুখের ওপর ঝুঁকে বলল—ফ্রান্সিস এই ওষুধটা খেয়ে নাও। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে শুকনো ঠোঁট দুটো ফাঁক করল। বৈদ্যি মুখে জল ঢেলে বড়িটা খাইয়ে দিল। অন্য বড়িটা হ্যারি হাত বাড়িয়ে বৈদ্যির কাছ থেকে নিয়ে নিজের কাছে রাখল।
বৈদ্যি চলে গেল। ফ্রান্সিসের সব ভাইকিং বন্ধুরা নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। হ্যারি ওদের দিকে তাকিয়ে বলল—তোমরা যাও। শুয়ে পড়ো। আমি আর রাজকুমারী এখানে থাকবো। বিস্কো বলে উঠল—আমরা আজ রাতে কেউ ঘুমুবো না। সবাই এখানে থাকবো। হ্যারি আর কিছু বলল না। ও তো জানে বন্ধুরা ফ্রান্সিসকে কী ভালোবাসে!
হ্যারি চিন্তায় পড়ল। ওদের জাহাজের বৈদ্যি যা বলছে তাতে ওর ওপর তো আর ভরসা করা যাচ্ছে না। অথচ খানিয়া এখনও কতদূর কে জানে। ওখানে পৌঁছে ভালো বৈদ্যি দিয়ে চিকিৎসা করাবার আগেই হয় তো ফ্রান্সিস—হ্যারি আর ভাবতে পারলো না। ওর চোখ ফেটে জল এলো। এত বুদ্ধিমান সাহসী শক্তিধর পুরুষ ফ্রান্সিস—এমন নিষ্পাপ ফুলের মতো হৃদয়ের মানুষ ফ্রান্সিস স্বদেশ স্বজন থেকে এই বিদেশে এক সমুদ্রের বুকে ওদের অসহায় চোখের সামনে মারা যাবে? হ্যারি দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মারিয়া তো তখন থেকে মাথাই তোলে নি আর।
বিস্কো ছুটে এসে হ্যারির কাঁধে হাত রেখে আস্তে আঁকুনি দিয়ে বলল—হ্যারি তুমি যদি এই সাংঘাতিক বিপদের মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়ো তাহলে কার ওপর আমরা ভরসা রাখবো? বিস্কো যতই বলুক হ্যারির মতো অনেক ভাইকিং বন্ধুরই দু’চোখে জল দেখা গেল। বিস্কো বলল—হ্যারি আমাদের আবাল্য বন্ধু ফ্রান্সিস জীবনে কখনও কারো প্রতি কোনো অন্যায় আচরণ করেনি—নিজের জীবন বিপন্ন না হলে কখনও কাউকে অস্ত্রাঘাত করে নি, তার এভাবে এত করুণভাবে মৃত্যু হতে পারে না। অসম্ভব।
