রাতে খাওয়ার সময় হ’ল। মারিয়া এর মধ্যে দু’একবার ডেক-এ উঠেছিল। তারপর এমব্রয়ডারি নিয়ে বসেছিল। ফ্রান্সিস এতক্ষণ বেশিরভাগ সময়ই চোখ বুজে শুয়ে থেকেছে। তাই মারিয়া ওকে, বিশ্রাম করছে মনে করেছে। ডাকেও নি। বুঝতেও পারে নি যে ফ্রান্সিসের শরীর খারাপ।
এখন খাওয়ার সময় হতে ডাকল—চলো খেয়ে আসি। ফ্রান্সিস আস্তে বলল—এখানেই খাবার নিয়ে এসো। মারিয়া ভাবল সেই ভালো। ফ্রান্সিসের আর হাঁটাচলা করে দরকার নেই। এখানেই বিছানাতে বসেই খেয়ে নিক।
মারিয়া কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে এলো। একটু পরেই দু’প্লেট রুটি মাংসের ঝোল সবজি নিয়ে এলো। বিছানায় একটা পরিষ্কার কাপড় পেতে রাখল সেসব। ওদের রাঁধুনি বন্ধু কাঁচের গ্লাসে জল রেখে গেল। মারিয়া ডাকল—ওঠো খেয়ে নাও। ফ্রান্সিস মনে মনে হাসল। ওর শরীর যে এখন এত খারাপ এখনও মারিয়া তা জানে না। জানলে এক্ষুণি চ্যাঁচামেচি শুরু করবে।
ফ্রান্সিস উঠে বসল। স্পষ্ট বুঝল মাথাটা বেশ ঘুরছে। তবু মারিয়াকে কিছু বুঝতে না দিয়ে রুটি ছিঁড়ে মাংস খেতে শুরু করল। কিন্তু পারল না। মুখ বিষ তেতো। বমি হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস শুধু ঢ ঢক্ করে জল খেল। আর বসে থাকতে পারল না। আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল। মারিয়া খাওয়া শুরু করতে গিয়ে চমকে উঠল। এক ঝটকায় সরে এসে ফ্রান্সিসের কপালে হাত দিল। বেশ গরম। প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠল—সে কি তোমার তো জ্বর এসেছে। ফ্রান্সিস চোখ বন্ধ অবস্থায়ই হাসল। বলল—ও গা গরম হয়েছে একটু। সেরে যাবে।
মারিয়ার আর খাওয়া হল না। খাবার-দাবার সরিয়ে রেখে ও ছুটল দরজার দিকে। বইরে এসে ছুটল হ্যারির কেবিনঘরের দিকে। হ্যারি তখন খাওয়া-দাওয়া সেরে সবে শুয়েছে। মারিয়া দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগল—হ্যারি—হ্যারি হ্যারি তাড়াতাড়ি ছুটে এসে দরজা খুলে দাঁড়াল। দেখল মারিয়া কেমন উদভ্রান্তের মত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও বলল—কী হয়েছে রাজকুমারী?
—ফ্রান্সিস অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শিগগির এসো। মারিয়া আর কিছু বলতে পারল না।
—বলেন কি? চলুন। হ্যারি দ্রুত ছুটল ফ্রান্সিস আর মারিয়ার কেবিনঘরের দিকে। ছুটে বিছানার কাছে এসে দেখল ফ্রান্সিস কেমন নিস্তেজ হয়ে দু’চোখ বুজে শুয়ে আছে। হ্যারি ফ্রান্সিসের কপালে গলায় হাত রাখল। বেশ জ্বর। হ্যারি আস্তে ডাকল—ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস চোখ মেলে তাকাল। হ্যারি লক্ষ্য করল চোখ দুটো বেশ লাল।
—শরীর খুব খারাপ লাগছে? হ্যারি স্নেহার্দ্রস্বরে বলল। ফ্রান্সিস শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলোল। হাসল। মৃদুস্বরে বলল—ও ঠিকহয়ে যাবে। হ্যারি আর কিছু বলল না। ও জানে ফ্রান্সিস সহজে নিজের কষ্টের কথা বলবে না। পাছে মারিয়া হ্যারি বন্ধুরা দুশ্চিন্তায় পড়ে। হ্যারি মারিয়াকে বলল—একটা ছেঁড়া কম্বলের টুকরো ঠাণ্ডা জলে ভিজিয়ে কপালে জল পট্টি দিন। আমি বৈদ্যিকে ডেকে আনছি।
হ্যারি ছুটে বেরিয়ে গেল। মারিয়াও এদিকে ছেঁড়া কম্বলের একটা টুকরো খুঁজে বের করল। গ্লাসের জলে কম্বলের টুকরোটা ভিজিয়ে আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের কপালে চেপে ধরল। একটু আরাম লাগল ফ্রান্সিসের। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জ্বরের চেয়েও ওকে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল ক্ষত-বিক্ষত হাত আঙ্গুলের যন্ত্রণা।
একটু পরেই বৈদ্যিকে সঙ্গে নিয়ে হ্যারি ফিরে এলো। বৈদ্যি ওর চিনেমাটির বোয়াম দুটো বিছানায় রাখল। এবার বিছানায় বসল। আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের দু’হাত আঙ্গুল থেকে ছেঁড়া কম্বলের পট্টিটা খুলতে লাগল। ফ্রান্সিস কঁকিয়ে উঠল। বৈদ্যি আরো সাবধান হ’ল। আস্তে আস্তে সব পট্টি খুলল। দেখল ক্ষতের জায়গাগুলো বেশ ফুলে উঠেছে। দুটো আঙ্গুল আরো ফুলেছে। চিন্তায় বৈদ্যির মুখ শুকিয়ে গেল। ও বুঝল গতিক ভালো নয়। ফ্রান্সিসের ঐ ক্ষতস্থান, ফোলা আঙ্গুল, বৈদ্যির চিন্তাগ্রস্থ মুখ এসব দেখে হ্যারির বুক কেঁপে উঠল। ও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
বৈদ্যি দু’টো বোয়াম থেকে ওষুধ নিয়ে হাতে ডলে মেশালো। একটু একটু জল দিয়ে মেশানো ওষুধটা চটচটে করল। তারপর ক্ষতস্থানে আঙ্গুলে লাগিয়ে দিতে লাগল। ওষুধ পড়তেই ফ্রান্সিস চোখ বন্ধ অবস্থায় আবার কঁকিয়ে উঠল। মারিয়া ফ্রান্সিসের কপালে হাত বোলাতে লাগল।
ওষুধ লাগানো শেষ হ’ল। ফ্রান্সিস একবারও চোখ খুলল না। নিস্তেজভাবে পড়ে রইল।
বৈদ্যি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে হ্যারি বলল—কী রকম বুঝছো?
—যদি কালকে ঘাগুলো পেকে না ওঠে তাহলে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু জ্বর এসেছে। পেকে উঠতে পারে। এখন আমার কাছে যা ওষুধ আছে এতে কতটা কাজ হবে জানি না। বৈদ্যি বলল।
—তাহলে ফ্রান্সিসের বিপদ এখনও কাটেনি। হ্যারি বলল।
—না। বৈদ্যি আস্তে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল—দেখি এই নতুন ওষুধ কাজ হয় কিনা।
বৈদ্যি বোয়াম নিয়ে চলে যাবার সময় বলল—জলপট্টি দিতে থাকো। জুর বাড়তে দিও না।
মারিয়া এবার জলের গ্লাস নিয়ে ফ্রান্সিসের শিয়রের কাছে ভালো হয়ে বসল। জলপট্টি দিতে লাগল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
এবার হ্যারির নজরে পড়ল খাবার পড়ে আছে। হ্যারি বলল—
—রাজকুমারী—আপনি কিছুই খাননি। খেয়ে নিন। আমি দেখছি। মারিয়া কোনো কথা না বলে মাথা নাড়ল। নিজের কাজ করে যেতে লাগল। বোঝাই গেল এখন কিছু খাওয়ার মতো মনের অবস্থা মারিয়ার নেই।
