মারিয়া এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। ছুটল ভাইকিং বন্ধুদের খবর দিতে। ওদিকে তখন পাহারাদার সৈন্য সবাইকে ভাইকিংরা জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। ওরা সমুদ্রতীরের দিকে সাঁতরে চলেছে। এনরিকোর সৈন্যদের যুদ্ধজাহাজের মাস্তুলটা তখন দেখা যাচ্ছে। বাকি সবটাই জলের নীচে।
মারিয়া ডেক-এ এসে চিৎকার করে বলল—ভাইসব ফ্রান্সিস এসেছে। হালের কাছে শুয়ে আছে। একটু অসুস্থ। ও বলল—শিগগির জাহাজ ছাড়ো। সব ভাইকিংরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল—ও—হো—হো—হো। তারপর ছুটল ফ্রান্সিসকে দেখতে।
ফ্রান্সিসকে ও-রকম মড়ার মতো চোখ বুজে শুয়ে থাকতে দেখে বন্ধুদের ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। হ্যারি গলা চড়িয়ে চিৎকার করে উঠল—এখন একমুহূর্ত সময় নষ্ট করা চলবে না। দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে চলে যাও। পাল তুলে দাও। জাহাজ চালাও যত দ্রুত সম্ভব। কয়েকজন ফ্রান্সিসকে কেবিনঘরে নিয়ে যাও। ফ্রান্সিসের সেবা শুশ্রূষার ব্যাপারে রাজকুমারী মারিয়াকে সাহায্য করো। যাও—জলদি। দুতিন জন গিয়ে তীরের সঙ্গে লাগানো পাটাতন তুলে ফেলল। ফ্রান্সিসকে কাঁধে নিয়ে চলল কয়েকজন। কেবিনঘরে এনে শুইয়ে দিল। দাঁড়িরা ছুটল দাঁড়ঘরের দিকে। পাল খাটানো হ’ল দ্রুত হাতে। নজরদার পেড্রো মাস্তুলের মাথায় নিজের জায়গায় উঠে গেল। জলে দাঁড় পড়তে লাগল—ছপ—ছপ। জাহাজ চলল বাইরের সমুদ্রের দিকে।
তখন উজ্জ্বল রোদ ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রের বুকে। রোদ ঝিকিয়ে উঠেছে ঢেউয়ের মাথায়। আস্তে আস্তে গ্রামভাউসা বন্দর দূরে মিলিয়ে গেল।
ফ্রান্সিসকে ভেজা পোশাক পাল্টে শুকনো পোশাক পরানো হয়েছে। জাহাজের বদ্যি এসে ফ্রান্সিসের ক্ষত-বিক্ষত দু’হাতে হলুদ রঙের মলম লাগিয়ে দিয়ে গেছে। ফ্রান্সিসের জ্বালা ব্যথা কমছে তাতে। মারিয়া চামড়ার ব্যাগ-এ গরম জল ভরে নিয়ে ফ্রান্সিসের পায়ে গায়ে সেঁক দিতে লাগল। এর মধ্যে রসুইঘরে রাঁধুনি শুধু ফ্রান্সিসের জন্যে মাংস রুটি তৈরি করে ফেলল। থালায় করে নিয়ে এলো ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে। মারিয়া ফ্রান্সিসকে ধরে আস্তে আস্তে বিছানায় বসিয়ে দিল। ফ্রান্সিস নিজেই গরম গরম রুটি মাংস খেতে লাগল। খাওয়া শেষ করে জল খেল। তারপর শুয়ে পড়ল। এতক্ষণে ফ্রান্সিসের শরীরে যেন সাড় এলো। ও চুপ করে শুয়ে রইল।
প্রায় ঘণ্টাখানেক জাহাজ চলল। এতক্ষণ হ্যারি জাহাজ-চালকের পাশেই দড়িয়ে রইল। একবার মাত্র গিয়েছিল ফ্রান্সিসকে দেখতে। তখনও ফ্রান্সিস চোখ বুজে শুয়ে আছে।
বিস্কো এসে হ্যারিকে বলল—ফ্রান্সিস এখন অনেকটা সুস্থ। হ্যারি তাড়াতাড়ি ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে এলো। দেখল ফ্রান্সিস বিছানায় বসে আস্তে আস্তে দু’-একটা কথা বলছে। হ্যারি এগিয়ে এলো। বিছানায় বসল। ফ্রান্সিসের দিকেতাকাল। তারপর ফ্রান্সিসকেদু’হাত জড়িয়ে ধরল। হ্যারির সারা শরীর থর থর করে আবেগে কাঁপছে। চোখের কোল ভিজে উঠেছে। ফ্রান্সিস দুর্বল কণ্ঠে বলল—অ্যাই—তুমিও কিমারিয়ার মতো কাঁদতে শুরু করলে? এ্যাঁ? ফ্রান্সিসকে ছেড়ে দিয়ে হ্যারি হাতের উল্টে পিঠে দু’চোখ মুছল। বলল—তোমার, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে না তো?
—না-না। ফ্রান্সিস বলল।
—এখন জাহাজ কোথায় যাবে মানে আমরা কোথায় যাবো? হ্যারি জানতে চাইল।
—খানিয়ায়। নিখোঁজ রাজমুকুটের সন্ধানে। ফ্রান্সিস বলল।-
-তাহলে তো কাভাল্লির সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়। হ্যারি বলল।
—হ্যাঁ কাভাল্লিকে ডাকো। ফ্রান্সিস একজন ভাইকিং বন্ধুকে বলল।
একটু পরেই কাভাল্লি এলো। হ্যারি বলল—
—কাভাল্লি—ফ্রান্সিস বলছিল—এখন আমরা কীভাবে খানিয়া যাবো?
—এখন আমাদের পুবমুখো যেতে হবে। ঝড়টড় না হলে আমরা তিন চারদিনের মধ্যেই ক্রীটের উত্তরে রাজধানী খানিয়ায় পৌঁছোতে পারবো। কাভাল্লি বলল।
—হ্যারি জাহাজ-চালককে বলো কাভাল্লির নির্দেশমতো জাহাজ চালাতে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল। বোঝা গেল—ফ্রান্সিসের শরীরের দুর্বলতা এখনও সম্পূর্ণ কাটেনি। মারিয়া বাদে সবাই ঘরের বাইরে চলে এলো।
হ্যারি ও কাভাল্লি জাহাজ-চালকের কাছে এসে দাঁড়াল। কাভাল্লির নির্দেশমতো জাহাজ চলল খানিয়া বন্দরের উদ্দেশে।
জাহাজ চলেছে। বিদ্রোহী এনরিকোর যুদ্ধ জাহাজ ফ্রান্সিস ডুবিয়ে দিয়ে এসেছেকাজেই এখন ভাইকিংরা নিশ্চিন্ত। এনরিকোর সৈন্যদের দ্বারা আক্রান্ত হবার কোনো ভয় নাই।
এনরিকোর যুদ্ধ জাহাজ ডোবাতে গিয়ে ফ্রান্সিসকে অনেকক্ষণকাল ঠাণ্ডা জলে মাথা ভাসিয়ে ডুবে থাকতে হয়েছে। তারপর বাটালিতে হাতুড়ি চালাতে হয়েছে। ছোট করাত চালাতে হয়েছে। হাতুড়ির ঘাও কখনও কখনও আঙ্গুলে পড়েছে। বাটালিতে করাতে দু’হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। দু’তিনটি আঙ্গুল ফুলে নীল হয়ে গেছে। জাহাজ ফুটো করবার উত্তেজনায় ফ্রান্সিস তখন এসব গায়ে মাখেনি। পরে দেখেছে ক্ষতগুলো আঙ্গুল ফোলা কোনোটাই কম নয়। জাহাজের বৈদ্যি ক্ষত জায়গায় আঙ্গুলে ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছে। ছেঁড়া কম্বলের টুকরো দিয়ে মোটা ব্যান্ডেজমতো বেঁধে দিয়েছে। তাতে একটু ব্যথা জ্বালা যন্ত্রণা কমেছে। কিন্তু একদিনের মধ্যেই ঐ ক্ষত জ্বালা ফোলা আঙ্গুল ফ্রান্সিসকে বেশ কাহিল করে দিল। মাথায় টনটনানিতে ও হাত দুটো তুলতে পারছেনা। সেদিন বিকেল থেকেই ফ্রান্সিস বুঝতে পারল শরীরটা যেন আর বশে নেই। হঠাই ক্ষতস্থানে ফোলা আঙ্গুলে ব্যথা বাড়তে লাগল। সন্ধের মধ্যেই ব্যথা প্রায় অসহ্য হয়ে উঠল। ফ্রান্সিস তবু কাউকে কিছু বলল না। ভাবল কমে যাবে। কিন্তু কমল না। সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। বুঝল জ্বর আসছে। ওর শীত শীত করতে লাগল। মোটা কম্বলমতো কাপড়টা গায়ে ঢেকে ও বিছানায় শুয়ে পড়ল।
