মারিয়া উঠে পড়ল। আস্তে আস্তে হেঁটে চলল ভাইকিং বন্দিদের দিকে। ওর পাহারাদার মাস্তুলে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছিল। মারিয়া মুক শব্দ করল—স্। পাহারাদার হকচকিয়ে উঠে দেখে সামনে মারিয়া। মারিয়া ইঙ্গিতে ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলল। চলল ভাইকিং বন্দিদের দিকে। আর পাহারাদার ওকে দেখল শুধু। কিছু বলল না। বাধাও দিল না।
হ্যারি শুয়ে ছিল। চোখ বুজে। সারারাত ঘুমোয়নি। পাতলা অন্ধকারের দিকে তাকাল এবার। ভোর হতে বেশি দেরি নেই। তখন দেখল মারিয়া ওর দিকেই আসছে। হ্যারি উঠে বসল। মারিয়া ওর কাছে এলো। হ্যারির দিকে তাকাল। কিন্তু কিছুই বলল না। রেলিঙের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর আস্তেআস্তে বলল—দেবতা এসেছিল। ওদের জাহাজ ফুটো করেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুববে। শাঙ্কোর ছুরি। হাতের দড়ি কাটো। মুক্তি। কথা ক’টা বলে মারিয়া যেমন আস্তে আস্তে এসেছিল তেমনি আস্তে আস্তে চলে গেল।
হ্যারির মন খুশিতে ভরে উঠল। কিন্তু ও বাইরে সেটা প্রকাশ পেতে দিল না। হ্যারি ফিসফিস করে ডাকল—শাঙ্কো। শাঙ্কোর ঘুম ভাঙল না। হ্যারি পা বাড়িয়ে শাঙ্কোর পায়ে দু’তিনটে ধাক্কা দিল। সতর্ক শাঙ্কোর সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেল। ও আস্তে আস্তে উঠে বসল। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল—এনরিকোর জাহাজের খোল কেটেছে ফ্রান্সিস কিছুক্ষণের মধ্যেই ঐ জাহাজ ডুববে। ছুরি বের করো। দড়ি কাটো। প্রয়োজনে লড়াই। শাঙ্কো একথা শুনে লাফিয়ে উঠতে গেল। পরক্ষণেই সাবধান হ’ল। ও হ্যারির দিকে সরে এসে শুয়ে পড়ল। হ্যারি শাঙ্কোর বুকের কাছে ঢিলে জামার মধ্যে হাত চালিয়ে ছুরিটা বের করল। শাঙ্কো ঐ ভীষণ ধারালো ছুরিটা সবসময় হাতের কাছে রাখে। ঘুমোবার সময়ও রাখে। বিপদ বুঝলেই ছুরিটা ঢোলা জামার নীচে চালান করে দেয়।
এবার শাঙ্কো খুব আস্তে আস্তে দড়ি বাঁধা হাত দুটো হ্যারির দিকে এগিয়ে ধরল। শুয়ে শুয়েই। হ্যারি দু’হাত দিয়ে ছুরিটা ধরে শাঙ্কোর হাতের দড়ি ঘষে ঘষে কাটতে লাগল। দু’জনই শুয়ে আছে আর অন্ধকারও সবটা কেটে যায়নি। পাহারাদার বুঝতেই পারল না। শাঙ্কোর হাতের দড়ি কেটে গেল। ও ছুরিটা নিয়ে আস্তে আস্তে ডেক-এর পাটাতনে একটু হিঁচড়ে গিয়ে বিস্কোর হাতের বাঁধন কেটে দিল। এবার বিস্কো ছুরিটা নিল। পাশের ভাইকিং-এর দড়ি কাটল। আস্তে আস্তে ছুরি একে ওকে চালান দিয়ে সবার দড়িই কাটা হয়ে গেল। সবশেষে কাটা হ’ল হ্যারির হাতের দড়ি।
আকাশ অনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে। পুৰ আকাশ গভীর লাল। সূর্য উঠতে দেরি নেই। হঠাৎ একজন পাহারাদার দেখল ওদের জাহাজ জলে অনেকটা নেমে গেছে। ও প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। পরক্ষণেই বুঝল ওদের জাহাজ ডুবছে। ও চিৎকার করে আর সব পাহারাদারদের ডাকল। সকলেই রেলিঙের ধারে ছুটে এলো। ও চিৎকার করে বোধহয় দলপতিকে ডাকতে লাগল।
চিৎকার ডাকাডাকিতে দলপতির ঘুম ভেঙে গেল। সে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে মেঝেয় পা ফেলে উঠতে গেল। দেখে চমকে উঠল, যে ওর পাহাঁটু জলে ডুবে গেছে। ও ভীষণভাবে চমকে উঠল—জাহাজ ডুবছে। ও জল ঠেলে ছুটল কেবিন ঘরের দরজার দিকে। তখনই মড়মড় শব্দ তুলে জাহাজটা ডানপাশে কাত হ’ল। কাত হতেই থাকল। দলপতি সিঁড়ি দিয়ে ডেক-এ উঠতে গিয়ে ছিটকে কোমর সমান জলে গিয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে জাহাজের মধ্যে জল বাড়তে লাগল। ডুবন্ত জাহাজের পাহারাদাররা আর দলপতির খোঁজ করতে নীচে নামল না। ছুটে গেল পাতা পাটাতনের দিকে। পাটাতন তখন তীরভূমি থেকে ছিটকে গিয়ে জলে ভাসছে। সৈন্যরা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাঁতরে তীরের দিকে চলল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ তখন বন্ধনমুক্ত ভাইকিংরা উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল—ও-হো-হো-হো। তারপর ছুটল হাতের কাছে যা পায় তাই জোগাড় করতে। ভাঙা দাঁড়ের কাঠ, শেকল, বড়ো বড়ো, পেরেক, লম্বা লোহার ডাণ্ডা যে যা পেল তাই নিয়ে পাহারাদার সৈন্যদের দিকে এগিয়ে চলল। পাহারাদার সৈন্যরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর তলোয়ার উঁচিয়ে ছুটে এল। ভাইকিংরা চিৎকার করে একসঙ্গে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তলোয়ার ঘায়ে দু’একজন আহত হ’ল—কিন্তু—পাহারাদারদের কয়েকজনের হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। হ্যারি চিৎকার করে বলল—কাউকে মেরো না। জলে ছুঁড়ে ফেলে দাও।
ভাইকিং বন্ধুদের চিৎকার কানে যেতেই ফ্রান্সিস বুঝল ওর পরিকল্পনামতোই কাজ হয়েছে। তখন ও আস্তে আস্তে হালের কাঠের খাঁজে খাঁজে পা রেখে ওপরে উঠতে লাগল। কিন্তু শরীর আর চলছে না। ও ওপরের দিকে তাকাল। দেখল মারিয়া হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ও অনেক কষ্টে আরো দু’ ধাপ উঠল। হাত বাড়িয়ে মারিয়ার হাত ধরল। মারিয়া কিআর ওকে টেনে তুলতে পারে?হয়ত টেনে একটু সাহায্য করা মাত্র। মারিয়ার হাত ধরে ধরে অনেক কষ্টে জাহাজে উঠেই ডেক-এর ওপর চিৎহয়ে পড়ে গেল। ফ্রান্সিসের সারা শরীর ভেজা সপসপে মাথার ভেজা চুল কপালে এসে পড়েছে। মুখ সাদা হয়ে গেছে। দু’হাত থেকে রক্ত ঝরছে। হাতুড়ি বাটালি চালাতে গিয়ে করাত ঘষতে গিয়ে ওর হাত কেটে গেছে। আঙুলে কালসিটে দাগ পড়ে গেছে। ফ্রান্সিস মড়ার মতো চোখ বুজে পড়ে রইল। ফ্রান্সিসের এই অবস্থা দেখে মারিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে চোখের পাতা খুলল। ম্লান হেসে বলল কাঁদছো কেন? এই কথা শুনে মারিয়ার কান্না বেড়ে গেল। ফ্রান্সিস খুব ক্ষীণস্বরে বলল—শিগগির জাহাজ ছাড়তে বলো। তারপর চোখ বুঝল।
