সিঁড়ি বেয়ে ডেকে-এ উঠে এলো। এবার আস্তে আস্তে হালের দিকে চলল। পাহারাদারটি বুঝল গায়ে দেবার কাপড় আনতে গিয়েছিল মারিয়া!
মারিয়া সেই জায়গায় এলো। মোট চাদরটা পেতে শুয়ে পড়ল। পাহারাদারটি ও পর্যন্ত দেখল। তারপর মাস্তুলের আড়ালে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে মারিয়া আস্তে আস্তে উঠল। চারপাশ দেখে নিল। না—কেউ নেই। হালের কাছে গেল। যে দড়িটা ধরে ফ্রান্সিস ঝুলছিল সেই দড়িটা ধরে দু’বার হ্যাঁচকা টান দিল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে বুঝল মারিয়া এসেছে। ও আস্তে আস্তে দড়ি বেয়ে হালের মাথাটার কাছে এলো। মারিয়া হাতুড়ি বাটালি করাত হাত বাড়িয়ে ধরল। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি সেসব নিয়ে দড়ি বেয়ে নেমে এলো। মারিয়া পাতা চাদরে এসে শুয়ে পড়ল। মারিয়া ভালো করেই জানে আজকে ঘুম আসবে না। তবু যেন ঘুমিয়ে আছে এরকম ভঙ্গীতে চোখ বুজে চুপচাপ শুয়ে রইল।
এবার ফ্রান্সিস ছোটো করাতটা কোমরে গুঁজল। হাতুড়ি বাটালি ঢোলা জামার বুকের কাছ দিয়ে ঢুকিয়ে রাখল। কোমরে চামড়ার বন্ধনী বাঁধা। হাতুড়ি বাটালি পেটের কাছে আটকে রইল।
ফ্রান্সিস একটু দম নিল। বেশ পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছে নিজেকে। সেই ভোর রাত থেকে এতক্ষণ জলে ডুবে আছে। শরীর দুর্বল লাগা স্বাভাবিক। তবু দু’বার খেতে পেয়েছে বলে এখনও শরীরটা ঠিক আছে।
একটু বিশ্রাম নিল ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সাঁতার না কেটে জলে কোনোরকম শব্দ না তুলে এগিয়ে চলল, এনরিকোর, সৈন্যদের যুদ্ধ জাহাজের দিকে। চাঁদের একটু উজ্জ্বল আলোয় দেখল জাহাজটার সামনের দিকে চটলা-ওঠা জায়গাটা এদিকেই। একটু এগিয়ে দেখল ঐ জাহাজের একজন পাহারাদার সৈন্য রেলিঙে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ডুব দিল। ডুব সাঁতার দিয়ে ঠিক সেই চটলা-ওঠা জায়গাটার কাছে আস্তে আস্তে ভেসে উঠল। ওপরের দিকে তাকিয়ে বুঝল জাহাজের রেলিঙে একেবারে ঝুঁকেনা পড়লে সৈন্যটি ওকে দেখতে পাবে না।
ফ্রান্সিস চলা-ওঠা জায়গাটায় হাত দিয়ে দেখল কাঠের চটুলা বেশ কিছুটা উঠেছে। তবু এত শক্ত কাঠের জাহাজের খোলা ফুটো করা কম পরিশ্রমের কাজ নয়। অথচ আজকের বাকি রাতের মধ্যে এ কাজ সারতেই হবে। এখন সমস্যা হ’ল বাটালির মাথায় হাতুড়ি মারলে বেশ শব্দ হবে। নিঃশব্দে কীভাবে কাজ সারা যায়। ও ভেবে দেখল যদি জলের একটু নীচে চটলা-ওঠা জায়গাটায় বাটালি বসিয়ে জলের মধ্যে দিয়ে হাতুড়ি দিয়ে ঘা দেওয়া যায় তাহলে অল্প শব্দই হবে। কিন্তু হলেও সে শব্দ বাইরে শোনা যাবে না।
ফ্রান্সিস হাত দিয়ে দেখে চট্রলা-ওঠা খোলার জায়গা বেছে নিল। এখানটায় চটুলা ঘেশ উঠেছে। এবার সেখানে বাটালিটা বসিয়ে জলের মধ্যে দিয়ে হাতুড়ি চালাল। বাটালির মাথায় হাতুড়ির ঘা লাগল বটে শব্দও তেমন হ’ল না। কিন্তু জলের মধ্যে দিয়ে হাতুড়ি চালানোয় ঘা-টা তেমন জোরে হ’ল না। জলের মধ্যে জিনিসের ওজন কমে যায়। তার ওপর জলের বাধা এর সঙ্গে রয়েছে জলের ওপর শরীর ভাসিয়ে রাখার সমস্যা। কাজেই ফ্রান্সিসকে দম নিয়ে নিয়ে দফায় দফায় হাতুড়ি চালাতে হ’ল।
প্রায় একঘন্টার ওপর এভাবে হাতুড়ি চালাল ফ্রান্সিস ক্লান্তিতে ফ্রান্সিসের শরীর ভেঙে আসছে। অথচ থামবার উপায় নেই। অন্ধকার থাকতে থাকতে এ কাজ সারতে হবে।
আবার আধঘন্টামতো ফ্রান্সিস হাতুড়ি চালাল। এবার ঐ জায়গাটায় হাত দিয়ে দেখল প্রায় এক আঙ্গুল মতো ফুটো হয়েছে। এবার হাতুড়ি বাটালি কোমরে গুঁজল। বের করল করাতটা। করাতটা ছোটো। মাথাটা সরু। সুবধেই হ’ল। এবার ঐ কাটা জায়গাটায় করাত বসিয়ে ফ্রান্সিস করাত ঘষতে লাগল। প্রথমে করাতটা ভালো চলছিল না। আস্তে আস্তে করাতের চলাটা সহজ হ’ল। কাঠ কেটে যেতে লাগল। জলের মধ্য করাত কাট কাটাছে। বেশি শব্দ বাইরে এলো না। ফ্রান্সিসের হাত ধরে আসছে। ও জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে। শরীরে যেন কোনো সাড় নেই।
হঠাৎ পাথুরে ভাঙার দিকে একটা পাখি ডেকে উঠল। ফ্রান্সিস চমকে উঠল। করাত চালানো থামিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। চাঁদের আলো অনেক ম্লান হ’য়ে গেছে। পূর্বদিকে তাকাল। ধোঁয়াটে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে একটুলাল আভামতো।
ফ্রান্সিস শরীরের সমস্ত শক্তি নিয়ে জোরে করাত চালাতে লাগল। হঠাৎ সমস্ত করাতের মাথাটাই ঢুকে গেল। আনন্দে ফ্রান্সিস জলের মধ্যেই একটা ডিগবাজি খেল। কাটা জায়গাটায় হাত দিয়ে দেখল। জোরে জল ঢুকছে।
ফ্রান্সিস হাতুড়ি বাটালি বের করল। করাতটাও খুলে নিল। সব ফেলে দিল। তারপর পা দিয়ে জল টেনে টেনে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলল ওদের জাহাজের দিকে। এখন রেলিঙে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। ওকে দেখতে পাবে না।
ওদের জাহাজের কাছে পৌঁছল ওহালের খাঁজে পা রেখে রেখে একটু উঠল। তারপর হালটায় হেলান দিয়ে হাঁপাতে লাগল।
একটু বিশ্রাম নিয়ে ফ্রান্সিস হালের মাথার কাছে উঠে এলো। উঁকি দিয়ে দেখল মারিয়া ঘুমিয়ে আছে। ফ্রান্সিস ফিসফিস করে ডাকল—মারিয়া। মারিয়া সারারাতই জেগে ছিল। এখন একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। ফ্রান্সিসের ডাক কানে যেতেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। হামাগুড়ি দিয়ে ফ্রান্সিসের কাছে এলো। ফ্রান্সিস ফিসফিস করে বলল—এনরিকোর জাহাজ ফুটো—ডুববে শাঙ্কো—ছোরা-দড়ি কাটা ভোরের আগে মুক্তি। খুব দ্রুত কথাগুলি বলে ফ্রান্সিস নেমে এলো।
