ওদিকে মারিয়া বন্ধ কেবিনঘরে কাঠের মেঝেয় পাইচারি করছে। দ্রুত ভাবছে কী করে ফ্রান্সিসের খোঁজ পাওয়া যায়। কী করে ওর সঙ্গে কথা বলা যায়। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে কেবিনঘরের দরজা খুলে বাইরে এলো। পাহারাদার সৈন্যটা দেবগোড়ায় মেঝেয় বসে ঝিমোচ্ছিল। দরজা খোলার শব্দ শুনে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল। হাতে তলোয়ার তুলে নিল। মারিয়া সোজা ডেকে-এ ওঠার সিঁড়ির দিকে চলল। এবার আর পাহারাদার বাধা দিল না। মারিয়ার পেছনে পেছনে চলল।
ডেক-এ উঠে মারিয়া চলল বন্দি ভাইকিংদের কাছে। পেছনে পাহারাদার সৈন্যটিও চলল। হ্যারি বাঁধা হাত দুটো মাথায় দিয়ে শুয়ে ছিল। ঘুম আসছে না। কীভাবে মুক্তি পাবে। ফ্রান্সিস কীভাবে ওদের বন্দিদশা ঘোচাবে। এসব সাত-পাঁচ ভাবছিল। মারিয়া কাছে এসে দাঁড়াতে হ্যারি উঠে বসল। ঠিক বুঝল না রাজকুমারী কেন ওর কাছে এসেছে। মারিয়া বলল—হ্যারি—এই গর্দভ পাহারাদারটাকে বলো তো আমি কেবিনঘরে ঘুমুতে পারছি না। ভীষণ গরম লাগছে। আমি হালের ওখানে ডেকে এ শোবো। ঘুমুবো। হ্যারি পাহারাদারের দিকে তাকাল। মারিয়ার কথাগুলো বুঝিয়ে ভাঙা ভাঙা গ্রীক ভাষায় বলল। পাহারাদার মাথা নেড়ে বলল—যদি জলে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যায়।
—রাজকুমারী ঠিকই বলেছেন—তুমি একটা নিরেট গর্দভ। হ্যারি বলল। পাহারাদার কথাটা শুনে লাফিয়ে উঠল। তলোয়ার তুলল। হ্যারি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল
—মাথা ঠাণ্ডা করে শোনা। রাজকুমারী যদি জলে ঝাঁপ দিয়ে পালানও-কোথায় পালাবেন? গ্রামভাউসা এখন তোমাদের দখলে। ওখানে লুকোতে পারবেন না। আর রইলো সামনের ঐ সমুদ্র। একজন স্ত্রীলোক সাঁতরে ঐ সমুদ্র পার হতে পারবে? বলো—। হ্যারি আস্তে আস্তে বলল। পাহারাদার এবার একটু ভাবল। অন্য পাহারাদারদের কাছে গেল। বোধহয় পরামর্শ চাইতে। ওদের সঙ্গে কথা বলে পাহারাদার ফিরে এলো। বলল উনি ওখানে ঘুমুতে পারেন কিন্তু আমি পাহারায় থাকবো। হ্যারি মারিয়াকে সেকথা বললো। মারিয়া বলল—ঐ গর্দভকে বলো ঘুমোবার সময় ও আমার নাকের ডগায় ঘুরে বেড়াতে পারবেনা। তাহলে আমি ঘুমুতেই পারবো না। ওকে মাস্তুলের আড়ালে থাকতে হবে। হ্যারি পাহারাদারকে বলল সেকথা। পাহারাদরটা একটু ভাবল। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল—ঠিক আছে। হ্যারি বলল—রাজকুমারীও রাজি হয়েছে। যান শুয়ে পড়ুন তো।
মারিয়া চলল জাহাজের হালের দিকে। পেছনে সেই পাহারাদারটি। মাস্তুলের কাছে এসে মারিয়া পাহারাদারটিকে ইঙ্গিতে ওখানে দাঁড়াতে বলল। পাহারাদারটি কোনো আপত্তি করল না। মাস্তুলের আড়ালেই দাঁড়াল।
মারিয়া হালের কাছে এসে দেখল এঁটো থালা মগ পড়ে আছে। ও বুঝল ফ্রান্সিস কাছেই কোথাও আছে। মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলতে লাগল—আমাদের দেবতা—আপনি খুশি মনে আমাদের দেওয়া খাদ্য জল গ্রহণ করেছেন। আমরা আনন্দিত। এবার বলুন আর কীভাবে আমরা আপনাকে খুশি করতে পারি? ফ্রান্সিস জলে ডুবে মারিয়ার কথাগুলো শুনল। খুশিতে ওর মন নেচে উঠল। এই সুযোগ। ও ভাবল—কিন্তু মারিয়ার কাছেই যদি কোনো পাহারাদার সৈন্য থাকে তাহলে তো ডেক-এ ওর সঙ্গে কথা বলা যাবে না। উল্টে ধরা পড়তে হবে। ফ্রান্সিস অপেক্ষা করতে লাগল মারিয়া আর কী বলে শোনার জন্যে।
তখনই মারিয়ার ফিসফিস করে বলা কথাটা ওর কানে গেল—এসো—কেউ নেই। ফ্রান্সিস আর দেরি করল না। দড়ি বেয়ে উঠে এলো। ততক্ষণে মারিয়াও ডেক-এর ধারে ঝুঁকে ফ্রান্সিসকে দেখতে পেয়েছে।
ফ্রান্সিস সবটা দড়ি বেয়ে উঠল না। ওপরে তাকিয়ে মারিয়ার ঝুঁকে-পড়া মুখ দেখল। খুব গলা চেপে ফ্রান্সিস বলল—হাতুড়ি বাটালি ছোটো করাত। কথা কটা বলেই ফ্রান্সিস দ্রুত দড়ি বেয়ে জলে নেমে গেল। তারপরই ডুব দিয়ে রইল। যতটা সম্ভব দম চেপে ডুব দিয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে মাথা তুলল দেখল মারিয়া চলে গেছে। যাক—ওর কথা পাহারাদার সৈন্যরা শুনতে পায়নি।
ওদিকে মারিয়া দ্রুত হাতে এঁটো থালা জলের মগ হাতে তুলে নিল। সেসব নিয়ে বেশ দ্রুত চলল ডেক দিয়ে। দেখল পাহারাদারটি মাস্তুলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। মারিয়া ওকে এঁটো থালা মগ ইঙ্গিতে দেখাল। ওকে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে ইঙ্গিত করল। পাহারাদার আর ওর পেছনে পেছনে এলো না।
মারিয়া সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমেই এটো থালা গ্লাস দ্রুত নামিয়ে রাখল। নিজের কেবিনঘরে ঢুকল। একটা মোটা কম্বল মতো কাপড় গায়ে জড়াল। মোমবাতি জ্বালল। মোমবাতি নিয়ে চলল কেবিন ঘরগুলির পরে যেখানে একটা লম্বাটে কাঠের বাক্স জাহাজ মোরামতির যন্ত্রপাতি থাকে সেদিকে। ছুটতে পারছেনা যদি মোমবাতি নিভে যায়। তখনই একটা দকা হাওয়া বইল। মোমবাতির শিখা নিভু নিভু হ’ল। মারিয়া হাতের চেটোয় সঙ্গে সঙ্গে শিখা আড়াল করল। মোমবাতি নিভল না।
কোনোরকম শব্দ না করে মারিয়া বাক্সের ডালাটা আস্তে আস্তে খুলল। মোমবাতির আলোয় খুঁজতে লাগল হাতুড়ি বাটালি আর করাত। একটু খোঁজাখুঁজি করেই পেয়ে গেল সেসব। তিনটে জিনিসই গায়ের মোটা চাদরের আড়ালে লুকিয়ে নিয়ে চলল সিঁড়ির দিকে। জোরে ছুটল এবার। বেশি দেরি হ’লে পাহারাদারটির সন্দেহ হতে পারে। মোমবাতি নিভে গেল। মারিয়া মোমবাতি ফেলে দিল।
