জলে মাথা ভাসিয়ে থাকা ফ্রান্সিস মনে মনে হ্যারিকে বার বার ধন্যবাদ জানাল। সত্যি ওর তখন ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছিল। মনে মনে হ্যারির বুদ্ধিরও প্রশংসা করল। একটু অপেক্ষা করে ফ্রান্সিস ঝোলানো দড়ি ধরে ধরে কাঠের খাঁজে পা রেখে রেখে জাহাজে উঠে এলো। উবু হয়ে বসে দ্রুত খেতে লাগল। খাওয়া শেষ হলে জল খেয়ে ফ্রান্সিস দ্রুত দড়ি ধরে হালের খাঁজ বেয়ে বেয়ে জলে নেমে এলো। এখন রাতের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
ওদিকে এনরিকোর সৈন্যদের সঙ্গে ছাউনির বোনিফেসের সৈন্যদের সঙ্গে তুমুল লড়াই শেষ হবার মুখে। বোনিফেসের সৈন্যরা বীরের মতো লড়াই করল। কিন্তু এনরিকোর সৈন্যদের কাছে ওরা শেষ পর্যন্ত হার স্বীকার করতে বাধ্য হ’ল। যুদ্ধক্ষেত্রে অবশেষে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। তখন সূর্য অস্ত যেতে বেশি দেরি নেই।
রণক্লান্ত এনরিকোর সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রের এখানে-ওখানে শুয়ে পড়ল। বিশ্রাম করতে লাগল। কিন্তু ক্লান্তি নেই দলপতির। সে যুদ্ধক্ষেত্রে ঘুরে ঘুরে সব সৈন্যদের অভিনন্দন জানাতে লাগল। সে স্থানীয় কিছু লোকজন ধরে নিয়ে এলো। ঐ যুদ্ধক্ষেত্রেই পাথর পেতে উনুন বসানো হ’ল। বস্তায় করে ময়দা আনাহ’ল আর ভেড়ার মাংস রান্না চলল।
সন্ধের পরেই রান্না শেষ হ’ল। সব সৈন্যরা খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বেনিফেসের সৈন্যদের ছাউনিতেই শুয়ে পড়ল। সৈন্যদের দলপতি শুধু সমুদ্রতীরে এলো। নিজেদের জাহাজে রইল। আরো তিন চারজন সৈন্য জাহাজের পাহারায় আগেই ছিল।
রাত বাড়ছে। জলের মধ্যে শুধু মাথাটা তুলে ফ্রান্সিস অপেক্ষা করছে। কিন্তু তখনও ভেবে পাচ্ছে না কী করে বন্ধুদের মুক্ত করবে। কী করে সবাইকে নিয়ে জাহাজে চড়ে পালাবে।
রাজকুমারী মারিয়া রাতের রান্নাও রাঁধল। খুবই কষ্ট হ’ল মারিয়ার। এত লোকের রান্না সহজ কথা না। কিন্তু মারিয়া মুখ বুজে এই কষ্ট মেনে নিল। ওর মনে শুধু এক চিন্তা ফ্রান্সিস মুক্ত আছে। ও নিশ্চয়ই ওদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারবে কি? যদি ওদের মুক্তি করতে গিয়ে ফ্রান্সিস নিজে ধরা পড়ে যায় তাহলে তো সর্বনাশ। মারিয়া এবার ডেক-এ উঠে এলো। গলা চড়িয়ে বলল রান্না হয়ে গেছে। খেতে এসোসবাই।
আবার চারজন চারজন করে ভাইকিং বন্ধুরা খাবার ঘরে গিয়ে খেয়ে আসতে লাগল। শেষ চারজনের মধ্যে হ্যারি গেল দুপুরের মতোই দেবতাকে উৎসর্গ করবে বলে খাদ্য জল নিয়ে জাহাজের পেছনে হালের কাছে। দেখল এঁটো থালা গ্লাস রয়েছে। হ্যারি ভীষণ খুশি হ’ল। ফ্রান্সিস তাহলে কাছাকাছি আছে। সঙ্গের পাহারাদার সৈন্যটি এসবের কিছুই বুঝল না। ডেক-এর কাঠের মেঝেয় খাবার জল রেখে দু’হাত ওপরে তুলে বলল—হে দেবতা—আপনি খাদ্য জল গ্রহণ করেছেন এই জন্যে আমরা কৃতার্থ হয়েছি। আবার রাত্রির আহার রেখে গেলাম, গ্রহণ করে আমাদের কৃতার্থ বরুন। হাত নামিয়ে হ্যারি ফিরে চলল। সৈন্যটিও ওর পেছনে পেছনে চলল।
খেতে বসে হ্যারি দেখল মারিয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মারিয়াই পরিবেশন করছে। অপেক্ষা করছে কে কী খেতে চায় তার জন্যে। হ্যারি মারিয়াকে বলল-রাজকুমারী একটু জল দিন। মারিয়া তাড়াতাড়ি এনামেলের জগটা নিয়ে এগিয়ে এলো। মারিয়া গ্লাসে জল ঢালছে তখনই হ্যারি মৃদুস্বরে বলল-দেবতা খাবার খেয়েছে। জাহাজের হালের কাছেই কোথাও আছে। আনন্দে মারিয়ার মন নেচে উঠল। কিন্তু এই আনন্দ সে বাইরে প্রকাশ পেতে দিল না।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হ’ল। আবার ভাইকিংদের হাত বেঁধে ফেলা হ’ল। সবাইকে আগের জায়াগায় বসিয়ে রাখা হ’ল।
রাত বাড়ল। অনেকেই হাত বাঁধা অবস্থাতেই শুয়ে পড়ল। কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়ল।
ওদিকে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে জল থেকে উঠে এলো। হালের গায়ে খাঁজে খাঁজে পা রেখে ডেক-এ উঠে এলো। দ্রুত খাবার খেয়ে জল খেয়ে ও আবার হাল বেয়ে সমুদ্রের জলের দিকে নামতে লাগল।
আজ আকাশ অনেক পরিষ্কার। কুয়াশা অনেক পাতলা। চাঁদের আলোও উজ্জ্বল। ফ্রান্সিস হালের খাঁজে দাঁড়িয়ে একবার এনরিকোর সেনাদের যুদ্ধে জাহাজটার দিকে তাকাল। দু’জন সৈন্য জাহাজের ডেক-এ পাহারা দিচ্ছে দেখল। ডেক-এ আর কেউ নেই। হঠাৎ ফ্রান্সিসের নজর পড়ল জাহাজের সামনের দিকে। সেই জাহাজের কালো কাঠের নীচের দিকে। অনেকটা কাঠের চটা উঠে গিয়ে সাদাটে কাঠ দেখা যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে অন্য কোনো জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল। আচ্ছা তখন যদি সবটা খুলে উঠে আসতো তাহলে তো হুড় হুড় করে সমুদ্রের জল ঢুকে জাহাজটা ডুবেই যেত।
এই কথাটা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ফ্রান্সিসের মাথায় একটা কথা এসে ধাক্কা দিল—জাহাজটিকে ঐ জায়াগায় ফুটো করতে পারলে আধ ঘন্টার মধ্যেই ডুবে যাবে। ফ্রান্সিস কথাটা ভাবতে ভাবতে দ্রুত জলে নেমে এলো। সাবধান হতে হবে। কিছুতেই সৈন্যদের নজরে পড়া চলবে না। ফ্রান্সিস গলা জলে ডুবে থেকে ভাবতে লাগল এখন একটা করাত চাই। হাতুড়ি বাটালি হলেও চলবে। কিন্তু সেসব তো ওদের জাহাজের কেবিন ঘরগুলোর শেষে এক কোণায় একটা কাঠের বড় বাক্সে রয়েছে। যে করেই হোক ঐ যন্ত্রগুলো আনতে হবে। ফ্রান্সিস অস্থির হয়ে পড়ল। আনতেই হবে ওগুলো। ভাবতে লাগল কীভাবে আনা যায়।
ফ্রান্সিস আবার জল থেকে উঠে এলো। ডেক-এর ওপর শুয়ে পড়ল। বুক হিঁচড়ে হিঁচড়ে গিয়ে মাস্তুলের পেছনে এলো। দেখল চারজন সৈন্য তলোয়ার হাতে বন্দি বন্ধুদের পাহারা দিচ্ছে। ঐ সৈন্যদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া যাবে না; রাতও অন্ধকার নয়। চাঁদের আলো উজ্জ্বল। ধরা পড়তে হবে। তখন মুক্তির শেষ আশাটাও থাকবে না। ফ্রান্সিস আবার হালের কাঠের খাঁজে পা রেখে রেখে জলে নেমে এলো। অপেক্ষা করতে লাগল যদি হ্যারি আবার আসে।
