এই চিৎকার গণ্ডগোলের শব্দ মারিয়ার কানে গেল। ও দ্রুত পায়ে কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে এলো। একজন সৈন্য কেবিনঘরের দোরগোড়ায় পাহারা দিচ্ছিল। মারিয়া তাকে জিজ্ঞেস করল কী ব্যাপার!এত চেঁচামেচি কীসের? পাহারাদার সৈন্যটি মারিয়ার কথা কিছুই বুঝল না। হাঁ করে তাকিয়ে রইল। মারিয়া রাগত স্বরে বলল—গ্রীকভূত!তারপর ডেক-এ ওঠার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। সৈন্যটি তলোয়ার বাড়িয়ে ধরে মারিয়ার পথ আটকাল। মারিয়া ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সৈন্যটির দিকে তাকাল একবার। তারপর ডান হাতের এক ঝটকায় তলোয়ারের ফলা সরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল। সৈন্যটি কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। পাছে মারিয়া পালিয়ে যায় তাই ও একছুটে এগিয়ে এসে মারিয়ার পেছনে পেছনে আসতে লাগল। মারিয়া ডেক-এ উঠতেই ভাইকিং বন্দিরা আবার চিৎকার করে উঠল—ও—হো—হো—হো। মারিয়া হ্যারির কাছে এলো। বলল—কী ব্যাপার হ্যারি ?
—রাজকুমারী—সকাল থেকে আমরা কিছু খাইনি। ক্ষুধার্ত আমরা। দুপুরে খাওয়া জুটবে কিনা জানি না। হ্যারি বলল। মারিয়া বলল—হ্যারি আমি সব ব্যবস্থা করছি। কিন্তু আমি যে গ্রীক ভাষা জানি না। সৈন্যরা আমার কথা বুঝবে না। তুমি ওদের বুঝিয়ে বললো। হ্যারি সৈন্যদের বলল—শোনো-রাজকুমারী মারিয়া আমাদের খাবার তৈরি করে দেবেন। উনি পালাবেন না। যদি তোমাদের মনে সেই সন্দেহ থাকে তাহলে রসুইঘরের দরজায় দু’জন পাহারাদার রাখতে পারো। এবার সৈন্যরা নিজেদের মধ্যে কথা বলল। ওরা রাজি হ’ল। দু’জন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে মারিয়ার পেছনে এসে দাঁড়াল।
—কিন্তু রাজকুমারী হ্যারি বলল—আপনি একা কি পারবেন এতজন লোকের রান্না করতে? আপনার খুব কষ্ট হবে।
—কিছুই না—মারিয়া একটু হেসে বলল। তারপর নীচে নামার সিঁড়ির দিকে চলল। পেছনে তলোয়ার উঁচিয়ে দু’জন পাহারাদার সৈন্যও চলল।
মারিয়া দ্রুতপায়ে রসুইঘরে এলো। সৈন্য দু’জন দরাজায় দাঁড়াল। মারিয়া রাজকুমারী হলেও আলস্যে দিন কাটাতো না। নিজের কাপড় জামা কাঁচতো, কাপড় রুমাল সেলাই করতো। রাজবাড়ির ফরাসী রাঁধুনির কাছে নানারকম খাবারের পদ রান্না করাও শিখেছিল। কিন্তু এত লোকের রান্না তো মারিয়া কোনোদিন রাঁধেনি। তবুও নিজে থেকে এগিয়ে এসে এই দায়িত্ব নিল। এই বন্দি ভাইকিংদের একটাই পরিচয় ওরা ফ্রান্সিসের অন্তরঙ্গ বন্ধু।
প্রথম মারিয়া আটা, ময়দা, চিনি, আনাজপাতি, মশলা এসব কোথায় কোথায় রাখা আছে দেখে নিল। একটা বড়ো গামলায় ভেড়ার মাংস কেটে রাখা আছে দেখল। এবার উনুন জ্বালা। তারপর রান্না।
প্রায় ঘণ্টা তিনেক পরে রান্না শেষ হ’ল। মারিয়া ডেক-এ উঠে এলো। বেশ গলা চড়িয়ে বলল—রান্না হয়ে গেছে। ভাইকিং বন্দিরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল—ও—হো—হো। অত লোকের জন্যে রান্না করার ধকলে মারিয়ার মুখ শুকিয়ে গেছে। ও তবু হাসল।
সৈন্যরা চারজন করে ভাইকিংদের পাহারা দিয়ে খাবার ঘরে নিয়ে যেতে লাগল। এই ভাবে ভাইকিং বন্দিরা খেয়ে আসতে লাগল। হ্যারি সবাইকে খেতে পাঠাতে লাগল। ও খাবে সবশেষের দলে, হ্যারি এসময় উঠে দাঁড়াল। একজন সৈন্য তলোয়ার উঁচিয়ে ছুটে এলো। হ্যারি বলল—খাবার আগে আমরা আমাদের দেবতাকে খাদ্য জল উৎসর্গ করে খাই। আমি দেবতাকে ডাকবো। আমাকে জাহাজের পেছন দিকে গিয়ে দেবতাকে ডাকতে হবে। সৈন্যটি কী ভাবল। তারপর তলোয়ারটা বাড়িয়ে ধরে যেতে বলল। হ্যারি জাহাজের পেছন দিকে হালের কাছে এলো। আকাশের দিকে বাঁধা হাতদুটো বাড়িয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল—হে দেবতা—তুমি অনেকক্ষণ খাওনি। আমাদের রান্না হয়ে গেছে। এবার তুমি খাও ফ্রান্সিস জলের একটু ওপরে মাথা ভাসিয়ে হ্যারির সব কথা শুনল। এত বিপদ এত চিন্তার মধ্যেও হ্যারির কথা শুনে ফ্রান্সিসের হাসি পেল।
হ্যারি ফিরে এলো। পেছনে পেছনে সৈন্যটাও এলো। ও এসবের কিছুই বুঝল না।
সবশেষের দলের সঙ্গে হ্যারি খেতে গেল। হ্যারি খাবার ঘরে ঢুকে মারিয়াকে গ্রীকভাষায় বলল—আপনি তো জানেন—আমাদের দেবতাকে উৎসর্গ না করে আমি কিছু খাইনা। মারিয়া তো অবাক গ্রীক ভাষা তো বোঝেনা। সৈন্যরা এবার বুঝল সে সত্যিই হ্যারি খাবার আগে ওদের দেবতাকে খাবার উৎসর্গ করে। কিন্তু মারিয়া ফ্যাল ফ্যাল করে হ্যারির দিকে তাকিয়ে রইল। এবার হ্যারি ওদের মাতৃভাষায় বলল—একটা পাত্রে খাবার দিন। আর এক মগ জল। আমি দেবতাকে খাবার উৎসর্গ করে খেতে আসছি। মারিয়া ঠিক বুঝল না হ্যারি কী বলতে চাইছে! হ্যারি তাড়া দিল—একটু তাড়াতাড়ি করুন। মারিয়া আর কিছু না বলে একটা এনামেলের থালায় মাংসরুটি সবজি রাখল। একটা মগজল দিল। সেসব নিয়ে হ্যারি, ডেক-এ উঠে এলো। একজন সৈন্যও ওর পেছনে পেছনে চলল। হ্যারি খাবার জলের মগ হাতের কাছে একটা পরিষ্কার জায়গায় রাখল। খাবেব’লে হ্যারির হাতের বাঁধন সৈন্যটি খুলে দিয়েছিল। খাবার জল রেখে হ্যারি সৈন্যটিকে বলল—ভাই—এসময় এখানে কেউ থাকবে না। আমাদের দেবতা যখন খান তখন কারো তা দেখার নিয়ম নেই। তুমি আমার সঙ্গে খাবার ঘরে চলো। সৈন্যটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। এবার হ্যারি দুহাত তুলে গলা। চড়িয়ে বলল—হে দেবতা! আপনার জন্যে এখানে খাদ্য রেখে গেলাম। আপনি এই খাদ্য পানীয় গ্রহণ করে আমাদের কৃতাৰ্থ করুন। হাত নামিয়ে হ্যারি সৈন্যটিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে চলল। ডেক-এর সামনের দিকে পাহারারত সৈন্যদের বলল…ভাই তোমরা দয়া ক’রে হালের দিকে এখন যেও না। আমাদের দেবতা খাবেন এখন?
