তখন সবে সূর্য উঠছে। পুবের আকাশ লাল হয়ে গেছে। একটু পরে সূর্য উঠল। তবে চারদিকে কেমন সাদাটে কুয়াশার আস্তরণ থাকায় রোদ খুব উজ্জ্বল হ’ল না।
সৈন্যদের দলপতি এবার হাতের তলোয়ার উঁচিয়ে গ্রামভাউসা বন্দরের দিকে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করে চিৎকার করে কী বলল। সৈন্যরা পর পর সারি বেঁধে জাহাজ থেকে নামতে লাগল। পাথুরে রাস্তা ধরে সৈন্যদল চলল বসতির দিকে। জাহাজে চারজন সৈন্য ভাইকিং বন্দিদের পাহারায় রইল। একজন সৈন্য রইল মারিয়ার পাহারায়।
একটু পরেই সমস্ত এলাকা থেকে লোকজনের আর্ত চিৎকার কান্নাকটির ধ্বনি ভেসে এলো। বোনিফেসের যে ক’জন সৈন্য ছিল তারা তোহার স্বীকার করতে বাধ্য হ’ল। বন্দি এ কাভাল্লি চিৎকার করে বলল—এনরিকোর সৈন্যরা জিতলে আমাদের মুক্তির কোনো আশা নেই। ভাইকিং বন্দিরা শুনল। কিছু বলল না কেউ। কিন্তু কাভাল্লি ওরা যখন খাদ্য জল আনতে গিয়েছিল তখন ওখানকার বসতি ছাড়িয়ে বেশিদূর যায়নি। কিছুদুরে কিন্তু রাজা বোনিফেসের প্রায় শ’খানেক সৈন্যের ছাউনি ছিল। এটা কাভাল্লিরা জানতো না। সেই ছাউনিটা ছিল একটু দূরে একটা ঘাসে ঢাকা উপত্যকার মধ্যে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই এনরিকোর সৈন্যরা সেই উপত্যকায় এলো। এর মধ্যে বোনিফেসের সৈন্যরাও তৈরি হয়ে গেছে। কারণ দূর থেকে ওর গ্রামভাউসার অধিবাসীদের আর্ত চিৎকার শুনতে পেয়েছিল।
এনরিকোর সৈন্যরা চিৎকার করতে করতে ছুটে এলো উপত্যকা দিয়ে। বোনিফেসের সৈন্যরাও সশস্ত্র হয়ে ছাউনি থেকে বেরিয়ে এলো। দুই সৈন্যদলে তুমুল লড়াই শুরুহ’ল সেই উপত্যকায়।
ওদিকে ফ্রান্সিস ওদের জাহাজের হাল ধরে শুধু মাথাটা জলের ওপর ঠেকিয়ে চুপ করে জলের মধ্যে ডুবে রয়েছে। ওপরে জাহাজের পাটাতনে শব্দ শুনেই ও বুঝল যে এনরিকোর সৈন্যরা ওদের জাহাজে নামল। সৈন্যদের চিৎকার চ্যাঁচামেচি দলপতির গলা চড়িয়ে সৈন্যদলের আদেশ দেওয়া এসব শুনে ফ্রান্সিস বুঝল—এনরিকোর সৈন্যরা ওদের জাহাজ দখল করেছে। ও আশঙ্কা করেছিল হয়তো ভাইকিং বন্ধুরা অস্ত্রঘর থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে বাধা দেবে লড়াই করবে। কিন্তু ও তলোয়ারের লড়াইয়ের কোনো শব্দ শুনল না। বোঝা গেল—ভাইকিং বন্ধুরা লড়াইয়ের সুযোগই পায় নি। এতে ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হ’ল। রক্তপাত ও মৃত্যু এসব ঘটল না। তখনই ও শুনল হ্যারি চিৎকার করে ওর বন্ধুদের ফ্রান্সিসের নির্দেশ জানাচ্ছে। ফ্রান্সিস আরো নিশ্চিন্ত হ’ল। ওর নির্দেশ শোনার পর আর বন্ধুরা লড়াইয়ের চেষ্টা করবে না। কিন্তু ফ্রান্সিসের মাথায় তখন চিন্তা। কী করে সবাইকে মুক্ত করা যায়। মারিয়া আর সব বন্ধুরা তো নিশ্চিন্ত ফ্রান্সিস বন্দি হয়নি। মুক্ত আছে। মুক্তির একটা ব্যবস্থা ফ্রান্সিস করবেই। সবাই মুক্তির জন্যে ওর ওপর নির্ভর করে আছে। একথা ভেবে ফ্রান্সিসের দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে গেল। অথচ ভেবে পাচ্ছি না কী করে ওদের মুক্ত করবে।
ফ্রান্সিস এবার শব্দ থেকে বুঝল এনরিকোর সৈন্যরা জাহাজ থেকে নেমে যাচ্ছে। হালের আড়াল থেকে দেখল সৈন্যরা সারি বেঁধে গ্রামভাউসার বসতি এলাকার দিকে যাচ্ছে। তার মানে জাহাজে পাহারাদার সৈন্য মাত্র কয়েকজনই আছে। এদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে জাহাজ নিয়ে বন্ধুদের আর মারিয়াকে নিয়ে পালাতে হবে। কিন্তু কী করে? ফ্রান্সিস কাভাল্লিদের কাছে শুনেছিল এ গ্রামভাউসারে বোনিফেসের খুবই অল্প সৈন্য আছে। এনরিকোর সৈন্যদের কাছে ওরা সহজেই হার মানবে। কাজেই সৈন্যরা সকলে কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজে ফিরে আসবে। তখন কি অত সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে পালানো যাবে? তাও জাহাজে চড়ে?
ফ্রান্সিস এসব সাত-পাঁচ ভাবছে তখন ইঁদুর থেকে চিৎকার হৈ হৈ শব্দ ভেসে এলো। ফ্রান্সিস চমকে উঠল। তাহলে রাজা বোনিফেসের আরো সৈন্য গ্রামভাউসায় ছিল। যুদ্ধের নানা শব্দ আর্ত চিৎকার এসব শব্দ শুনে ফ্রান্সিস বুঝল জোর লড়াই বেঁধেছে। ওর মন, আনন্দে নেচে উঠল।
যুদ্ধে যদি রাজা বোনিফেসের সৈন্যরা জেতে তাহলে তো বন্ধুদের মুক্ত করতে কোনো অসুবিধেই হবে না। কিন্তু যদি এনরিকোর সৈন্যরা জেতে তাহলে তো মুক্তির কোনো আশাই নেই। তবে একটা ক্ষীণ আশা ফ্রান্সিসের মনে জাগল হয়তো যুদ্ধে জিতলে এনরিকোর সৈন্যরা আর ওদের জাহাজে আজকে নাও ফিরতে পারে। কারণ যুদ্ধে জিতলে জাহাজ পাহারা দেবার জন্যে কয়েকজন পাহারাদারই যথেষ্ট। যদি ঐ সৈন্যরা বেশি সংখ্যায় গ্রামভাউসাতেই থেকে যায় আজ রাতে আর ওদের জাহাজে ফিরে না আসে তাহলে সুবর্ণ সুযোগ। এই সুযোগ আজ রাতের মধ্যে কাজে লাগাতে হবে। যে করে তোক বন্ধুদের মুক্ত করতে হবে। জাহাজ নিয়ে পালাতে হবে এখান থেকে। এখন রাত্রির অন্ধকারের জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। কাজেই ফ্রান্সিস সমুদ্রের জলে মুখ ভাসিয়ে জাহাজের হাল ধরে অপেক্ষা করতে লাগল।
এদিকে বেলা বাড়ছে। ভাইকিং বন্দিরা সকাল থেকে কিছু খায় নি। যে চারজন সৈন্য ওদের পাহারা দিচ্ছিল্ল তারা জাহাজের রসুইঘরে পালা করে গিয়ে খেয়ে এসেছে। ভাইকিং বন্দিদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হ’ল। তারপরই ওরা একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল—ও—হো—হো। পাহারাদার সৈন্যরা তলোয়ার উঁচিয়ে এগিয়ে এলো। হ্যারি দেখল বন্ধুরা উত্তেজিত। ওরা হাত বাঁধা অবস্থায় সশস্ত্র সৈন্যদের সঙ্গে লড়তে পারবে না। যদি উত্তেজিত হয়ে সৈন্যদের আক্রমণ করে বসে তাহলে কয়েকজন ভাইকিং বন্ধুর মৃত্যু হবেই। হ্যারি বাঁধা দু’হাত ওপরে তুলে ভাঙা ভাঙা গ্রীক ভাষায় চেঁচিয়ে বলল—আমরা বন্দি কিন্তু আমরা তো মানুষ। এত বেলা হয়েছে। আমরা কিছু খাইনি, আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করো। সৈন্যরা কী করবে বুঝে উঠতে পারলো না। ভাইকিং বন্দিরা আবার চিৎকার করে উঠলো—ও—হো—হো।
