ফ্রান্সিস দ্রুত মাথা নিচু করল। তারপর জাহাজের ডেক-এর কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে শুয়ে পড়ল। শরীরটা হিঁচড়ে হিঁচড়ে চলল। একটু আসতেই মাস্তুলের আড়াল পেল। আস্তে আস্তে মাস্তুলের আড়ালে হাঁটু গেড়ে বসল। দেখল কয়েক হাত দূরেই দু’জন ভাইকিং কম্বল মতো মোটা কাপড় পেতে ঘুমিয়ে আছে। তখনই দু’জনের মধ্যে একজন পাশ ফিরল। ফ্রান্সিস দেখল—বিস্কো। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ডাকল—বিস্কো-বিস্কো। ঘুমন্ত বিস্কোর কানে গেল না সে ডাক। ওদিকে জাহাজটা আরও অনেক কাছে চলে এসেছে। ফ্রান্সিস দ্রুত ডেক-এ আবার শুয়ে পড়ল। মাস্তুলের আড়াল থেকে বুক হিঁচড়ে বিস্কোর কাছে গেল। আস্তে আস্তে বিস্কোর কাঁধে ধাক্কা দিল। বিস্কোর ঘুম ভেঙে গেল। একবারে মুখের কাছে। ফ্রান্সিসকে দেখেও সঠিক চিনল না। দ্রুত উঠে গেল। ফ্রান্সিস ওর মাথা চেপে ধরে বলল—আমি ফ্রান্সিস চুপ করে শুয়ে থাকো। বিস্কো মাথামিয়ে শুয়ে পড়ল। বেশ বুঝল নিশ্চয়ই কিছু হ’য়েছে। ফ্রান্সিস ওর কানের কাছে মুখ এনে বলল—এনরিকোর সৈন্যরা গ্রামভাউসা বন্দর দখল করতে জাহাজে চড়ে আসছে। আর অল্পক্ষণ পরেই ওদের জাহাজ আমাদের জাহাজের গায়ে এসে লাগবে। ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে সবাই ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়েছে। কাউকে ডাকবো না। আমাদের বন্ধুরা লড়াই যেন না করে। এনরিকোর সৈন্যরা বন্দি করতে এলে যেন বাধা না দেয়। রক্তপাত আমি চাই না। সবাই বন্দিত্ব স্বীকার করে নিও ফ্রান্সিস থামল। একটু দম নিয়ে বলল—তুমি সবাইকে এই কথা বলো। আমি জলে নেমে যাবো। সময় ও সুযোগের জন্যে অপেক্ষা করবো। তোমরা লড়াই করতে যেও না। অবস্থা বুঝে আমি যা করার করবো। আমি যাচ্ছি।
ফ্রান্সিস আবার ডেক-এর পাটাতনে বুক হিঁচড়ে হিঁচড়ে জাহাজের পেছনের দিকে এলো। ও যখন জাহাজের হালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে নামতে শুরু করেছে তখনই এনরিকোর সৈন্য ভর্তি জাহাজটা ওদের জাহাজের গায়ে এসে লাগল। এনরিকোর সৈন্যরা ধুপধাপ শব্দ তুলে ফ্রান্সিসদের জাহাজে নামতে লাগল।
বিস্কো দু’হাত তুলে উঠে দাঁড়াল। খোলা তলোয়ার হাতে দু’তিনজন সৈন্য এসে বিস্কোকে ঘিরে দাঁড়াল। সেই অল্প দড়িওলা লম্বাটে চেহারার দলপতি বিস্কোর সামনে এসে দাঁড়াল। বিস্কো বলল—আমাদের কাউকে হত্যা করবেন না। কিন্তু দলপতি বিস্কোর কথা কিছুই বুঝল না। ওদিকে সৈন্যরা খোলা তলোয়ার উঁচিয়ে সিঁড়ি বেয়ে কেবিন ঘরগুলোর দিকে ছুটল। শুয়ে থাকা বসে থাকা ঘুমন্ত ভাইকিংরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বন্দি হতে লাগল, এনরিকোর সৈন্যদের হাতে হাত বেঁধে সব ভাইকিং বন্দিদের ডেক-এ আনা হল। মারিয়াকেও হাত বেঁধে আনা হ’ল। হ্যারি ও এলো। বিস্কো ছুটে হ্যারির কাছে গেল। দ্রুত বলল হ্যারি ফ্রান্সিস আত্মগোপন করেছে। ও বলেছে আমরা যেন যুদ্ধনাকরি। শান্ত হয়ে থাকি। ফ্রান্সিস নিজেই যা করবার করবে। বিস্কো হ্যারির সঙ্গে কথা বলছে তখনই সৈন্যদের দলপতি দু’জনের দিকে এগিয়ে এলো। হ্যারিকে গ্রীকভাষায় জিজ্ঞেস করল—আমাদের নেতা এনরিকো তোমাদের আমাদের হয়ে যুদ্ধ করতে বলেছিল। তোমরা পালালে কেন?
দেখুন—আমরা গ্রীক—নই—এদেশের রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কেনো সম্পর্ক নেই। রাজা বোনিফেস আমাদের কোনো ক্ষতি করেননি। তবে কেন আমরা আপনাদের যুদ্ধের সঙ্গে জড়াব? হ্যারি বেশ দৃঢ়স্বরে বলল। দলপতি কিছুক্ষণ হ্যারির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বন্দি হ্যারির মুখে এরকম তেজো দৃপ্তকথা শুনে দলপতি বেশ অবাকই হল। দলপতি যখন চলে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তখন হ্যারি বলল—আমাদের রাজকুমারী মারিয়াকে এভাবে বন্দি করে রাখবেন না। তাকে তাদের কেবিনঘরে থাকতে দিন। আমরা কথা দিচ্ছি আমরা পালাবার চেষ্টা করবো না। দলপতি একজন সৈন্যকে ডেকে কী বলল। সৈন্যটা গিয়ে মারিয়ার হাতের বাঁধন খুলে দিল। হ্যারি একটু গলা চড়িয়ে বলল—রাজকুমারী—আপনি আপনার কেবিনঘরে চলে যান।
—কিন্তু তোমরা?মারিয়া বলল।
—আমরা বন্দিত্ব মেনে নিয়েছি। এই ডেকেই থাকবো আমরা। মারিয়া একটু ইতস্তত করে বলল—ফ্রান্সিস কোথায়?
হ্যারি এবার এগিয়ে মারিয়ার কাছে গেল। নিম্নস্বরে বলল।
—ফ্রান্সিস ভালো আছে। ও আত্মগোপন করেছে। কাছাকাছিই আছে। ও বলেছে আমাদের মুক্তির উপায় করবে। এখন এই সেনাপতি ও সৈন্যরা যা বলে তাই করবেন। বিরোধিতা করবেন না।
মারিয়া আর কোনো কথা না বলে নিজের কেবিনে চলে গেল।
এসময় দলপতি উচ্চকণ্ঠে কী আদেশ দিল সৈন্যদের। সৈন্যরা এগিয়ে এসে ভাইকিংদের ডেক-এর কাঠের পাটাতনে বসে পড়তে ইঙ্গিত করল। হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল ভাইসব—সবাই ডেক-এ বসে পড়ো। সবাই আস্তে আস্তে বসে পড়ল। দু’একজন ভাইকিং একটু জোর গলায় বলল—ফ্রান্সিসকে দেখছিনা—সে কোথায়?হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস সুস্থ আছে। নিরাপদে আছে! শুধু এইটুকুই জেনে রাখো তোমরা। ফ্রান্সিস বলেছে—তোমরা এই সৈন্যদের সঙ্গে কোনোভাবে লড়াইতে নামবে না। ওরা যেমন বলে তেমন চলবে। তোমরা বিরোধিতা করবে না। সবাই চুপ করে হ্যারির কথা শুনল। ওরা বীরের জাত। এইভাবে বিনা যুদ্ধে বন্দিদশা মানতে ওদের মন চাইছিল না। কিন্তু ফ্রান্সিস বলেছে। কাজেই ফ্রান্সিসের নির্দেশমতো চলতে হবে। ফ্রান্সিস আত্মগোপন করেছে। মুক্ত আছে। ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই মুক্তির ব্যবস্থা করবে। ফ্রান্সিসের ওপর সে বিশ্বাস আছে।
