বেশ সামনেই গ্রামভাউসা বন্দর। হয়তো এখনও এনরিকোর সৈন্যরা দখল করেনি। আমি, হ্যারি আর মারিয়া বন্দরে নেমে যাবো। তোমরা জাহাজে ফিরে দেশে চলে যাও। আমরা খানিয়া যাবোই। ফ্রান্সিস বলল।
.
ভাইকিংদের মধ্যে অনেকেই বলে উঠল—না, তোমাদের রেখে আমরা দেশে ফিরে যাবো না। তোমরা যেখানে যাবে সেখানে আমরাও যাবো!
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলে উঠল—এই তো খাঁটি ভাইকিং-এর কথা। সভা ভেঙে গেল। সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। ডেকে বসল কেউ কেউ। কেউ কেউ কেবিনঘরে চলে গেল।
মারিয়া বলল—আচ্ছা ফ্রান্সিস, তুমি কি উদ্ধার করতে পারবে সেই নিখোঁজ রাজমুকুট?
আগে দোনিয়া দুর্গে যাই, সব দেখি,বুঝি। তারপর বলতে পারবো, মুকুট উদ্ধর সম্ভব কি অসম্ভব ফ্রান্সিস বলল।
পরদিন বিকেলের দিকে ফ্রান্সিসদের জাহাজ গ্রামভাউস বন্দরের কাছে এলো। দূর থেকে বন্দরের রাস্তাঘাট ঘরবাড়ি দেখা গেল। বন্দরটা বেশ সমতল জায়াগায়। দূর থেকে ফ্রান্সিস মনোযোগ দিয়ে বন্দরটা দেখতে লাগল। দেখল রাস্তাঘাটে লোকজন চলাচল করছে। বেশ স্বাভাবিক জীবন। কোনো সৈন্য দেখতে পেল না। তার মানে এনরিকো এখনও এই বন্দরটা দখল করতে পারেনি। হ্যারি পাশেই দাঁড়িয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল—এখান থেকে দেখে যা বুঝছিএখানে এনরিকোর সৈন্যরা এখনও আসেনি। জাহাজ ভেড়াবো কিনা তাই ভাবছি।
হ্যারি বলল—রসুইঘরের বন্ধুরা বলেছিল, জল, খাবার এসবকম এসেছে। তুমি খানিয়া যেতে চাইছো। কাজেই কিছু খাদ্য জল তো সংগ্রহ করা প্রয়োজন। তাছাড়া এনরিকোর দুজন সৈন্য জাহাজে রয়েছে। ওদেরও তোনামিয়ে দিতে হবে।
ঠিক আছে। জাহাজ ভেড়ানো যাক। তবে আমরা কেউ আগে নামবো না। আগে কাভাল্লি নামবে সৈন্য দুজনকে নিয়ে। কাভাল্লি জল, খাদ্য এসবের খোঁজ নিয়ে আসবে। সেই সঙ্গে এখানকার অবস্থাটাও বুঝে আসবে। যদি কোন বিপদে পড়ার আশঙ্কানা থাকে তবেই আমরা নামবো। ফ্রান্সিসের নির্দেশে জাহাজতীরের কাছে আনাহলো। ওরা সমতল রাস্তা দিয়ে হেঁটে বন্দরের বসতি অঞ্চলের দিকে চলে গেল।
ফ্রান্সিস জাহাজ-চালককে নির্দেশ দিল—তৈরি থেকো। আমি হাত তোলার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ ছেড়ে দেবে। দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে গিয়ে দাঁড়ে হাত রেখে বসল। পালও নামানো হলো না। নোঙরও ফেলা হলো না। কাঠের পাটাতনের কাছেও দু’তিনজন ভাইকিং তৈরি হয়ে রইল। ফ্রান্সিসের নির্দেশ পেলেই পাটাতন তুলে ফেলবে।
ফ্রান্সিস হ্যারি মারিয়া জাহাজের রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে রইল। তিনজনেই তাকিয়ে আছে বন্দরের বসতি অঞ্চলের দিকে। সবাই টান টান। তৈরি। বিপদের আঁচ পেলেই জাহাজ ছেড়ে দেবে।
প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেল। ফ্রান্সিস ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে এখন? তখনই দেখা গেল কাভাল্লি ফিরে আসছে। বেশ নিশ্চিন্ত মনেই হেঁটে হেঁটে আসছে। ফ্রান্সিস হাঁপ ছাড়ল—যাক, বিপদের কোনো আশঙ্কা এখানে নেই। কাভাল্লি জাহাজে উঠল, ফ্রান্সিসের কাছে এলো। হেসে বলল-ভয়ের কিছু নেই। এনরিকোর সৈন্যরা এখনও এখানে আসেনি। রাজা বোনিফেসের কিছু সৈন্য এখানে আছে। খুব শান্ত এ জায়গা। আমি জল খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করে এসেছি। আমার সঙ্গে লোক দিন আর কিছু স্বর্ণমুদ্রা। আমি সব নিয়ে আসছি। ফ্রান্সিস ভাইকিং বন্ধুদের ডেকে কয়েকজনকে দায়িত্ব দিল। তারা স্বর্ণমুদ্রা, খালি জলের পিপে, বস্তা-টস্তা এসব নিয়ে কাভাল্লির সঙ্গে তীরে নামল। চলল বসতি অঞ্চলের দিকে।
ঘন্টাখানেকের মধ্যেই ভাইকিংরা প্রয়োজনীয় খাবার-দাবার পানীয় জল নিয়ে ফিরে এলো। ফ্রান্সিসরা নিশ্চিন্ত হলো।
রাতে কেবিনঘরে বিছানায় শুয়ে ফ্রান্সিস বুঝল বেশ গরম লাগছে। ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করল। ঘুম আসছে না। আবার চিন্তাও আছে মাথায়। খানিয়া যেতে হবে। ওখানে এখন কী অবস্থা তাও জানি না। যদি গিয়ে দেখি বিদ্রোহী এনরিকোর সৈন্যরা ওখানে পৌঁছে গেছে। লড়াই চলছে তাহলে তো খানিয়া বন্দরে নামা চলবে না। ওখান থেকেই জাহাজ ঘোরাতে হবে স্বদেশের দিকে। এসব ভাবতে ভাবতে বেশ রাতে ঘুমিয়ে পড়ল ফ্রান্সিস
হঠাৎ ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। একটা চাপা গরমে ও প্রায় ঘেমে উঠেছে। বিছানায় উঠে বসল ফ্রান্সিস মোমবাতির আলোয় দেখল মারিয়া গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ও আরমারিয়াকে ডাকল না। আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠল। তারপর কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ডেক-এ উঠে এলো। দেখল সমুদ্র শান্ত কিন্তু আকাশ খুব পরিষ্কার নয়। কেমন একটা সাদাটে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা আকাশে। চাঁদের আলোও তাই অস্পষ্ট ম্লান।
ফ্রান্সিস দেখল। ডেক-এ এখানে-ওখানে কম্বলমতো মোটা কাপড় পেতে কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু শুয়ে ঘুমুচ্ছে। গুমোট গরম থেকে এসে ফ্রান্সিসের ভালোই লাগল। কিন্তু হাওয়া নেই একেবারে। গ্রামভাউসার বাড়িঘরও সাদাটে কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা পড়েছে।
ফ্রান্সিস জাহাজের ডেক-এর একেবারে পেছনের দিকে এলো। একটা চৌকোণো মতো জায়গা রয়েছে। ফ্রান্সিস সেখানেই মাথার নীচেহাত রেখে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তখনই মৃদু ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করল। আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের দুচোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ফ্রান্সিস জানেনা। হঠাৎ কী একটা অস্বস্তিতে ওর ঘুম ভেঙে গেল। ও উঠে বসল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝল রাত শেষ হয়ে আসছে। আবার শুয়ে পড়বে কিনা ভাবছেকানে অস্পষ্ট ছলাৎ ছলাৎ জলের শব্দ পৌঁছল। এ তো জাহাজ চলার শব্দ। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তাকাল বাইরের সমুদ্রের দিকে। অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় দেখল একটা জাহাজ যতটা সম্ভব নিঃশব্দে ওদের জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে। ফ্রান্সিস প্রথমে বুঝে উঠতে পারল না কী করবে। ও জাহাজটার মাস্তুলে কোনো দেশের পতাকা আছে কিনা দেখল। না কোনো পতাকা উড়ছেনা। জাহাজটা আরো কাছে এলোয় সাদাটে কুয়াশা আর অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় ফ্রান্সিস দেখল জাহাজের সামনের দিকে কালো রঙের কাঠ অনেকটা চটে উঠে গিয়ে খয়েরি রঙের কাঠ বেরিয়ে আছে। এবার ফ্রান্সিস ভীষণ চমকে উঠল। এই যুদ্ধ জাহাজটাইও ফালাসন বন্দরে ভেড়ানো দেখেছিল। বিদ্রোহী এনরিকোর যুদ্ধ জাহাজটা ঐ জাহাজে চড়েই এনরিকোর সৈন্যরা আসছে গ্রামভাউসা বন্দর দখল করতে।
