হ্যাঁ, তবে খুব পাথর-টাথরের রাস্তা। কাভাল্লি বলল।
ঠিক আছে—ঐ রাস্তা দিয়ে নিয়ে চলো আমাদের। ফ্রান্সিস বলল।
কাভাল্লি ডানদিকের ঢালের দিকে চলল। পেছনে ফ্রান্সিসরা চলল। সবাই চুপ। কেউ কোনো শব্দ করছে না। ঢাল শেষ হতে কাভাল্লি বাঁ দিকে ঘুরল। সত্যিই বড়ো বড়ো পাথরের টুকরো ছড়ানো এদিকটায়। রাস্তা বলে কিছু নেই। চলল সবাই। দু’তিনজন পাথরে পা হড়কে পড়ে গেল। কেটে ছড়ে গেল হাঁটু, পা। কিন্তু কেউ এতটুকু শব্দকরল না। মারিয়া হোঁচট খেল। পায়ের বুড়ো আঙুলটা টনটন করে উঠল। মারিয়া মুখ বুজে সহ্য করল। ছড়ানো পাথরের ওপর দিয়ে দ্রুত ছোটা যায় না। তবু যত দ্রুত সম্ভব ছুটল সবাই। বাঁ দিকে একটা ছোটো চড়াই পেরোতেই ওরা দেখল সমুদ্রতীরের ঢাল। তীরে ভাসছে ওদের জাহাজ। জাহাজ থেকে পাতা পাটাতনটা তখনও সৈন্যরা তুলে রাখেনি।
পাটাতন দিয়ে সার বেঁধে দ্রুত জাহাজে উঠে পড়ল সবাই। মারিয়া কেবিনঘরে চলে গেল। ভেজা পোশাকে ওর কাপুনি ধরে গেছে। জাহাজে উঠতে আর দু’তিনজন বাকি। তখনই টিলার দিক থেকে কয়েকজন সৈন্যের চিৎকার ভেসে এলো। ওদের তখন হুঁশ ফিরেছে বোধহয়। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল—জাহাজ নোঙর করা হয়নি।
দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে চলে যাও। কোনো শনাকরেদাঁড় বাইতে থাকো। আমি হুইল ধরছি।
দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে চলে গেল। বাকিরা জাহাজে উঠেই কাঠের পাটাতনটা তুলে নিল। টিলার দিক থেকে কয়েকজন সৈন্যকে তখন টলতে টলতে আসতে দেখা গেল। দড়িরা দাঁড় বইতে লাগল। জাহাজ একটু নড়ে উঠেতীরের কাছ থেকেসরে যেতে লাগল। জলে দাঁড়ের ঘায়ের মৃদুশব্দ উঠল—ছপছপ ফ্রান্সিস হুইল ঘোরাল। জাহাজ গতি পেল। ভেসে চলল মাঝ সমুদ্রের দিকে। একটু পরেই ঘন কুয়াশার মধ্যে জাহাজটা ঢাকা পড়ে গেল। জাহাজ চলল উত্তরমুখো। এবার ভাইকিংরা মাস্তুলে উঠে পড়ল। দড়িদড়া টেনে পাল খুলে বেঁধে দিল। হাওয়ায় পালগুলো ফুলে উঠল। জল কেটে জাহাজ বেশ দ্রুত চলল।
ফ্রান্সিস হ্যারি বিস্কো তখন ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। পুব আকাশে লাল রঙের ছোপ লেগেছে। সূর্য উঠতে দেরি নেই।
মারিয়া পোশাক পাল্টে ওদের কাছে এলো। বলল—আমার পাহারাদার দুজন তো উঠে বসে আছে। শাঙ্কো ওদের তলোয়ার আগেই সরিয়ে রেখেছে। ওরা হাঁকরে তাকিয়ে আছে। এখনও বুঝতে পারছে না কী ঘটে গেছে।
ওরা দুজন জাহাজেই থাক। সামনে কেনো বন্দরে ওদের নামিয়ে দেব। ফ্রান্সিস বলল।
পুব আকাশ আরো লাল হলো। সূর্য উঠেছে। ফ্রান্সিস কাল সেদিকে। সমুদ্রে সূর্যোদয়ের সেই অতি পরিচিত দৃশ্য। একটু একটু উঠতে উঠতে সূর্যের নীচের দিকটা জলের সঙ্গে লেগে থাকে। একটা বড়ো বিন্দু যেন। একটু পরেই বিন্দুটা লাফিয়ে উঠে ওপরের গোলের সঙ্গে মিশে যায়। সূর্যোদয় দেখতে দেখতে ফ্রান্সিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল—আঃ মুক্তি।
সন্ধেবেলা ফ্রান্সিস,কাভাল্লি, হ্যারি আর মারিয়াকে নিয়ে জাহাজের ডেকে উঠে এলো। ও কাভাল্লিকে বলল—আচ্ছা, রাজধানী খানিয়া বন্দরে যেতে হলে আমরা কীভাবে যাবো?
উত্তরে একটা বন্দর পাবো—গ্রামভাউসা। ওখান থেকে পুবদিক ধরে জাহাজ চালালে আমরা কয়েকদিনের মধ্যেই খানিয়া বন্দরে পৌঁছে যাবো।
গ্রামভাউসা বন্দরের কী অবস্থা জানি না। এনরিকোর সৈন্যরা হয়তো ঐ বন্দর দখল করে নিয়েছে। কাজেই ঐ বন্দরে আমরা নামবো না। খানিয়ার দিকে জাহাজ চালাবো। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস তুমি কি সত্যিই খানিয়া যাবে।
হ্যাঁ—শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাটের নিখোঁজ মুকুট খুঁজে বের করবো। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি মৃদু আপত্তির সুরে বলল—কিন্তু বন্ধুরাকি রাজি হবে? আমরা তো অনেকদিন দেশ ছাড়া।
ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি, তুমি সবাইকে ডেকে আসতে বলল। দেখি ওরা কী বলে। হ্যারি সবাইকে খবর দিতে চলে গেল। মারিয়ার দিকেতাকিয়ে ফ্রান্সিস বলল মারিয়া, তুমিও কি দেশে ফিরে যেতে চাও?
তুমি যেখানে যাবে, আমিও সেখানে যাবো। ফ্রান্সিস হেসে বলল—মারিয়া, আমি তোমার কাছ থেকে এই কথাই আশা করেছিলাম।
একটু রাতে সব ভাইকিং বন্ধুরা এসে ডেকে জড়ো হলো। ফ্রান্সিস বলতে লাগল ভাইসব, আমি জানি তোমরা অনেকেই দেশে ফিরে যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু দেশে ফিরে কী হবে? সেই তো সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের অলস জীবন। তোমরা ভালো করেই জানো ঐ অর্থহীন সুখের একঘেয়ে জীবন আমরা চাই না। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল কাভাল্লির কাছে এই ক্রীটের কিছু ইতিহাস শুনেছি। খানিয়া দুর্গে শেষ বাইজেন্টাইন। সম্রাট তাঁদের বংশানুক্রমে ব্যবহৃত রাজমুকুট গোপনে রেখে দিয়েছেন। সেই ইতিহাস তোমরা কাভাল্লির কাছে শুনো। আমি স্থির করেছি সেই নিখোঁজ রাজমুকুট উদ্ধার করবো। কাজেই আমরা এখন খানিয়া যাবে। এবার বলো তোমাদের কারো এতে আপত্তি আছে। কিনা। ফ্রান্সিস থামল। ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে একটু গুঞ্জন উঠল। একজন বলল—ফ্রান্সিস ভেবে দেখো,কতদিন আমরা দেশ ছেড়ে এসেছি। খানিয়াতে গিয়ে আবার কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বো কিনা—
সেসব আমি ভেবেছি। খানিয়াতে আমি যাবোই। যদি দেখি ওখানে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তাহলে ওখানে আমরা নামবো না। দেশের দিকে জাহাজ ঘোরাব। কিন্তু যদি দেখি পরিবেশ শান্তিপূর্ণ তাহলে রাজমুকুট খুঁজে বের করবো। একজন ভাইকিং বলে উঠল—কী দরকার ফ্রান্সিস, চলো না দেশেই ফিরে যাই।
