তাই নাকি? ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। এই পালাবার সুযোগ। কিন্তু দরজার তালার চাবি? গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখল—সিঁড়ির ওপর যে পাহারাদারটা পড়ে আছে তার কোমরে চাবির গোছা লাগানো। এখানে থেকে বেশ দূর। হাত বাড়িয়ে পাওয়া অসম্ভব। ফ্রান্সিস কয়েদঘরের চারদিকে একটা লাঠিমতো কিছু খুঁজতে লাগল! মশালের আলোয় দেখল কয়েদঘরের কোথাও লাঠিমতো কিছু নেই। বিস্কো ও আর কয়েকজন ভাইকিং উঠে এলো৷ ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ওদের সব বলল। কিন্তু নিরুপায় ওরা। এই সুবর্ণ সুযোগটাকে ওরা কাজে লাগাতে পারল না। ফ্রান্সিস আক্ষেপের সঙ্গে গবাদ ধরে ঝাঁকুনি দিল। শব্দ হলো ঠং। হ্যারি ধমক দিল—ফ্রান্সিস শব্দ করো না!
সময় বয়ে চলল। ওরা গরাদের সমনে অসহায়ভাবে বসে রইল না।
ওদিকে জাহাজে নিজেদের কেবিনঘরে সৈন্যদের হৈ-হল্প শুনতে শুনতে মারিয়া ঘুমিয়ে পড়েছিল। মারিয়ার ঘুম খুব পাতলা। একটু কানে গেলেই ওর ঘুম ভেঙে যায়। ও হঠাৎ দরজার কাছে একটা শব্দ শুনল–ধপ। ওর ঘুম ভেঙে গেল। কী ব্যাপার?ও একবার ভাবল পাহারাদারদের ডাকে। পরক্ষণেই ভাবল দরজা খুলে দেখা যাক। মারিয়া বিছানা থেকে নেমে এলো। আস্তে আস্তে দরজা ঠেলল। দরজা খুলল না। আবার ঠেলল। কিছুটা দরজা খুলল আবার কিছুর চাপে সরে এল। মারিয়া এবার জোরে ঠেলল। একজন পাহারাদার সৈন্য দরজায় ঠেস দিয়ে চোখ বুজে পড়েছিল। দরজার ধাক্কায় সৈন্যটা গড়িয়ে কাঠের মেঝেয় পড়ে গেল। বেহুশ। মারিয়া দরজা খুলে সৈন্যটিকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে অবাক। অন্য সৈন্যটিও মেঝেয় উপুড় হয়ে পড়ে আছে। মড়ার মতো দুজনেই অনড়। শরীরে কোনো সাড় নেই। মারিয়া প্রথমে কিছুই বুঝল না। একটুক্ষণ দাঁড়াল। সৈন্য দুজন সেই একইভাবে পড়ে আছে। মারিয়া এর কারণ বুঝল না। কিন্তু ওর মন আনন্দে নেচে উঠল—মুক্তি।
মারিয়া আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। দ্রুত ভেবে নিল কী করতে হবে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা চলবে না। মারিয়া ভেবে দেখল—এই পাহারাদার দুজন যে কারণেই হোক বেহুঁশ হয়ে গেছে। কিন্তু সমুদ্রতীরে পাতা পাটতনের ধারে অন্য সৈন্যরা থাকতে পারে। পাটাতন দিয়ে জাহাজ থেকে নামা চলবে না। সাঁতরে তীরে উঠতে হবে। কিন্তু মারিয়া পরনের পোশাকের দিকে তাকাল। পায়ের পাতা অব্দি ঝুল পোশাকটার। এটা পরে সাঁতরানো যাবে না। মারিয়া হাত বাড়িয়ে চামড়ার ঝোলাটা নিল। ঝোলা খুলে কচি বের করল। তারপর হাঁটুর নীচে থেকে পোশাকের বাড়তি অংশটা কচুক করে দ্রুত হাতে কেটে ফেলল। এবার আর সাঁতরাতে কোনো অসুবিধে হবে না!
মারিয়া আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ডেকে উঠে এলো। ছুটে মাস্তুলের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে ভাঙা চাঁদ। মৃদু জ্যোৎস্না পড়েছে সমুদ্রে, সমুদ্রতীরের ছোটো টিলাটায়। ও দেখল, কেউ কোথাও নেই। দ্রুত জাহাজের ওপাশে চলে গেল। দড়িদড়া ধরে ঝুলে পড়ল। আস্তে আস্তে সমুদ্রের জলে নামতে লাগল। হাত ছড়ে যাচ্ছে যেন। তবু মারিয়া দাঁত চেপে সহ্য করল। আস্তে আস্তে সমুদ্রের জলে নামল।
কোনোরকম শব্দ না করে জাহাজের পাশে সাঁতারে চলল। তারপর জাহাজ পাশে রেখে তীরভূমির দিকে সাঁতরে চলল। দূরত্ব বেশি নয়। তবুও যখন জল থেকে পাথর ছড়ানো তীরে উঠল তখনও হাঁপাচ্ছে উত্তেজনায়। চারদিকে তাকাল। না, কেউ কোথাও নেই। চাঁদের অল্প আলোয় পাথরের টুকরোয় ফেলে ফেলে মারিয়া পাথুরে রাস্তাটায় এলো। একটা ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটে এলো। জলে ভেজা শরীরটা কেঁপে উঠল। পাথরের টুকরোর ওপর দিয়ে যতটা দ্রুত সম্ভবও ছুটল কয়েদঘরের দিকে।
পাথর ছড়ানো রাস্তাটার ঢাল বেয়ে উঠে এসে ছোটো টিলাটার কাছে পৌঁছে মারিয়া সাবধান হলো। মাথা নিচু করে আসছিল এতক্ষণ। এখন আরো নীচু হয়ে চলতে লাগল। তখনই চাঁদের মৃদু আলোয় দেখল রাস্তার পাশেই একটা পাথরের চ্যাপ্টা চাইয়ের ওপর দু’তিন জন এনরিকোর সৈন্য। মারিয়া ভয়ে একলাফে পিছিয়ে এলো। দেখল সৈন্য ক’জন কেউ নড়ছে না। ও এবার সাহস করে এগিয়ে এলো। দেখল একজন সৈন্য বসে আছে। মাথা বুকের ওপর ঝুঁকে আছে। অন্য দুজন হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। পাথরের চাঁই থেকে পা ঝুলছে। মারিয়া হাঁপ ছাড়ল। আবার মারিয়া মাথা আরো নিচু করে চলল। তখনই একবার মাথা একটু তুলে পাথরের চাইয়ের আড়াল থেকে পাথর ছড়ানো প্রান্তরের দিকে তাকাল। চাঁদের অল্প আলোয় দেখল—প্রান্তর জুড়ে সৈন্যরা এলোমেলো সব শুয়ে আছে। মনে হলো যেন এক দঙ্গল মৃতদেহ। কারো কোনো সাড় নেই। শামিয়ানার নীচে নিভন্ত উনুন থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। দুটো গাধা চরে বেড়াচ্ছে।
মারিয়া এবার নিশ্চিন্ত হলো। মনে সাহসও পেল। তবু মাথা নীচু করে ছুটতে ছুটতে কয়েদঘরের সামনে এলো।
.
ফ্রান্সিস, হ্যারি আর কয়েকজন তখনও গরাদ দেওয়া দরজার কাছে বসে আছে। ফ্রান্সিস বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। ওই প্রথম মারিয়াকে দেখল। কিন্তু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। ও চমকে উঠে দাঁড়াল তখন মারিয়া সিঁড়িতে পড়ে থাকা পাহারাদারটিকে ডিঙিয়ে দরজার কাছে এলো। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল, মারিয়া। মারিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—হ্যাঁ আমি। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল, ঐ যে সৈন্যটা সিঁড়িতে পড়ে আছে—ওর কোমরে চাবির গোছা আছে। খুলে নাও। তাড়াতাড়ি মারিয়া ঘুরে দাঁড়াল। সিঁড়িতে পড়ে থাকা পাহারাদারটির কোমর থেকে আস্তে আস্তে চাবির গোছাটা খুলে নিল। ফ্রান্সিস নিচু হয়ে হ্যারিকে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিয়ে ডাকল—হ্যারি, হ্যারি হ্যারি চোখ মেলে তাকাল। ও মশালের আলোয় মারিয়াকে দেখেই একলাফে উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস ফিসফিস করে বলল—সবাইকে ডাকো। কোনো শব্দ হয় না যেন। ওদিকে মারিয়া একটার পর একটা চাবি তালায় লাগাচ্ছে। লাগছে না। সময় যাচ্ছে। উত্তেজনায় মারিয়ার হাত কাঁপছে। ভেজা কাপড়জামা গায়ে। তবু যেন। ঘেমে উঠল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল—তাড়াহুড়ো করো না। ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করো। দুটো বড়ো চাবি পেল মারিয়া, একটা ঢোকাল, ঘোরাবার চেষ্টা করল। ঘুরল না। পরেরটা ঢুকিয়ে ঘঘারাতেই কটু করে শব্দ হলো। তালা খুলে গেল। ফ্রান্সিস দরজার গরাদ ধরেই ছিল। আস্তে আস্তে দরজাটা খুলল। অস্পষ্ট কাঁচ কোচ শব্দ উঠল লোহার দরজায়। ততক্ষণে সব ভাইকিংরা জেগে গেছে। ফ্রান্সিস আর হ্যারি আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস হাত তুলে সবাইকে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করল। নিজে গেল টিলাটার কাছে। চারদিকে তাড়াতাড়ি নজর বুলিয়ে নিল। কোনো সৈন্য কোথাও দাঁড়িয়ে নেই। দ্রুত ছুটে এলো বন্ধুদের কাছে। কাভাল্লিকে বলল—ঐ টিলার দিক ছাড়া জাহাজঘাটায় যাওয়ার অন্য কোনো রাস্তা তোমার জানা আছে?
