ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরের সামনে এলো। দুজন সৈন্য এগিয়ে এসে মারিয়াকে বলল—আমাদের সঙ্গে জাহাজে চলুন। হারি মারিয়াকে কথাটা বুঝিয়ে দিল। মারিয়া ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল—না,আমি তোমাদের সঙ্গে এখানেই থাকবো। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল—পাগলামি করো না। তুমি বাইরে মুক্ত থাকবে। বুদ্ধি করে আমাদের মুক্ত করার চেষ্টা করতে পারবে। কিন্তু এই কয়েদঘরে থাকলে সে আশাই থাকবে না। এই কয়েদঘরেই আমাদের তিলে তিলে মরতে হবে। মারিয়া খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। বুঝল ফ্রান্সিসের কথাই ঠিক। ও আর আপত্তি করল না। তবু ফ্রান্সিসদের এই কষ্টকর বন্দিজীবনের কথা ভেবে মারিয়ার মন খারাপ হয়ে গেল। বিষমুখে মারিয়া দুজন সৈন্যের পাহারায় ওদের জাহাজে চলে গেল।
কয়েদঘরে ফ্রান্সিস আর হ্যারি ঢুকতেই সব ভাইকিং বন্ধুরা ওদের ঘিরে ধরল। একজন সৈন্য এসে সবার হাতের বাঁধন খুলে দিল। ফ্রান্সিস সকলের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে এনরিকোর সঙ্গে ওদের যা কথাবার্তা হয়েছে সব বলল। সবশেষে বলল—ভাইসব, এনরিকোর সেনাবাহিনীতে আমরা ঢুকবো না! কোনো যুদ্ধে আমরা জড়াবো না। দুদিন সময় হাতে। দেখি এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় ভেবে বের করতে পারি কিনা। সবাই আবার ঘাসের বিছানায় গিয়ে বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল।
সারাদিন কেটে গেল। তখন সন্ধ্যে হয় হয়। হঠাৎ এনরিকোর সৈন্যদের মধ্যে খুব আনন্দ হৈ-হল্লা শুরু হলো। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল—পাহারাদারদের জিজ্ঞেস করো তো কি ব্যাপার? হারি কয়েদঘরের দরজার কছে এলো। গরাদের ফাঁকে মুখ চেপে জিজ্ঞেস করলো কী হয়েছে ভাই? এত চ্যাঁচামেচি কীসের? একজন পাহারাদার বলল—খুব খুশির খবর এসেছে। লিসস-এর যুদ্ধে বোনিফেসের সৈন্যবাহিনী হেরে গেছে। সব পালিয়েছে। লিসস এখন আমাদের দখলে। হ্যারি ফিরে এসে ফ্রান্সিসকে বলল সব কথা। হ্যারির কাছে কাভাল্লি শুনল সবকথা। বলল—লিসস দক্ষিণের একটা বন্দর। রাজধানী খানিয়া একেবারে উত্তরে। এনরিকোর খানিয়া দখল করতে এখনও অনেক দেরি।
সন্ধের পরেই শুরু হলো এনরিকোর সৈন্যদের বিজয় উৎসব। পাহাড়ি পথের পাশে পাশে পাথরের চাঁইগুলোরওপাশে যে পাথর ছড়ানো প্রান্তর সেখানে চার জায়গায় শামিয়ানা। মতো টাঙানো হলো। তার নীচে পাথর এনে উনুন পাতা হলো। উনুন জ্বালানো হলো। দশ পনেরোটা ভেড়া কাটা হলো। উনুনের ওপর শিকে ভেড়ার মাংস গেঁথে পোড়ানো হতে লাগল। চলল সৈন্যদের আনন্দ হৈ-হল্লা গান আর নাচ। গাধার পিঠে চাপিয়ে আনা হলো নেশার আরকের ছোটো ছোটো পিপে। একটু রাতে মাংস খাওয়া, আরক খাওয়া শুরু হলো।
ফ্রান্সিসদের রাতের খাওয়া হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। রাত বাড়ছে। এখন দুহাত খোলা। মাথার পেছনে দুহাত রেখে ফ্রান্সিস ঘাসের বিছানায় শুয়ে আছে। অনেক চিন্তা মাথায়। এনরিকোর হাতের মুঠি থেকে পালাতে হবে। যে করেই হোক। ফ্রান্সিস ভাবতে ভাবতে চোখ বুজল। কিন্তু ঘুম আসছে না।
রাত বাড়ল। হঠাৎ ফ্রান্সিসের খেয়াল হলো বাইরে সব চিৎকার কোলাহল একেবারে থেমে গেছে। নিস্তব্ধ চারদিক। ও কয়েদঘরের দরজার লোহার গরাদের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। মশালের আলোয় দেখল পাহারাদার দুজন নেই। তাদের পায়ের শব্দ বা কথাবার্তা কিছুই শোনা যাচ্ছে না। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি উঠে বসল। কী ব্যাপার? ও একছুটে দরজার কাছে এলো। বাইরের মশালের আলোয় দেখল, পাহারাদারদের একজন পাথরের সিঁড়ির উপর হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। মাথার উষ্ণীষ তলোয়ার মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। অন্য পাহারাদারটি বারান্দায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। তার বর্ম উষ্ণীব দুটোই পাশে পড়ে আছে। তলোয়ারটা পায়ের কাছে মাটিতে। ওদের দুজনেরই মাথার কাছে পড়ে আছে দুটো চীনেমাটির বাটি। একটা বাটিতে কিছু নেই, অন্যটার তলায় কালো রঙের জলের মতো কী যেন রয়েছে। সৈন্য দুজন একেবারে মড়ার মতো পড়ে আছে। নড়ছেও না। প্রান্তরের দিক থেকেও কোনো শব্দ ভেসে আসছে না। চারদিকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। কী ব্যাপার? সবাই কি ঘুমিয়ে পড়ল?কিন্তু সবাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল—আশ্চর্য ব্যাপার। ফ্রান্সিস দ্রুত কাভাল্লির কাছে এলো। ধাক্কা দিয়ে কাভাল্লির ঘুম ভাঙাল। কাভাল্লি উঠে বসল। চোখ ডলতে ডলতে বলল-কী ব্যাপার?
চলো তো দরজার কাছে। সৈন্যদের কোনো সাড়াশব্দ নেই। পাহারাদার দুটো মড়ার মতো পড়ে আছে।
বলো কি। কাভাল্লি ছুটে দরজার কাছে এলো। গরাদের ফাঁক দিয়ে পাহারাদার দুজনকে দেখল। তারপর চীনেমাটির বাটিতে কালো রঙের তরল জিনিসটা দেখে কাভাল্লি মুখে দুহাত চেপে নিঃশব্দে হাসতে লাগল। ততক্ষণে হ্যারি ও উঠে এসেছে। পাহারাদারদের ঐ অবস্থা দেখে হ্যারি ও অবাক। ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল, কাভাল্লি হাসছ কেন?কী ব্যাপার? কাভাল্লির হাসি বন্ধ হলো। কাভাল্লি বলল–উৎসবের আনন্দে সৈন্য, পাহারাদার সবাই আরক খেয়ে বেহুশ হয়ে গেছে।
আরক?
হ্যাঁ—ঐ যে বাটিটার তলায় একটু পড়ে আছে। কালো রঙের। ওটা পোলিরিনার আরক। কালো কুচকুচে আঙুরের রসের সঙ্গে কী সব মিশিয়ে পোলিরিনার কৃষকরা ঐ আরক বানায়। ঐ আরক এক বাটি খেলে পাঁচ-ছ ঘণ্টা কোনো হুশ থাকে না। খুশির ঠ্যালায় ঐ আরক খেয়ে সব সৈন্য পাহারাদার কুপোকাৎ। কাভাল্লি বলল।
