স্থলপথে যেতে গেলে পুবের দিকে পোলিরিনা হয়ে যেতে হবে। জলপথে যেতে গেলে উত্তরে গ্রামভাউসা বন্দর হয়ে পুবমুখো যেতে হবে। কেন যাবে নাকি? কাভাল্লি বলল।
ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল—আগে তো এখান থেকে ছাড়া পাই। তারপর হ্যারিকে বলল—হ্যারি কালকেদলপতি আমাদের এনরিকোর সামনে নিয়ে যাবে। আমি তো গ্রীক ভাষা জানি না। তবু তুমি কিছু জানো। যা যা বলবে সব ভেবে রাখো।
আমার সব ভাবা হয়ে গেছে। এখন সবকিছু নির্ভর করছে এনরিকো মানুষটা কেমন তার ওপর। বিদ্রোহী নেতা-মনমেজাজ কেমন কে জানে! হ্যারি বলল।
রাত হলো। ফ্রান্সিসদের মধ্যে আর বিশেষ কোনো কথাবার্তা হলোনা। খাওয়া-দাওয়ার পর শুয়ে পড়ল সবাই। রাত বাড়ল। ফ্রান্সিসের মাথায় নানা চিন্তা। তবুমারিয়াকে ডেকে বলল—তোমার অসুবিধে হচ্ছে বুঝি তবু আজেবাজে চিন্তা না করে নিশ্চিন্তে ঘুমোও। শারীরটা ঠিক রাখো। একটু রাতে ফ্রান্সিসের দু’চোখ ঘুমে বুজে এলো।
পরদিন একটু বেলায় সেই লম্বা চেহারার দলপতি এলো। কয়েদঘরের দরজা খোলা হলো। দলপতি সকলের দিকে তাকিয়ে হ্যারিকে খুঁজল। হ্যারি উঠে দাঁড়াল। দলপতি হ্যারিকে দেখে বলল—তুমি গ্রীক ভাষা মোটামুটি জানো বলতেও পারো। তুমি এসো।
আমার সঙ্গে আরো দুজনকে যেতে দিতে হবে।
তারা তো গ্রীক ভাষা জানে না। দলপতি বলল।
তবু আমাকে পরামর্শ তো দিতে পারবে। হ্যারি বলল।
বেশ চলো। দলপতি বলল।
দলপতির পেছনে পেছনে হ্যারি, ফ্রান্সিস আর মারিয়া কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এলো। দুজন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে ওদের পেছনে পেছনে চলল। ফ্রান্সিস একবার ভাবল হাতের বাঁধন খুলে দিতে বলবে। কিন্তু কিছু বলল না।
পাথর ছড়ানো পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ওরা চলল। রাস্তায় দুধারে পাথর গেঁথে তৈরি বাড়িঘর। স্ত্রী-পুরুষরা ফ্রান্সিসদের দেখল। ওরা খুব অবাক হলো মারিয়াকে দেখে আর মারিয়ার পোশাক দেখে।
একটা ছোটো টিলার ঢালে মোটামুটি পরিচ্ছন্ন একটা পাথরের বাড়ির সামনে এলো ওরা। পাথরের দরজা পার হয়ে দলপতি একটা বেশ বড় ঘরে ঢুকল। পিছনে তাকিয়ে ফ্রান্সিসদেরও ঢুকতে ইঙ্গিত করল।
একটু অন্ধকার মতো ঘরটায় দেখা গেল মখমলমোড়া একটা আসনে সাধারণ অথচ দামি কাপড়ের জোব্বাপরা একজন মধ্যবয়সী লোক বসে আছে। মুখে দড়ি গোঁফ। ফ্রান্সিস বুঝল—এই লোকটাই এনরিকো, বিদ্রোহী নেতা। এনরিকোর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি লক্ষ্য করে ফ্রান্সিস বুঝল, এনরিকো ধূর্ত এবং ক্ষমতালোভী। দলপতি একটু মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে কী বলে গেল—হ্যারি আস্তে আস্তে বলল—আমাদের কথা বলছে। দলপতির কথাগুলো এনরিকো মন দিয়ে শুনল। এবার ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে এনরিকো বলল—তোমরা কারা?
হ্যারি গ্রীকভাষায় উত্তর দিল—আমরা ভাইকিং।
এই ক্রীট দ্বীপে এসেছো কেন? এনরিকো বলল।
আমরাজ জাহাজে চড়ে চিকামা থেকে ফিরছিলাম। ঝড়ে পথ হারিয়ে এখানে এসেছি। আমরা এখানে থাকতে আসিনি। আমরা কাউকে হত্যাও করিনি, লুঠপাটও করিনি। তবে আমাদের বন্দি করা হলো কেন?
তোমরা ভাইকিং এটা দলপতি জেনে তোমাদের বন্দি করেছে। তোমরা দক্ষ নাবিক। বীর যোদ্ধাও। আমার সেনাবাহিনীতে তোমাদের মতো সাহসী যোদ্ধা প্রয়োজন। রাজা বোনিফেসের নাম শুনেছো? এনরিকো বলল।
হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে সাবধান হলো। ও খুব সহজভাবে বলল—না।
আমি কে তা জানো? এনরিকো বলল।
না। একই ভঙ্গিতে হ্যারি বলল।
ও। তাহলে এই দ্বীপের কোন সংবাদই তোমরা জানো না। যাকগে শোনো, এই দ্বীপের রাজা এখন বোনিফেস। সে এই দ্বীপকে ভেনিসীয় বডোলোক ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আমি এনরিকো। আমার নেতৃত্বে ক্রীটবাসীরা বিদ্রোহ শুরু করেছে। রাজা বোনিফেসকে আমরা ক্রীট থেকে তাড়াবো।
হ্যারি খুব বিনীতভাবে বলল—দেখুন এসব তো আপনাদের দেশের ব্যাপার। এসবের সঙ্গে আমাদের তো কোনো সম্পর্ক নেই।
তা নেই। কিন্তু তোমাদের মতো সাহসী যোদ্ধা আমাদের চাই। তোমাদের আমার সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতে হবে।
হ্যারি বেশ চিন্তায় পড়ল। বলল—আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে একটু কথা বলে আমাদের মতামত জানাচ্ছি। এনরিকো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো! হ্যারি ফ্রান্সিসকে সব কথা বলল। সব শুনে ফ্রান্সিস বলল—বলো যে আমরা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে দু’একদিন পরে আমাদের মতামত জানাব। হ্যারি এনরিকোকে বলল সেকথা। এনরিকো একটু ভেবে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানাল। হ্যারি বলল—আমাদের তো কয়েদঘরেই রাখা হয়েছে। কাজেই আমাদের হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হোক।
বেশ তাই হবে। এনরিকো বলল।
মারিয়াকে দেখিয়ে হ্যারি বলল ইনি মারিয়া, ভাইকিং দেশের রাজকুমারী। কয়েদঘরের কষ্টকর জীবন ইনি সহ্য করতে পারছেন না। এই জীবন যাপনে ইনি অভ্যস্ত নন। একে আমাদের জাহাজে থাকতে অনুমতি দিন। তবে এঁকে পাহারা দেবার জন্য সৈন্য রাখতে পারেন। তাছাড়া আমাদের এখানে ফেলে রেখে উনি একা জাহাজ চালিয়ে পালাতেই পারবেন না।
এনরিকো মন দিয়ে হ্যারির কথা শুনল। তারপর দলপতির দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিসদের হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া আর মারিয়াকে জাহাজ পাহারায় রাখার নির্দেশ দিল। দলপতি এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসের হাতের বাঁধন খুলে দিল। এনরিকো হাত তুলে ফ্রান্সিসদের চলে যেতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা ফিরে চলল কয়েদঘরের দিকে। এনরিকো হ্যারির সব অনুরোধ মেনে নিল এই আশায় যে এই দুর্ধর্ষ ভাইকিংদের পেলে তার সৈন্যবাহিনীর শক্তি বাড়বে। ফ্রান্সিস সেটা ভালো করেই বুঝল। কিন্তু ওর দুশ্চিন্তা বাড়ল। হাতে মাত্র দুটো দিন। এর মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি এনরিকোর বাহিনীতে যোগ না দেয় তাহলে এনরিকো ওদের প্রতি আর কোনো দয়ামায়া দেখাবে না। কয়েদঘরে হাত-পা বেঁধে বন্দি করে রাখবে। মাত্র দুদিন সময় হাতে। যে করেই হোক পালাতে হবে। কিন্তু কি করে? ফ্রান্সিস সারা রাস্তা এই কথাই ভাবতে ভাবতে এলো।
