তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
প্রয়া পাঁচ-ছ বছর খানিয়ায় গা ঢাকা দিয়ে রইলাম। খানিয়ার বন্দর দিয়ে পালাবার উপায় নেই। বোনিফেসের সৈন্যরা বন্দর পাহারা দিচ্ছে। কোনো জাহাজ বন্দর থেকে ছাড়তে দিচ্ছে না। কোনো জাহাজ বন্দরে ভিড়তেও দিচ্ছে না। তখন আমি পশ্চিমমুখো এই ফালাসন বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। হেঁটে ঘোড়ায় চড়ে দিন সাতেক পরে এখানে এসে পৌঁছলাম। এই বন্দরটা তখনও অবরোধ করা হয়নি। হয়তো কোনো জাহাজ পাবো। পর্তুগাল পালাবো। কিন্তু এখানে এসে এনরিকোর সৈন্যদের হাতে ধরা পড়লাম। তারা সন্দেহ করল আমি বোনিফেসের গুপ্তচর। এখানে বন্দি করে রাখল।
আচ্ছা, এনরিকো কে? এরা বোনিফেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে কেন?
এনরিকো আগে ছিল জলদস্যু। বোনিফেস রাজা হয়েই ভেনিসের কাছে ক্রীট দ্বীপকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে বাঁধা রেখেছে। এমনিতেই যে ভেনিসীয় লোকেরা এখানে ছিল তারা যথেষ্ট ধনীছিল। এখন ক্রীট দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্য ওদের হাতে চলে গেছে। ক্রীটবাসীরা এতে রাজা বোনিফেসের ওপর বিক্ষুদ্ধ হয়। জোনোদের নেতা এনরিকো এই বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে ক্রীটবাসীদের নেতা হয়েছে। সে তার সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলেছে। রাজা বোনিফেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। নানা জায়গায় দুই সৈন্যবাহিনীর মধ্যে ছোটোখাটো লড়াই চলছে।
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল—এসব এ দেশের লোকেদের ব্যাপার। আমরা এসবের মধ্যে নেই। যাকগে কাভাল্লি, তোমার নিখোঁজ রাজমুকুটের ঘটনাটা আরো কয়েকবার শুনবো। যতটুকু শুনলাম তাতে মনে হচ্ছে শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাটই রাজামুকুটের মর্যাদা রাখতে ওটা কোথাও গোপনে রেখে দিয়েছেন। এটুকু থেমে ফ্রান্সিস বলল—আচ্ছা সম্রাটের আঁকা সেই রাজমুকুটের ছবিটা কি তোমার কাছে আছে? কাভাল্লি বলল—হ্যাঁ আছে। কিন্তু কাউকে সেকথা বলতে পারবে না।
না, বলবো না। ফ্রান্সিস বলল। কাভাল্লি এবার যে ঘাসের ওপর বসেছিল সেখানকার ঘাসগুলো সরাল। নিচ থেকে বার করল একটা গোটানো সাদাটে ভেড়ার চামড়া। চামড়াটা দুহাতে খুলে টান করে ধরল। দেখা গেল নানা রঙ আঁকা একটি রাজমুকুটের ছবি (ভেড়ার চামড়ার ছবিটা পরের পৃষ্ঠায় আছে)। ছবিটার তলায় নানারকম ফুল-পাতার নকশা। হ্যারি সেইনকশাটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে বলল—ফ্রান্সিস, ছবিটার নীচে নকশার ভেতরে ভেতরে কিছু লেখা আছে। কয়েকটা প্রাচীন গ্রীক অক্ষর পড়তে পারছি। বাকিগুলো ঠিক বুঝতে পারছি না।
যে অক্ষরগুলো তোমার চেনা তা থেকে কোনো শব্দ বুঝতে পারছো? ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি নকশার জায়গাটা ভালো করে দেখতে দেখতে বলল—শব্দটা বোধহয় ভাগ্য। ফ্রান্সিস বেশ চমকে উঠল। বলল—আশ্চর্য! কাভাল্লিও সম্রাটের মুখে ভাগ্য’ কথাটা শুনেছিল। তাহলে এই নকশাটার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। নিখোঁজ রাজমুকুটের কিছু হদিস হয়তো এই নকশা থেকেই পাওয়া যেতে পারে।
অসম্ভব নয়। তবে একটা কথা অনায়াসে বলা যায় যে শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট বেশ বিদ্বান ও শিল্পী ছিলেন। হ্যারি বলল। এবার মারিয়া পাতলা চামড়াটা নিয়ে ছবি নকশা দেখতে লাগল। তখনই কয়েদঘরের লোহার দরজায় শব্দ উঠল—ঠাংঠাং। তালা খোলা হচ্ছে। কাভাল্লি তাড়াতাড়ি ছবিটা নিয়ে নিজের জোব্বার মধ্যে লুকিয়ে ফেলল।
দশজন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে লোহার দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল। দুজন দুটো বেশ বড়ো কাঠের পাত্র নিয়ে ঢুকল। একজন সৈন্য ঘাসের বিছানার সামনে পাথরের মেঝেয় এক ধরনের লম্বাটে পাতা পেতে দিতে লাগল। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। অনেক বেলাও হয়েছে। খুব খিদে পেয়েছে সকলেরই। সকলেই উঠে এসে খেতে বসল। পাতায় দুটো করে বেশ মোটা গোল রুটি আর দু’টুকরো ভেড়ার মাংস ও ঝোল দেওয়া হলো। হ্যারি সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল—বাঁধা হাতে খাবো কি করে?
বাঁধন খোলার হুকুম নেই, একজন সৈন্য বলল। সবাই খেতে লাগল। খিদে তো পেয়েছে। খুবই অসুবিধে হচ্ছে খেতে। তবু কেউ কিছু বলল না। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল—মারিয়া, এরকম কায়েদঘরে থাকা, এভাবে খাওয়া, তোমার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে।
মোটেই না। তোমরা যখন পারছো আমিই বা পারবো না কেন? মারিয়া বলল।
হ্যারি খেতে খেতে বলল—ফ্রান্সিস, নিখোঁজ রাজমুকুট খুঁজতে যাবেনাকি?
নিশ্চয়ই। কিন্তু তার আগে এই কয়েদঘর থেকে মুক্তি পেতে হবে।
দেখি কালকে এনরিকোর সঙ্গে কথা বলে। হ্যারি বলল।
খাওয়ার পর ঘরের কোণায় একটা পাথরের চৌবাচ্চার মতো জায়গায় সৈন্যরা খাবার জল ঢেলে দিল। চিনেমাটির বড়ো বাটি ডুবিয়ে সবাই জল খেল। সৈন্যরা লোহার দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে চলে গেল। দুজন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে দরজায় পাহারা দিতে লাগল।
বিকেল হলো। ফ্রান্সিস ঘাসের বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাভাল্লির কাছে শোনা ঘটনাগুলো ভাবছিল। ও মনস্থির করে ফেলেছিল এখান থেকে ছাড়া পেলেই খানিয়া যাবে। খানিয়া দুর্গ থেকে খুঁজে বের করবে বাইজেন্টাইন সম্রাটদের নিখোঁজ রাজমুকুট। ও এবার কাভাল্লির দিকে তাকাল। দেখল কাভাল্লি চোখ বুজে ঝিমুচ্ছে। ফ্রান্সিস ডাকল—কাভাল্লি।
হুঁ। কাভাল্লি মৃদু শব্দ করে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
আচ্ছা এখান থেকে কীভাবে খানিয়া নগরে যাওয়া যায়?
