তারপর? হ্যারি বলল।
শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট তখন খানিয়া দুর্গে থাকতাম। তাঁর শয়নকক্ষের দেয়াল মেঝে মোজেক করার ডাক পেলাম আমি। খুব মন দিয়ে চারজন সহকর্মী নিয়ে কাজ শুরু করলাম। সম্রাট প্রত্যেকদিন কাজ দেখতে আসতেন। তিনি নিজেও শিল্পী ছিলেন। নিজেই ভেড়ার চামড়ার রঙ দিয়ে নকশা এঁকে দিতেন। আমরা তাই দেখে দেখে কাজ করতাম। প্রায় এক বছর কাজ শেষ হলো। সম্রাট খুব খুশি হলেন কাজ দেখে। এবার সম্রাট নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর রাজমুকুট, পোশাক-পরিচ্ছদ, নানা কারুকাজ করা সোনার রাজদণ্ড, হাতির দাঁতের হাতলওলা তলোয়ার, বিচিত্র রঙে মিনে করা তলোয়ারের খাপ, ছোরা, দামি পাথরের অলঙ্কারমালা এসব সেই সজ্জাকক্ষে আনিয়ে রাখলেন। সভাকক্ষের যে দেখাশুনা করতো সে বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সম্রাট তাকে স্বর্ণমুদ্রা বকশিশ দিয়ে দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। সজ্জাঘরের সব দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। আমিই সম্রাটকে রাজসভায় যাবার আগে পোশাক পরিয়ে দিতাম। মুকুট পরিয়ে সাজিয়ে দিতাম। কিন্তু আমার ভাগ্যে সুখ শান্তি নেই।
কেন? কী হলো তারপর? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
একটু ইতিহাস বলি। কনস্টান্টিনোপলে তখন চতুর্থ ধর্মযুদ্ধ চলছিল। সেই যুদ্ধে হেরে গিয়ে একদল সৈন্য জাহাজে চড়ে ক্রীটে এলো। তাদের নেতা ছিল বোনিফেস। সম্রাট আগেই গুপ্তচর মারফৎ খবর পেয়েছিলেন যে বোনিফেস তার সৈন্যদল নিয়ে খানিয়া আসছে। উদ্দেশ্য ক্রীট দখল করা। যা হোক, খানিয়া বন্দরে বোনিফেসের সৈন্যদের সঙ্গে সম্রাটের সৈন্যদের দুদিন ধরে যুদ্ধ হলো। সম্রাটের সৈন্যরা হেরে গেল। বোনিফেস খানিয়া দুর্গ দখল করতে এলো। একটু থেমে কাভাল্লি বলতে লাগল—গভীর রাত তখন। সম্রাট আমাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন ক্রীটের চাষিদের জোব্বামতো কিছু পোশাক এনে দিতে। ছুটে গিয়ে এনে দিলাম সেদিন। সেই পোশাক পরে সম্রাট সম্রাজ্ঞী তাদের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে দুর্গের পেছনের গোপন দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলেন। বোধহয় সমুদ্রতীরে আগেই একটা জাহাজ এনে রাখা হয়েছিল। কাভাল্লি থামল।
তারপর বোনিফেস রাজা হলো, ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ। বোনিফেস এসে প্রথমেই খোঁজ করল শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাটের ধনদের। সেসব পেলও সম্রাটের সজ্জাকক্ষের সব মূল্যবান জিনিসই ছিল। কিন্তু পাওয়া গেল না, বাইজেন্টাইন সম্রাটদের বংশানুক্রমিকভাবে ব্যবহৃত মূল্যবান মুকুটটা। ফ্রান্সিস এতক্ষণ গল্পের মতো ইতিহাস শুনছিল। নিখোঁজ রাজমুকুটের কথা শুনেই ফ্রান্সিস বেশ উৎসুক হলো। ও ভালো হয়ে বসল। বলল—সেই রাজমুকুট কোথায় থাকত।
ঐ সজ্জাকক্ষেই। কোণার দিকে একটা কাঁচের আধারে। কাভাল্লি বলল।
আচ্ছা তুমি সেই রাজমুকুট শেষ কখন দেখেছিলে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
কাভাল্লি মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবতে ভাবতে বলল—তখন তো বোনিফেস আক্রমণ করতে আসছে সেসব নিয়েই খুব চিন্তায় ছিলাম। তবে যতদূর মনে পড়ছে। সম্রাট যে দিন পালিয়ে যান তারতিন কি চার দিন আগে তিনি শেষ রাজসভায় গিয়েছিলেন। রাজসভা থেকে খুব দুশ্চিন্তা নিয়ে সম্রাট ফেরেন। আমি তাকে পোশাক পরিচ্ছদ পাতে সাহায্য করলাম। উনি মুকুট খুলে দিলেন। খুব মৃদুস্বরে কী বললেন বুঝলাম না। শুধুদুটো কথা বুঝলাম সম্রাটদের ভাগ্য। আমি মুকুটটা নিয়ে কাঁচের আধারে রেখে দিলাম। এই পর্যন্ত আমার মনে আছে। তারপর আর রাজসভাও বসেনি,সম্রাট সভাকক্ষে আসেননি। মন্ত্রী অমাত্যদের সঙ্গে যে পরামর্শ সবই দুর্গের মন্ত্রণাকক্ষে করেছেন।
সম্রাট কি আর কখনো সেই সজ্জাকক্ষে যাননি। ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল। কাভাল্লি ভাবল। হঠাৎই বোধহয় ওর মনে পড়ল। বলল—হ্যাঁ, যে রাতে উনি পালিয়ে যান সেই রাতে সজ্জাকক্ষে কিছুক্ষণের জন্যে ঢুকেছিলেন। কিন্তু আমাকে ঢুকতে দেননি। আমাকে বাইরে দাঁড়াতে বলে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পরে আমি যে চাষিদের পোশাক এনে দিয়েছিলাম সেটা পরে বেরিয়ে এসেছিলেন।
সম্রাটের হাতে কিছু ছিল না? ফ্রান্সিস বলল। হা ছিল। সম্রাটদের রাজমুকুটের ছবি। ওটা দেয়ালে ঝোলানো থাকতো। ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বলল—তা সেই ছবিটা নিয়ে সম্রাট কী করলেন?
কাভাল্লি একটু ফুঁপিয়ে উঠল। বলল—উনি ছবিটা আমাকে দিলেন। তারপর কোনো কথা না বলে চলে গেলেন। কাভাল্লির চোখে জল ভরে উঠল। চোখ মুছল ও।
ছবিটা কি তুমি এঁকেছিলে?হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
না, সম্রাট নিজেই এঁকেছিলেন। কথাটা বলেই কাভাল্লি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বলল সম্রাট আমাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তখনও দুর্গের প্রধান প্রবেশদ্বারে সম্রাটের সৈন্যদের সঙ্গে বোনিফেসের সৈন্যদের লড়াই চলছে। ইচ্ছে করলে আমি সম্রাটের মূল্যবান রাজদণ্ড, তলোয়ারের খাপ, চুন্নী পান্না নিয়ে। পালাতে পারতাম। কিন্তু পারলাম না। আমি সজ্জাকক্ষের খোলা দরজার সামনে বসে কাঁদতে লাগলাম।
তারপর?
কতক্ষণ পরে জানিনা। বোনিফেসের সৈন্যদল এলো। আমি ওদের পায়ের শব্দ পেয়ে সম্রাটের দেওয়া ছবিটা আমার জোব্বার নীচে লুকিয়ে ফেললাম। সৈন্যরা এসে আমাকে তুলে দাঁড় করাল। আমার পরিচয় জানতে চাইল। বললাম সজ্জাকক্ষের প্রহরী আমি।
একটু পরেই বোনিফেস এলো। সজ্জাকক্ষে ঢুকল। সমস্ত মূল্যবান সম্পদ রয়েছে দেখে সে উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। সে রাজমুকুটটা খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও রাজমুকুটটা দেখতে পেল না। সেএবার আমাকে দেখতে পেল। সৈন্যরা আমার পরিচয় দিল। বোনিফেস আমাকে ঘাড় ধরে সজ্জাকক্ষে ঢোকাল। বলল—বলো, রাজমুকুট কোথায়? আমি কাঁচের আধারটার দিকে আঙুল বাড়িয়েই ভীষণভাবে চমকে উঠলাম। কাঁচের অর্ধেকটা ফাঁকা। সম্রাটের মুকুট সেখানে নেই। বুঝলাম আমি সাংঘাতিক বিপদে পড়েছি। বোনিফেস নিশ্চয়ই ধরে নেবে আমি রাজমুকুট সরিয়েছি। আতঙ্কে আমি চিৎকার করে বললাম-রাজমুকুট এই কাঁচের আধারেই ছিল। বোনিফেস বিশ্বাস করল না। বলল—তুই চুরি করেছিস। আমি বুঝলাম বোনিফেস আমাকে বন্দি করবে। চরম অত্যাচার চালাবে আমার ওপর। আমি দ্রুত ভাবতে লাগলাম কী করে পালানো যায়। একটা চিন্তা মাথায় খেলে গেল। বললাম—তাহলে রাজমুকুট নিশ্চয়ই সম্রাজ্ঞীর সজ্জাকক্ষে আছে। বোনিফেস দুজন সৈন্যকে বলল আমার সঙ্গে যেতে। বলল—যা নিয়ে আয় রাজমুকুট। আমি সৈন্য দু’জনকে নিয়ে চললাম। এই দুর্গের সিঁড়ি পথ ঘুরে সব আমার নখদর্পণে। সৈন্য দুজন তো এই প্রথম দুর্গে ঢুকল। ওরা এই দুর্গের কিছুই চেনে না। দুর্গের দেয়ালে এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। আলো-আঁধারি পথ, সিঁড়ি, ঘর। একটা অন্ধকার সিঁড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় আমি একলাফে সিঁড়িটায় নেমে পড়লাম। সৈন্য দুজন কিছু বোঝবার আগেই সিঁড়ির নীচের অন্ধকার ঘরে দ্রুতপায়ে ঢুকে পড়লাম। সৈন্য দুজন কিছুক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি করল। আমাকে খুঁজল। তারপর চলে গেল। আমি দ্রুতপায়ে ছুটলাম পেছনের গোপন দরজার দিকে।
