দলপতি বলল—কিছুক্ষণ আগে আমরা কয়েকজনকে বন্দি করেছি। তারাও কি তোমাদের সঙ্গে এসেছে?
হ্যাঁ তারাও ভাইকিং। আমাদের বন্ধু। কথাটা বলে হ্যারি জিজ্ঞেস করল এটা কী গ্রীকদেশ।
না, ক্রীট দ্বীপ। এই বন্দরের নাম ফালাসন। পশ্চিম ক্রীটের বন্দর।
আমাদের বন্দি করা হচ্ছে কেন? আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি।
সেসব আমাদের বিদ্রোহী নেতা এনরিকো বুঝবেন। কালকে তার কাছে তোমাদের হাজির করা হবে। তিনি যা করতে বলবেন, তাই করা হবে।
এবার হ্যারি ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। দলপতির সঙ্গে যা কথা হল সব বলল। দলপতি জিজ্ঞেস করল—তোমাদের জাহাজে আরো লোকজন আছে?
হ্যাঁ, হ্যারি বলল—তাদেরও কি বন্দি করা হবে?
হ্যাঁ সবাইকে। চলো জাহাজের দিকে। দলপতি হাত তুলে ইঙ্গিত করল। হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল দলপতির কথাটা। ফ্রান্সিস বলল—ওকে বলো যা আমরা দু’জন ওদের সঙ্গে যাবো। জাহাজের বন্ধুদের আত্মসমর্পণ করতে বলবো। অযথা রক্তপাত আমরা চাই না। হ্যারি দলপতিকে সেকথা বলল। দলপতি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ফ্রান্সিস হ্যারি এগিয়ে এলো। আট-দশজন সৈন্য শাঙ্কোদের নিয়ে পেছনের ঘরবাড়ির দিকে চলে গেল।
সবার আগে ফ্রান্সিস আর হ্যারি পেছনে দলপতি আর বিশ পঁচিশজন চলল জাহাজঘাটার দিকে। জাহাজের কাছে এসে ফ্রান্সিস দেখল মারিয়া আর অন্য ভাইকিং বন্ধুরা জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বিদ্রোহী নেতা এনরিকোর সৈন্যদল দেখেই ওরা বুঝল ফ্রান্সিসরা বন্দি হয়েছে।
ফ্রান্সিস জাহাজের কাছে এল। গলা চড়িয়ে বলল—ভাইসব, আমরা বন্দি হয়েছি। সবাই জাহাজ থেকে নেমে এসো। কেউ অস্ত্র নিয়ে আসবে না। মারিয়া আর অন্য ভাইকিংরা বুঝল এখন অত্মসমর্পণ ছাড়া কোনো উপায় নেই। ওরা জাহাজ থেকে আস্তে আস্তে নেমে আসতে লাগল। সৈন্যরা সবাইকে ঘিরে দাঁড়াল। দলপতি হ্যারিকে বলল—জাহাজ ওঠো, আর কেউ আছে কিনা খুঁজে দেখব। হ্যারিকে নিয়ে দলপতি জাহাজে উঠল। রসুইঘরে দুজন ভাইকিং খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছিল। ওরা ফ্রান্সিসের কথা শুনতে পায়নি। সেই দুজনকে নিয়ে দলপতি আর হ্যারি জাহাজ থেকে নেমে এলো।
দলপতি হাত তুলে সবাইকে ছোটো টিলাটির দিকে হাঁটতে নির্দেশ দিল। দলপতি সবার সামনে। পেছনে ফ্রান্সিস, হ্যারি, মারিয়া আর অন্য ভাইকিংরা। ওদের ঘিরে নিয়ে সৈন্যরা চলল। যেতে যেতে মারিয়া বলল—কী ব্যাপার বললো তো। এরা কারা? ফ্রান্সিস বলল—এরা বিদ্রোহী নেতা এনরিকোর সৈন্য। এটা ক্রীট দ্বীপ। জানি না এখানকার রাজা কে? এনরিকো কার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে তাও জানি না। যাক গে, ওরা কালকে আমাদের এনরিকোর সামনে নিয়ে যাবে। দেখা যাক এনরিকো কী হুকুম দেয়।
টিলামতো জায়গাটা পার হয়ে বেশ কিছুটা হেঁটে এলো সকলে। একটা লম্বাটে পাথরের ঘরের সামনে এসে দলপতি দাঁড়াল। ঘরটার ছাদও পাথর গেঁথে তৈরি। একটা মাত্র লোহার দরজা। সেই লোহার গরাদ দেওয়া দরজার সামনে খোলা তলোয়ার হাতে দুজন পাহারাদার সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। দরজার গরাদের ফাঁক দিয়ে বিস্কো আর দু-তিনজনের মুখ দেখা গেল। ফ্রান্সিস বুঝল এটা কয়েদঘর। খুব চিন্তায় পড়ল ফ্রান্সিস এনরিকো যদি ওদের মুক্তি না দেয় তাহলে যে করেই হোক পালাতে হবে। সবাই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দলপতির নির্দেশে একজন পাহারাদার সৈন্য দরজায় লাগানো বড়ো তালাটা, খুলল। ফ্রান্সিস, মারিয়া হ্যারি সহ সবাইয়ের হাত দড়ি দিয়ে বেধে তারপর একে একে কয়েদঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো।
ভেতরে ঢুকে ফ্রান্সিস দেখল কয়েদঘরটা লম্বাটে ধরনের। ছাদের কাছে কয়েকটা ফোকর। মেঝেয় শুকনো ঘাস বিছানো। সেখানে বন্দিরা শুয়ে আছে। বিস্কো এগিয়ে এলো। বলল—ফ্রান্সিস,এভাবে বন্দি হয়ে থাকার চেয়ে লড়াই করে মরা ভালো।
বিস্কো, ছেলেমানুষী করো না। দেখা যাক ওদের নেতা এনরিকো কী বলে। তারপর সময় সুযোগ মতো পালাতে হবে। এখন চুপচাপ থাকো। বিস্কো বলল—এই এনরিকো কে, এই সৈন্যরা কী করতে চায় এসব তুমি জানো?
না! ফ্রান্সিস বলল! তখন বিস্কো বলল, তুমি এদিকে এসো। এখানে একটা লোক কিছুদিন যাবৎ বন্দি হয়ে আছে। নাম কাভাল্লি। ও এখানকার অনেক খবরাখবর জানে।
চলো তো কাভাল্লির কাছে, ফ্রান্সিস বলল। তারপর হ্যারি আর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল।—তোমরাও এসো। বিস্কো ওদের ঘরের কোণার দিকে নিয়ে গেল। কাভাল্লি তখন ঘাসের বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। ফ্রান্সিসরা ওর সামনে এসে বলল। কাভাল্লির পরণে জোব্বোমতো। মোটা কাপড়ের। ফ্রান্সিস কয়েদ ঘরের দিকে আসার সময় এরকম পোশাক পরা স্থানীয় লোকদের দেখেছে। বিস্কো ডাকল-কাভাল্লি-কাভাল্লি। কাভাল্লি চোখ মেলে তাকাল। বিস্কো ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে বলল—এ ফ্রান্সিস, ও রাজকুমারী মারিয়া ও হ্যারি এর সবাই আমার বন্ধু। ফ্রান্সিস তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছে।
কাভাল্লি, তুমি কি এই ক্রীটের লোক? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
না—পর্তুগালে আমার বাড়ি। কাভাল্লি পর্তুগীজ ভাষায় বলল—তবে এখানে এসে গ্রীকভাষা শিখেছে।
তুমি এখানে এসেছিলে কেন?হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
সে এক ইতিহাস—কথাটা বলে কাভাল্লি আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল।
তুমি ক্রীটে কবে এসেছিলে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
প্রায় পনেরো বছর আগে। বড়ো অভাবের সংসার ছিল আমাদের। তাই ভাগ্য ফেরাতে একদিন বেশ ঘর ছেড়ে একটা মালবাহী জাহাজে কাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। এই ক্রীট দ্বীপের উত্তরে খানিয়া বন্দর। ক্রীটের রাজধানীও খানিয়া। সেই নগরে এখানে ওখানে থাকলাম কিছুদিন। তারপর হঠাৎই খানিয়ার বিখ্যাত মোজেক শিল্পীর নজরে পড়লাম। তখন মোজেকের মিস্ত্রির কাজ করছিলাম। সেই মোজেক শিল্পী তার নিজের বাড়িতে আমাকে রাখল। মোজেকের কাজে আমার খুব আগ্রহ দেখে আমাকে যত্ন নিয়ে কাজ শেখাতে লাগল। কয়েক বছরের মধ্যেই আমি পাকা মিস্ত্রি হয়ে গেলাম। তখন শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট ক্রীটে রাজত্ব করছেন। বাইজেন্টাইনরা শিল্পীমনের মানুষ। নগরে প্রাসাদে, দুর্গের দেয়ালে মেঝেয় বিচিত্র মোজেকের কাজ করাত তারা। ছবিও আঁকাত। মোজেক মিস্ত্রীর খুব চাহিদা তখন। কাভাল্লি থামল।
