উপায় নেই। বোঝা যাচ্ছে এটা একটা বন্দর। খোঁজখবর নিতে নামতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি জাহাজ-চালকের কাছে গেল। বলল—যতটা কাছে সম্ভব জাহাজ ভেড়াও। খোঁজখবর নেবার জন্যে কয়েকজনকে নামতে হবে।
দুটো জাহাজের পাশ দিয়ে গিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজ পাথুরে ডাঙার কাছে এসে থামল। তখনও দেখা গেল জাহাজ দুটো ফাঁকা। কেউ কোথায় নেই। ফ্রান্সিসদের জাহাজ থেকে কাঠের পাটাতন নামানো হলো। তীরে গিয়ে পাটাতন ঠেকল। এবার নামা হবে কিনা তাই নিয়ে ফ্রান্সিসদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো। জাহাজ-চালকও ওদের কাছে এলো। বলল—আমরা প্রবল ঝড়ে ছিটকে কোথায় চলে এসেছি কিছুই বুঝতে পারছি না। কাজেই এখানে নেমে খোঁজখবর করতেই হবে। অন্তত একজন মানুষকে পেলেও জানতে পারবো জায়গাটার নাম কী? তখন দিক ঠিক করে জাহাজ চালাতে পারবো।
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল—হ্যারি কী করবে এখন?
হ্যারি বলল—বিস্কো কয়েকজনকে নিয়ে নামুক। বন্দর যখন তখন লোকজন নিশ্চয়ই আছে। দেখো সামনে দুটো পাথরের টিলা মতো। মনে হয় ও দুটোর ওপাশে মানুষের। বসতি আছে।
ঠিক আছে। বিস্কো তুমি কয়েকজনকে সঙ্গে নাও। অস্ত্র নিও না। তোমাদের সশস্ত্র দেখলে লোকজন ভয় পেতে পার। তাছাড়া আমরা তো লড়াই করতে যাচ্ছি না। ফ্রান্সিস, বলল।
চারজন ভাইকিং বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বিস্কো পাটাতন দিয়ে হেঁটে গিয়ে তীরে নামল। তীরের ঢাল বেয়ে উঠতে লাগল ওরা। চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু মানুষ বা বাড়িঘর দেখতে পেল না। জাহাজ থেকে ফ্রান্সিসরা দেখল বিস্কোরা ঢিলা পার হয়ে নেমে গেল। আর ওদের দেখা গেল না।
ফ্রান্সিসরা জাহাজে অপেক্ষা করতে লাগল কখন বিস্কোরা ফিরে আসে।
বেলা বাড়তে লাগল। কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে। দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হলো। কিন্তু বিস্কোরা ফিরল না। ফ্রান্সিসরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। কেউ খেতে বসল না। সবাই তীরের টিলার দিকে তাকিয়ে রইল।
বেলা আরও বাড়ল। তবু বিস্কোদের দেখা নেই। এবার ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল-হ্যারি, বিস্কোরা নিশ্চয়ই কোনো বিপদে পড়েছে। চলো, শাঙ্কো আর কয়েকজনকে নিয়ে আমরা নামি। বিস্কোদের খোঁজ করতেই হবে।
বেশ চলো। হ্যারি বলল।
আমিও যাবো। মারিয়া বলল।
উঁহু, ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল—আগে আমরা বিস্কোর খোঁজ নিয়ে আসি তারপর তুমি নামবে।
কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু এগিয়ে এলো। একজন বলল—ফ্রান্সিস তোমার সঙ্গে আমরা যাবো।
বেশ, সবাই তলোয়ার নিয়ে এসো। হ্যারি যাও, আমার তলোয়ারটাও নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
তলোয়ার কোমরে গুঁজে প্রথমে ফ্রান্সিস আর হ্যারি পাথুরে মাটিতে নামল। পেছনে—অন্য বন্ধুরা। তীরের ঢাল পেরিয়ে ওরা টিলাটার কাছে এলো। ফ্রান্সিস চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে হেঁটে চলেছে। টিলাটা পার হতেই দেখল চারদিকে ছোটো ছোটো পাথরের চাই ছড়ানো। তারই মধ্যে বেশ কিছু পাথরের বাড়িঘর। কিন্তু পাথুরে পথে বা বাড়িঘরে কোনো লোকজন দেখা যাচ্ছে না।
ওরা ঢিলা থেকে ঢালু পথ বেয়ে নেমে এলো। চলল বাড়িঘরগুলোর দিকে। পথের দুপাশে পাথরের খাড়া খাড়া চাই। তার মধ্যে দিয়ে ওরা চলল। তখনই ফ্রান্সিস দেখল, পাথরের চাঁইগুলোর ওপাশে বেশ কিছুটা সমতল জায়গা। ঘাসে ঢাকা। সেই জায়গাটা থেকে ধোঁয়া উঠছে। ভালো করে নজর দিয়ে দেখল একটা পাথর দিয়ে তৈরি বড়ো উনুন। তখনও আগুন জ্বলছে। ধোঁয়া উঠছে উনুন থেকে। উনুনের ওপরে একটা লম্বা লোহার ডাণ্ডা বাঁধা। সেই লোহার ডাণ্ডায় পাঁচ-সাতটা ছাল-ছাড়ানো ভেড়া ঝুলছে। ভেড়ার মাংস আগুনে ঝলসানো হচ্ছে। ফ্রান্সিস এটা দেখেই দাঁড়িয়ে পড়ল। মৃদুস্বরে বলল—হ্যারি, আমরা বোধহয় বিপদে পড়লাম। ফ্রান্সিস দ্রুত ভাবতে লাগল কী করবে এখন। পিছু ফিরে জাহাজের দিকে ছুটবে না এগিয়ে যাবে। কিন্তু ফ্রান্সিস কোনো কিছু করারই অবকাশ পেল না। হঠাৎ ফ্রান্সিসরা দেখল রাস্তার দু’পাশের পাথরের চাঁইগুলোর আড়াল থেকে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াচ্ছে সশস্ত্র সৈন্যরা। তাদের মাথায় লোহার শিরস্ত্রাণ, এ বুকে বর্ম হাতে খোলা তলোয়ার। ওদিকে লম্বাটে দুটো পাথরের ঘর থেকে সশস্ত্র সৈন্যরা বেরিয়ে আসতে লাগল। বাড়িঘরের দরজা জানালা খুলে গেল। লোজন বেরিয়ে আসতে লাগল। এতক্ষণে যেন ঘুম ভেঙে এই অঞ্চলটা জেগে উঠল। পাথরের চঁইগুলোর আড়াল থেকে সশস্ত্র সৈন্যরা খোলা তলোয়ার হাতে দ্রুত। নেমে এলো। ঘিরে দাঁড়াল ফ্রান্সিসদের। অন্য সৈন্যরাও তাদের ছাউনি থেকে বেরিয়ে এদিকে আসতে লাগল।
সৈন্যদের সাজসজ্জা দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল এরা দুর্ধর্ষ গ্রীক সৈন্যদের মতো যুদ্ধবিদ্যায় শিক্ষিত। এদের একজনের সঙ্গে হয়তো তলোয়ারের লড়াই চালানো যায় কিন্তু কয়েকজনের সঙ্গে লড়াই চালানো অসম্ভব। এখন। ওরা তো মাত্র ছ’জন আর ঐ সুসজ্জিত সৈন্যরা সংখ্যায় একশোরও বেশি। কাজেই লড়াই করতে যাওয়া মানে মৃত্যু ডেকে আনা। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়ে বলল—সবাই তলোয়ার ফেলে দাও। ও নিজেই প্রথম পাথুরে রাস্তায় তলোয়ার ফেলে দিল। হ্যারি আর অন্যেরাও তালোয়ার ফেলে দিল। শাঙ্কো তির-ধনুক ফেলে দিল। একজন সৈন্য সেই তলোয়ার তির-ধনুক তুলে নিল। ছাউনি থেকে যে সৈন্যরা আসছিল তাদের সবার সামনে ছিল একজন দীর্ঘদেহী সৈন্য। মুখে সামান্য দাড়ি-গোঁফ। বেশ স্বাস্থ্যবান। সেফ্রান্সিসদের সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে কী জিজ্ঞেস করল। ফ্রান্সিসের বন্ধুদের মধ্যে হ্যারি ছিল সুশিক্ষিত। ও গ্রীক ভাষা, মোটামুটি জানত। হ্যারি সেই সৈন্যদের দলপতির ভাষা একটু বুঝল। দলপতি জানতে চেয়েছিল, ওরা কারা, কোত্থেকে এসেছে। হ্যারি ভাঙা ভাঙা গ্রীক ভাষায় বলল—আমরা ভাইকিং। চিকামা নামে একটা জায়গা থেকে আমরা ফিরে আসছিলাম। সমুদ্রপথে প্রচণ্ড ঝড়ে অমরা দিভ্রান্ত হয়ে এখানে এসে পড়েছি। আমরা যুদ্ধ চাই না।
