রাতে পরিষ্কার আকাশে তারা ফুটল। চাঁদের আলোয় সমুদ্রের ঢেউয়ের নরম ঝিকিমিকি দেখা গেল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিস হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। একটু পরে মারিয়াও এলো। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে তাকাতে একটু আশ্চর্য হয়ে বলল হ্যারি, লক্ষ্য করেছো এখানে সমুদ্র খুব শান্ত। জলের রঙও গভীর নীল। আমরা কি অন্য কোনো সমুদ্রে এসে পড়লাম? চারদিক দেখতে দেখতে হ্যারি বলল—ঠিকই, বলেছো—এরকম সমুদ্র আমরা। পেয়েছিলাম যেবার সোনার ঘণ্টা উদ্ধার করতে গিয়েছিলাম। মারিয়া বলল—আর একটা জিনিস লক্ষ্য করো—শীত কিন্তু অনেক কম। গরমও বেশি নয়। তার মানে আমরা একটা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এসে পড়েছি।
—আপনি ঠিক কথাই বলেছেন রাজকুমারী—হ্যারি বলল—আমার মনে হয় আমরা ঠাণ্ডার দেশ ইউরোপ। থেকে দূরে—বেশ দূরে চলে এসেছি।
ফ্রান্সিস বলল—চলো তো—জাহাজ চালকের কাছে যাই। ও কী বলে দেখা যাক। তিনজনেই জাহাজ চালকের কাছে এলো। চালক ওর হুইল ধরে এদিকে-ওদিকে ঘোরাচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল—বলতে পারো ঝড়ের ধাক্কায় আমরা কোথায় চলে এসেছি? চালক মাথা নাড়ল। বলল—কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে এই শান্ত সমুদ্র দেখে গরম দেখে মনে হচ্ছে আমরা পর্তুগাল বা স্পেনের কাছে আসিনি। আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। এখন যেকোনো দেশ বা দ্বীপ পেলে জানতে পারবো আমরা কোথায় এসেছি। এখন কতকটা আন্দাজেই জাহাজ চালিয়ে যাচ্ছি। দেখি কোনো দেশ বা দ্বীপে পৌঁছোতে পারি কিনা।
—হুঁ—এ তো চিন্তার কথা। ফ্রান্সিস চিন্তিতমুখে বলল। মাথা নিচু করে ভাবতে লাগল এখন কী করবে ওরা। হ্যারি তখনই মাস্তুলের মাথার দিকে তাকিয়ে নজরদারকে গলা চড়িয়ে ডাল-পেড্রো—একবার নেমে এসো তো। নজরদার পেড্রো—মাস্তুলে বাঁধা দড়ির মই বেয়ে নেমে এলো। পেড্রো কাছে আসতে হ্যারি বলল—ডাঙা দেখতে পেলে? পেড্রো মাথা নাড়ল।
—কোথায় এসেছি বলে তোমার মনে হচ্ছে? ফ্রান্সিস বলল।
—কী করে বলবো। ঝড়ের পাল্লায় পড়ে আমরা দিক ভুল করেছি। এখন কোনোদিকে যাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারছি না। পেড্রো বলল।
—আচ্ছা পেড্রো—মারিয়া বলল-তুমি কি ঝড়ের সময় কোনদিক থেকে ঝড় বইছে কোনদিকে আমরা যাচ্ছি বুঝতে পারো নি? পেড্রো কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল—ডানদিকে অর্থাৎ গরমের দেশগুলোর দিকে জাহাজ বাঁক নিয়েছিল এটা বুঝেছি।
নজরে পড়ার মতো কিছু দেখো নি?মারিয়া বলল। পেড্রো আবার ভাবতে লাগল। তারপর বলল—ঝড়ের সময় জোর হাওয়ায় ছিটোনো বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তবে আমি তখন আবছা দেখেছি দু’ধারে দুটো পাথরের মতো উঁচু ডাঙা। পাথুরে ডাঙা।
—দু’দিকে দুটো পাথরে উঁচু ডাঙা? কথাটা মারিয়া আপন মনে বলল। ভাবতে লাগল—কী হতে পারে ঐ দুটো ডাঙা।
—আমার দেখার ভুলও হতে পারে। পেড্রো বলল। মারিয়া কোনো কথা না বলে ভাবতে লাগল। তারপর কী একটা ভেবে নিয়ে মারিয়া চমকে উঠল। বলল—ফ্রান্সিস আমরা একটা প্রণালী পেরিয়ে এসেছি। তার মানে আমরা ডানদিকে অনেকটা চলে এসেছি—গ্রীসের কাছাকাছি। ইউরোপ থেকে গ্রীসে আসতে গেলে একটা প্রণালী পেরিয়ে আসতে হয়। * [আসলে ফ্রান্সিসের জাহাজ আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ঝড়ের ধাক্কায় আজকের জিব্রাল্টার প্রণালী পার হয়ে ক্রীট দ্বীপ, গ্রীসের দিকে যাচ্ছিল। –লেখক]
—বলো কি? তাহলে তো অনেকটা চলে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল—এবার তফিরতে হয়।
—আমার অনুমানটা ঠিক কিনা সেটা বুঝতে হলে কোনো ডাঙায় পৌঁছোতে হবে। আগে তো কোনো ডাঙা পাই লোকজন পাই—কথা বলি-তারপর সব বুঝে নিয়ে জাহাজের গতি ঠিক করা যাবে। মারিয়া বলল।
—আমিও তাই বলি—হ্যারি বলল এখন জাহাজ যেমন চলছে চলুক—দেখা যাক কোথায় গিয়ে ডাঙা পাই।
—পেড্রো—ফ্রান্সিস বলল—তোমার জায়গায় যাও—দিনরাত নজরদারি চালাও দেখ ডাঙার দেখো পাও কিনা।
জাহাজ চলল।
দু’দিন পরে সকালবেলা মাস্তুলের ওপর বসে থাকা নজরদার পেড্রো চিৎকার করে উঠল—ডাঙা—ডাঙা দেখা যাচ্ছে। কথাটা ডেকে বসে থাকা ভাইকিংদের কানে গেল। সবাই জাহাজের রেলিঙের কাছে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস ও এসে দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখল দূরে পাথুরে ডাঙা দেখা যাচে। টিলা আর পাথরের চাই ছড়িয়ে আছে এদিক-ওদিক। জাহাজ আরো কাছে আসতে দেখা গেল এদিকটায় অত টিলা বা পাথরের চাই নেই। বন্দরমতো। দুটো জাহাজ নোঙর বাঁধা রয়েছে। জাহাজ দুটো একেবারে পাথুরে মাটির ধারেই ভাসছে। জাহাজ দুটোর মাথায় কোনো পতাকা উড়ছে না। কাছাকাছি আসতে ফ্রান্সিস ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। দেখল একটা জাহাজের সামনের দিকে কালো কাঠ অনেকটা চটে উঠে গেছে। অন্য জাহাজের সঙ্গে জোর ধাক্কা লাগলে এরকম হয়। ফ্রান্সিস বুঝল—এটা যুদ্ধ জাহাজ। ততক্ষণে হ্যারি, মারিয়া আর বিস্কো ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি, একটা জাহাজ বোধহয় মালবাহী। অন্যটা মনে হচ্ছে। যুদ্ধজাহাজ। ঠিক বুঝতে পারছি না এখানে আমাদের নামা উচিত হবে কিনা।
হ্যারি বলল—আমরা তো আর যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না। তবে ভয় কীসের? তাছাড়া আমরা সমুদ্রে পথ হারিয়েছি। এটা কোনো দ্বীপ বা দেশ সেটা জানতে পারলে আমাদের পথ খুঁজে পাওয়ার সুবিধে হবে।
মারিয়া বলল—একটা ব্যাপার দেখো, দুটো জাহাজই কিন্তু জনশূন্য। কোনো পাহারাদারও নেই। অদ্ভুত ব্যাপার!
