ফ্রান্সিস আর মারিয়া চলল নিজেদের কোবনের দিকে অন্য ভাইকিংরাও কেউ কেউ গেল কেবিনে, কেউ কেউ জাহাজের ডেকে দল বেঁধে বসল। গল্পগুজব, ছক্কাপাঞ্জা খেলা শুরু হলো।
পরদিন ভোরে ভাইকিংরা ঘুম থেকে উঠে পড়ল। ডেকে এসে দেখল বাতাস বেশ পড়ে গেছে। শুধু পাল খাটালেই জাহাজের গতি বাড়বে না। তাই একদল চলে গেল দাঁড়ঘরে। সেখানে সারিসারি দাঁড় টানার আসনে বসল। ওদিকে ঘড়ঘড় শব্দে নোঙর তোলা হলো। পাল খাটানো শেষ হলো। দাঁড়িরা দাঁড় টানা শুরু করল। জাহাজ চলল উত্তরমুখো, ভাইকিংদের দেশের দিকে।
মাস চারেক কেটে গেল। জাহাজ চলেছে। এর মধ্যে তিন চারটে বন্দরে জাহাজ ভেড়াতে হয়েছে। জাহাজের মেরামতির কাজ হয়েছে। খাদ্য, জল সংগ্রহ করতে হয়েছে। বার তিনেক ঝড়ের পাল্লায়ও পড়তে হয়েছে ওদের।
তখন জাহাজ ইউরোপের কাছে এসেছে। স্বদেশ আর বেশি দূরে নয়।
সেদিন বিকেল থেকেই আকাশে মেঘের জটলা দেখা গেল। সূর্য ডোবার আগেই গ্রামভাউসা বন্দর এলাকা সমুদ্র অন্ধকার হয়ে গেল। ফ্রান্সিস কেবিনঘরে শুয়েছিল। মারিয়া বিছানায় বসে রুমাল সেলাই করছিল। কাজের মধ্যেই ফ্রান্সিসের সঙ্গে গল্পও করছিল। আকাশে মেঘ জমা, বাতাস পড়ে যাওয়া এসব ফ্রান্সিস মারিয়া বুঝতে পারেনি। জাহাজের নজরদার মাস্তুলের মাথায় ওর জায়গা থেকে নেমে এলো। ডেক-এ বিশ্রামরত দু’তিনজন ভাইকিং-এর কাছে এলো। নজরদার হাত তুলে ওদের আকাশের অবস্থা দেখাল। ওরা ভাইকিং। সমুদ্রের সঙ্গে ওদের নাড়ির টান। ওরা বুঝতে পারল ঝড় আসছে। একজন ভাইকিং ছুটল কেবিনঘরের বন্ধুদের আসন্ন ঝড়ের খবর দিতে। ঝড়ের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্যে সবাইকে তৈরি হতে হবে তো। হ্যারি তখনই সিঁড়ি বেয়ে ডেকে-এ উঠে আসছে। ভাইকিং বন্ধুটি সিঁড়ির গোড়ায় হ্যারিকে দেখল। বলল—হ্যারি শিগগির ফ্রান্সিসকে খবর দাও। সাংঘাতিক ঝড় আসছে। হ্যারি ও একনজর মেঘে অন্ধকার আকাশটা দেখেই বুঝল ঝড় আসতে বেশি দেরি নেই। হ্যারি ছুটল ফ্রান্সিসকে খবর দিতে। খবর শুনে ফ্রান্সিস মারিয়া দু’জনেই জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো।
ততক্ষণে জাহাজে সাজো সাজো রব পড়ে গেছে। ভাইকিংরা চিৎকার করে পরস্পরকে ডাকাডাকি শুরু করল। সকলে ডেক-এ এসে জড়ো হল। দুচারজন দড়িদড়া বেয়ে উঠে পাল নামিয়ে ফেলল। দাঁড়ঘরে দাঁড়িরা দাঁড়টানা বন্ধ করল। জাহাজের ডেক এ এসে দাঁড়াল সবাই। সবাই তৈরি হল ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করবার জন্যে। ফ্রান্সিস মারিয়াকে বলল তুমি এখানে থেকো না। কেবিনঘরে নেমে যাও। মারিয়া মাথা নাড়ল। ফ্রান্সিস বলল—ছেলেমানুষি করো না। যা বুঝছি প্রচণ্ড ঝড় আসছে। ডেক-এ থাকলে তুমি টাল সামলাতে পারবে না। আহত হবে। নীচে নেমে যাও।
রাজকুমারী আপনি কেবিনঘরে চলে যান। এ সময় ডেক-এ থাকা বিপজ্জনক। হ্যারি বলল।
মারিয়া আর আপত্তি করল না। বাধ্য মেয়ের যতো সিঁড়ি দিয়ে নেমে কেবিনঘরে চলে গেল।
ওদিকে সূর্য-ঢাকা প্রায়। অন্ধকার আকাশে বিদ্যুতের চোখ ধাঁধানো আলোর রেখা আকাশটাকে যেন চিরে ফেলতে লাগল। তারপরই উন্মত্ত দানবের মতো দ্রুত বেগে ঝড় এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল জাহাজটার ওপর। বিরাট বিরাট ফেনাভরা ঢেউয়ের মাথায় জাহাজটা উঠতে লাগল। পরক্ষণেই ঢেউয়ের ফাটলে নেমে যেতে লাগল। ঝাঁকুনি খেয়ে উত্তাল সমুদ্রের জলে কলার মোচার মতো জাহাজের ওঠাপড়া চলল। হাতে হুইল ধরে জাহাজের গতি উত্তরমুখো রাখবার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল ফ্রান্সিস কিন্তু ঝড়ের তাণ্ডবে ঝড়ো হাওয়ার প্রচণ্ড ধাক্কায় জাহাজ যে কোনদিকে দ্রুতগতিতে চলল ফ্রান্সিস তা আন্দাজ করতে পারল না। ভাইকিংরা দড়িদড়া প্রাণপণে টেনে ধরে ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে লাগল। ডেক-এর ওপর দিয়ে বিরাট বিরাট ঢেউ জাহাজের এপার থেকে ওপার আছড়ে পড়তে লাগল। ডেক এ জলস্রোত রইল। সব ভাইকিং ভিজে নেয়ে উঠল। চলল ঝড়ের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই।
মাস্তুলের মাথায় নজরদার মাস্তুল আঁকড়ে ধরে বসে আছে। মাস্তুল একবার এদিকে হেলছে একবার ওদিকে। কিন্তু নজরদার ওস্তাদ নাবিক। ঠিক ঐ দুলুনির মধ্যে চুপ করে বসে আছে। এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছে—বুঝতে চেষ্টা করছে কোনদিকে ওরা যাচ্ছে। কিন্তু দেখবে কী বুঝবেই বা কী? চারদিকে অঝোর বৃষ্টিধারা আর ছিটকে-ওঠা সমুদ্রের জল একটা ঘন ধোঁয়াটে আবরণের সৃষ্টি করেছে। তার মধ্যে দিয়ে নজরদার প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। তবু হঠাৎ যেন খুব অস্পষ্ট দু’পাশে দুটি পাহাড়ি ডাঙা দেখতে কান পেল। ও চোখ কচলে ভালো করে দেখবার চেষ্টা করল দু’পাশের পাহাড়ি ডাঙা। কিন্তু তখন আরো জোরে বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি নেমেছে। চারদিক আরো ঝাপসা হয়ে গেল। ঝড়ের প্রচণ্ড ধাক্কায় জাহাজটাও যেন জলের ওপর ছিটকে ছিটকে গড়িয়ে চলেছে। নজরদার আর কিছুই দেখতে পেল না।
আস্তে আস্তে ঝড়ের প্রচণ্ডতা কমতে লাগল। আকাশে মেঘ আস্তে আস্তে সরে যেতে লাগল। আকাশ বেশ পরিষ্কার হল। পশ্চিমদিগন্তে দেখা গেল সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আস্তে আস্তে সূর্য ডুবে গেল যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল। সব ভাইকিংরা সপে ভেজা পোশাক নিয়ে এতক্ষণ ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে ক্লান্তিতে ডেক-এর এখানে-ওখানে শুয়ে ছিল বসে ছিল। এখন সবাই উঠে পোশাক পাল্টাতে চলল।
