মারিয়া আনন্দে হাততালি দিয়ে ফেলল। চেঁচিয়ে বলল ফ্রান্সিস, বারো সংখ্যার দাঁত।
ফ্রান্সিস ডাকল–মেস্তিজো, হাতুড়ি ছেনি নিয়ে চলো।
দুজনে মই বেয়ে উঠতে লাগল। মূর্তির মুখের কাছে এসে দুজনে দাঁড়াল। বিকেলের সূর্যের লালচে আলো পড়েছে মূর্তিটায়। ওদিকে নিচের প্রাঙ্গণে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। অবাক চোখে দেখছে ফ্রান্সিসদের কাণ্ড। নিজেদের মধ্যে কী বলাবলি করছে। হয়তো মূর্তিটা এভাবে নষ্ট করছে ভিনদেশিরা ওদের পছন্দ নয়।
মেস্তিজো দাঁতের ওপরের পাটি থেকে গুনে বারো সংখ্যার হাতুড়ি ছেনি চালাল। বার কয়েক হাতুড়ি ঠুকে ছেনি চালাতেই দাঁতের সামনের পাথরের আস্তরণ খুলে এল। দেখা গেল। হুয়াকা দেবতার সেই আসল স্বর্ণমূর্তি। খোঁদলে বসানো। অস্তগামী সূর্যের আলো পড়েছে সেই মূর্তির চোখে মুখে গায়ে। ঝিকিয়ে উঠছে মূর্তির গা, দুছোখে নীলকান্ত মণি, মাথায় কারুকাজ করা মুকুট, গায়ে অলঙ্কার। ফ্রান্সিস অবাক হয়ে দেখতে লাগল মূর্তিটা। একটু পরে ফন্সিস বলল মেস্তিজো, আমি বিধর্মী। তোমাদের দেবমূর্তির গায়ে হাত দেব না। তুমি একা মূর্তিটা নিয়ে নামতে পারবে?
–পারবো। কাঁধে নিয়ে নামবো। কথাটা বলে মেস্তিজো প্রথমে স্বর্ণমূর্তির সামনে কিছুক্ষণ মাথা নত করে রইল। মুখে বিড়বিড় করে কী বলল। তারপর মূর্তিটা খোঁদল থেকে বের করে কাঁধে তুলে নিল। এবার নিচে দাঁড়ানো চিকামার অধিবাসীরা মূর্তিটা দেখতে পেল। সবাই নিঃশব্দে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর মাথা নুইয়ে রইল। চারিদিকে এত লোক। কোনো শব্দ নেই কারো মুখে।
প্রথমে ফ্রান্সিস মই থেকে নেমে এল। বিস্কো আর শাঙ্কো ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ফ্রান্সিস হেসে বলল-কৃতিত্ব আমার নয়,মারিয়ার। ওর অঙ্কের হিসেব ছিল নির্ভুল। মারিয়াও হেসে বলল-কিন্তু সন্ধানের সূত্র তুমিই দিয়েছিলে। সব কৃতিত্ব তোমার। ফ্রান্সিস হাসল। কোনো কথা বলল না।
মেস্তিজো স্বর্ণমূর্তি কাঁধে নিয়ে মই থেকে নামল। ফ্রান্সিসকে বলল-এই মূর্তি নিয়ে কী করবো এখন?
–তোমাদের দেবতা, সেটা তোমাদের ব্যাপার। আমার কাজ ছিল মূর্তি উদ্ধার, তা আমি করে দিয়েছি। এখন আমরা জাহাজে ফিরে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
স্বর্ণমূর্তিটা তোমরাই নিয়ে যাও না। রাজা লুপাকার হাতে পড়লে ও হয় মূর্তিটা গলিয়ে ফেলবে নয় তো নিজেদের রাজ্যে নিয়ে যাবে। মেস্তিজো বলল।
ফ্রান্সিস হেসে মাথা নেড়ে বলল-স্বর্ণমূর্তির ওপর আমাদের কোনো লোভ নেই। তোমাদের উপাস্য দেবতার মূর্তি। তোমাদেরই থাকবে। এদিকে আসল স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে এই সংবাদ যুবরাজ পসকোজের কাছে পৌঁছল। যুবরাজ ঘোড়ায় চেপে এল। আসল স্বর্ণমূর্তি দেখে যুবরাজ খুশিতে ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। বারবার বলতে লাগল আপনার কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ রইলাম।
–ও কথা বলবেন না ফ্রান্সিস বলল-মানুষ হিসেবে আমি আমার কর্তব্য করেছি মাত্র।
যুবরাজ এবার আমাদের যাবার অনুমতি দিন। আমরা দেশে ফিরবো?
–সে কী করে হয় ফ্রান্সিস। আগামী পূর্ণিমা পাঁচদিন পরে। সেদিন আমার রাজ্যাভিষেক হবে। সেই আনন্দ উৎসবে আপনারা থাকবেন না তা কি হয়?
রাজপুত্র বলল।
উপায় নেই যুবরাজ, আমরা অনেকদিন দেশ ছাড়া। আমরা কালকেই দেশের দিকে যাত্রা করবো। রাজপুত্র চুপ করে রইল। কী বলবে আর।
ফ্রান্সিস এবার মেস্তিজোর দিতে তাকাল। বলল–মেস্তিজো, মূর্তি বেদীতে রেখে তুমি চলো আমাদের পথ দেখিয়ে সমুদ্রতীরে নিয়ে যাবে।
মেস্তিজো স্বর্ণমূর্তিটা কাঁধে নিয়ে বেদীতে উঠল। কাঠের মূর্তির পাশে রাখল। মাথা নুইয়ে ভক্তি জানিয়ে নেমে এল। ততক্ষণে মন্দির প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া উনকারা আনন্দে নাচানাচি শুরু করেছে। রাজা লুপাকাও খুশি।
সবাইকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল মেত্তিজো। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। ফ্রান্সিসরা দেখল চিকামাবাসীরা দলে দলে হুয়াকা দেবতার মন্দির প্রাঙ্গণের দিকে চলেছে। হাতে তাদের ফুলপাতা। আনন্দে হাসছে ওরা। এতদিন পরে আসল স্বর্ণমূর্তি পাওয়া গেছে। ফ্রান্সিস এই ভেবে খুশি হলো এতগুলো মানুষের মুখে ও হাসি ফোঁটাতে পেরেছে।
মরুভূমির পথ নয়। অন্য পাহাড়ী পথে মেস্তিজো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওদের সমুদ্র তীরে পৌঁছে দিল। জাহাজে উঠতে উঠতে ফ্রান্সিস ডাকল–মারিয়া।
–বলো?
–এবারও আমাদের হাত শূন্য। ফ্রান্সিস বলল?
–তা হোক। এজন্য আমার মনে কোনো দুঃখ নেই, মারিয়া বলল।
চুনী পান্নার রাজমুকুট
ফ্রান্সিস মারিয়া আর ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা যখন জাহাজে উঠল তখন রাত্রি নেমেছে। ফ্রান্সিস আর মারিয়া জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়াল। ওদের ঘরে দাঁড়াল ভাইকিং বন্ধুরা। সবাই আনন্দে আত্মহারা। কেউ হেঁড়ে গলায় গান গাইছে, কেউ নাচছে। চিকামার গুপ্ত দেবমূর্তি উদ্ধার করেছে ফ্রান্সিস আর মারিয়া।
এবার ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল—ভাইসব। আস্তে আস্তে গোলমাল থেমে গেল। সবাই চুপ করল। ফ্রান্সিস বলল—ভাইসব, গুপ্ত স্বর্ণমূর্তি আমরা উদ্ধার করেছি। আমরা সফল। তবে এর আগে মূল্যবান কিছু না কিছু নিয়ে আমরা স্বদেশে ফিরেছি। এবার আমাদের হাত শূন্য। কিন্তু আমি এজন্যে দুঃখিত নই। আমি ভালোবাসি দুঃসাহসিক অভিযান আর বুদ্ধির খেলা। সেদিক দিয়ে আমাদের অভিযান সফল। বুদ্ধির খেলাতেও আমরা জয়লাভ করেছি। এবার ভাইসব, আজ রাতটুকু বিশ্রাম করে কাল ভোরেই যারা শুরু করবো স্বদেশের দিকে। ফ্রান্সিস থামতেই সব ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল—ও-হো-হো।
