রাতে রাজবাড়ির অন্দরমহলে খাবার ঘরে ফ্রান্সিসরা খেতে বসল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে স্বর্ণমূর্তির সব কথা বলল। একবার চেষ্টা করে খোঁজ পায়নি তাও বলল। তারপর খেতে খেতে বন্ধুদের উদ্দেশে বলল-ভাইসব-হুঁয়াকা দেবতার স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করতে আমি, বিস্কো আর শাঙ্কো এখানে এসেছিলাম। সেই স্বর্ণমূর্তি এখনও উদ্ধার করতে পারিনি। হিসেবে একটু গরমিল হচ্ছে তাই। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস কয়েকদিনের মধ্যেই আমি সেই স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করতে পারবো। তাই বলছিলাম তোমরা কাল সকালে জাহাজে ফিরে যাও। এখানে আমি হ্যারি আর বিস্কো থাকবো। আমরা কয়েকদিনের মধ্যে কাজ সেরে জাহাজে ফিরে যাবো। ফ্রান্সিস আসতে মারিয়া বলে উঠল-আমিও থাকবো। ফ্রান্সিস হেসে বলল-বেশ তুমিও থাকবে। এমনিতেই ভাইকিং বন্ধুদের মন খারাপ। একটা লড়াই হতে হতে হল না। ওরা আর এখানে থাকতে চাইছিল না। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল-সমুদ্রতীরে আমাদের জাহাজটা অরক্ষিত অবস্থায় আছে। কোন জলদস্যু এসে যদি জাহাজে চুরি করে নিয়ে যায় তাহলে আমরা এই বিদেশে ভীষণ বিপদে পড়বো। কাজেই কাল সকালেই তোমরা জাহাজে ফিরে যাও। ভাইকিং বন্ধুরা কেউ আর কোন আপত্তি করল না। ওরা নিঃশব্দে খেতে লাগল।
সেই রাতে সবাই রাজবাড়িতে অতিথি সমাদরে রইল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিসরা বাদে আর সব ভাইকিংরা সমুদ্রতীরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।
ফ্রান্সিস, হ্যারি, মারিয়া, বিস্কো, শাঙ্কোকে নিয়ে পুরোনো আস্তানায় চলে এল। মেস্তিজো ঐ আস্তানাতেই ছিল।
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর ফ্রান্সিস ভেড়ার চামড়ায় কালি কলম নিয়ে অঙ্ক কষতে বসল। অঙ্ক করে আর কাটাকাটি করে।
মারিয়া ফ্রান্সিসের সেই ভেড়ার চামড়ায় লেখা অঙ্কের সংখ্যা দেখে বলল কী ব্যাপার তুমি কি পড়াশোনা শুরু করলে এই বুড়ো বয়সে? ফ্রান্সিস হেসে বলল-মারিয়া তুমি তো জানো-পড়াশুনার সময়টা কেটেছে আমার বিচিত্র সব অভিযানে।
–কী যে বল ফ্রান্সিস? তোমাদের মতো মানুষ একটা জাতির গর্ব। পড়াশুনো তোমার না হয় নাই হলো। মারিয়া বলল।
–আজকে কিন্তু একটু দুঃখই হচ্ছে। এই দেখ একটা সাধারণ হিসেব মেলাতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে আমাকে দাও। আমি মিলিয়ে দিচ্ছি। মারিয়া বলল।
তখন ফ্রান্সিস মূর্তির কপালে উৎকীর্ণ অঙ্কের সংখ্যা, দাঁতের সংখ্যা, চার-এর পার্থক্য ধরে চার নম্বর দাঁত ভাঙা এবং কিছুই না পাওয়া সমস্ত ব্যাপারটাই বলল। মারিয়া মন দিয়ে শুনল। তারপর চামড়ায় লেখা অঙ্কের সংখ্যাগুলো দেখে বলল–ফ্রান্সিস, তুমি একভাবে হিসেব করেছে। হিসেবটা অন্যভাবেও হয়। তুমি পার্থক্য ধরেছো চার-এর। কিন্তু তিন-এর পার্থক্যটাই বোধ হয় ঠিক।
–তাহলে তিন সংখ্যার দাঁত?
–না। কারণ চার নম্বর দাঁতে নিশ্চয়ই খোঁদল পেয়েছো?
–হ্যাঁ পেয়েছি।
–তাহলে সেই সঙ্গে তিন সংখ্যার দাঁতের খোঁদলটাও কাছাকাছি রয়েছে। তিন সংখ্যার দাঁতে মূর্তি লুকানো থাকলেও নিশ্চয়ই তার সামান্য অংশ হলেও দেখতে পেতে। ফ্রান্সিস তিন সংখ্যা নয়।
–তাহলে? ফ্রান্সিস বেশ সমস্যায় পড়ল?
–আচ্ছা, মুর্তির কপালে আর কোন চিহ্ন ছিল? মারিয়া বলল?
–না।
-কিন্তু আমার মনে হয় অঙ্কের সংখ্যাগুলোর কী ভাবে হিসেব হবে, মানে যোগ হবে না বিয়োগ হবে এরকম কোন ইঙ্গিত ওখানে নিশ্চয়ই আছে। রাজা কোলা নিশ্চয়ই কিছু চিহ্ন রেখেছেন। মারিয়া বলল।
–সেটা তাহলে আর একবার দেখতে হয়। তুমিও চলো। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই চলল হুয়াকার বেদীর উদ্দেশ্যে সেখানে পৌঁছে মেস্তিজো মই বেয়ে উঠতে লাগল। ওর মনে তখনও সংশয়। ভালো করে দেখতে লাগল। অঙ্কগুলো ছাড়িয়ে একটু দেখা গেল অস্পষ্ট একটা চিহ্ন। এই চিহ্নটা উনাদের ভাষায় যোগচিহ্ন। মেস্তিজো অবাক হলো। ও মনে মনে মারিয়ার বুদ্ধির প্রশংসা করল। মই বেয়ে দ্রুতই নেমে এল। ফ্রান্সিসরা সবাই এসে ওকে ঘিরে ধরল। মেস্তিজো মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল-রাজকুমারী মারিয়া, আপনি ঠিকই বলেছিলেন। অঙ্কগুলোর পরে একটা অস্পষ্ট যোগচিহ্ন আছে। মারিয়া খুশির চোটে লাফিয়ে উঠল। ফ্রান্সিস বলল–কিন্তু মারিয়া এখন করবে কি করে। চামড়া কালি কলম তো আনিনি।
–এই সামান্য হিসেবের জন্যে ওসবের প্রয়োজন নেই। মারিয়া বলল। তারপর হুয়াকা দেবতার বেদীর সিঁড়িতে বসল। একটা লাল পাথরের টুকরো নিল। সব সংখ্যাগুলো লিখল। ফ্রান্সিসরা ওকে ঘিরে দাঁড়াল। মারিয়া সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল-সব সংখ্যা যোগ করলে হয় চল্লিশ। কিন্তু দাঁতের সংখ্যা ষোল। হবে না। যে সংখ্যার দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে তা ষোলোর কম কোনো সংখ্যা। তারপর মারিয়া সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে নানাভাবে হিসেব করতে লাগল। কিন্তু নিচের সংখ্যা পেল না। ও ভাবল-আচ্ছা যদি প্রত্যেকটি পার্থক্যের সংখ্যাকে যোগ করি। ও বেদীর সিঁড়িতে এইবাবে লিখল
০ – ৪ = ৩
৪ – ৮ = ৩
৮ – ১২ = ৩
১২ – ১৬ = ৩
নিচে টান দিয়ে লিখল–১২
ফ্রান্সিস বলল–তিন সংখ্যা কিভাবে পেলে।
মারিয়া বলল-শূন্য থেকে প্রত্যেকটি সংখ্যা বাদ দিলে পার্থক্য হয় ৩ অঙ্কের। যেমন শূন্য বাদ ১ ২ ৩ = ৩ সংখ্যা তেমনি ৪ বাদ ৫ ৬ ৭ ৩ সংখ্যা। এভাবে পার্থক্যগুলো যোগ করেই পাই–১২ সংখ্যা।
