হ্যারির কথাগুলো রাজপুত্র পিসকোজ কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর হেসে ডান হাত বাড়িয়ে বলল–আপনি সত্যই বুদ্ধিমান! হ্যারি হেসে পিসকোজের হাত ধরল।
–তাহলে কাল সকালে আমি চিকামা নগরে যাবো। মেস্তিজো বলল।
পরদিন সকালের খাবার খেয়েই মেস্তিজো চিকামা নগরের দিকে চলল। পথে নিজের গায়ের পঞ্চোর এখানে ওখানে ছিঁড়ে ফেলল। মাথার চুল দাড়ি এলোমেলো করল। ও যা ভয় পেয়েছিল তাই হল। চিমু সৈন্যরা ওকে বন্দী করল। হাত বেঁধে নিয়ে চলল রাজা লুপাকার কাছে। লুপাকা ওকে দেখে তো আগুন। মেস্তিজো
হ্যারির শেখানো মতো সব বলল। দেখা গেল এতে কাজ হয়েছে। রাজা লুপাকা। শুনল সব। এবার মেস্তিজো রাজার যুদ্ধ জয়ের জন্য বিশেষ পুজোর কথা বলল। রাজা লুপাকা খুশি হল। মেস্তিজোকে মুক্তি দিল। মেস্তিজো মুক্তি হল।
মেস্তিজো সারা শহর ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যেবেলা বিশেষ পুজো ও আনন্দোৎসবের কথা ঘোষণা করে বেড়াল।
দেখা গেল সত্যই ঘোষণায় কাজ হয়েছে। সন্ধ্যে হতেই পুজোর প্রাঙ্গনে ভিড় জমে গেল। রাত হতে ভিড় বাড়ল। নাচগান চলল। চিমু সৈন্যরাও দল বেঁধে এল। আনন্দ উৎসবে মেতে গেল।
ওদিকে সন্ধের পরেই তিতিকাকার আস্তানায় লড়াইয়ের তোড়জোড় শুরু হলো। আত্মগোপনকারী উনকা সৈন্যরা আস্তানার উঠোনে সারি বেধে দাঁড়াল। আস্তানার বাইরে খোলা জায়গায় সশস্ত্র জড়ো হলো। সবার সাখে দাঁড়ালে রাজপুত্র পিসকোজ তার সঙ্গে হ্যারি। রাজপুত্র যাত্রা শুরু করার ইঙ্গিত দিলো। ভাইকিং ও উনকা সৈন্যরা চলল চিকাম নগরীর দিকে। আকাশে মস্ত চাঁদ। তারই ভাঙা ভাঙা আলো পড়েছে তিতিকাকা বনের এখানে ওখানে তাতে অন্ধকার কাটেনি। তারই মধ্যে দিয়ে ভাইকিংরা ও উকা সৈন্যরা চলল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তারা চিকামা নগরীর রাস্তায় এসে উঠল। দেখা গেল পথ জনশূন্য। দোকানপাট বন্ধ। বাড়ির ঘরের আলো নেভানো। প্রায় সকলেই চলে গেছে পুজোর প্রাঙ্গণে। রাজবাড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল চারজন চিম্ সৈন্য উৎসব থেকে ফিরে আসছে। ওরা কাছাকাছি এসে রাজপুত্র পিসকোজ উনকা ও ভাইকিংদের দেখে হকচকিয়ে গেলো। পিছু ফিরে পালাবার চেষ্টা করতেই উনকা সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়লো। চারজনই হার স্বীকার করল। উনকা সৈন্যদের দলপতি ওদের হাত দড়ি দিয়ে বেঁধে রাস্তার পাশে রাখলো। এবার পিসকোজের নেতৃত্বে উনকা সৈন্যরা ছুটল রাজবাড়ির দিকে। হ্যারি তাদের একজনকে থামালো। আকারে ইঙ্গিতে জানতে চাইলো কয়েদঘরটা কোথায়? সৈন্যটি ডান হাত তুলে একটা লম্বাটে পাথরের তৈরি ঘর দেখলো। তারপর ছুটল রাজবাড়ির দিকে। হ্যারি তার বন্ধুদের নিয়ে চলল। কয়েদঘরের দিকে। কয়েদঘরের সামনে এসে দেখলো দরজার দুপাশে মশাল জ্বলছে। পাঁচজন চিম্ সৈন্য কয়েঘর পাহারা দিচ্ছে। দরজার কড়ায় একটা বড় তালা ঝুলছে। হ্যারি ভাইকিংরা পাহাদারদের ঘিরে ফেলল। পাহারাদাররা তো হতবাক। ওরা বুঝতেই পারলো না এরা কারা? কোত্থেকে এল? হ্যারি ইঙ্গিতে ওদের অস্ত্র ত্যাগ করতে বলল। ভয়ে ওদের তখন মুখ শুকিয়ে গেছে। ওরা তাড়াতাড়ি হাতের বশা ফেলে দিল। দড়ি দিয়ে ওদের হাত বাঁধা হলো। তারপর দরজার বাইরে বসিয়ে রাখা হলো। পাহারাদার একজনের কোমরে চাবির গোছা ঝুলছিল। হ্যারি এগিয়ে গিয়ে তার গলায় তরোয়ালের ধারালো মাথাটা ঠেকালো। ইঙ্গিতে বলল দরজা খুলে দিতে লোকটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দরজা খুলে একপাশে সরে এলো। হ্যারি কয়েদঘরের মধ্যে ঢুকল চাপাস্বরে ডাকল
ফ্রান্সিস–বিস্কো–শাঙ্কো। ফ্রান্সিস দরজা খোলার শব্দে ভেবেছিল খারার লোকেরা বোধহয় এসেছে। হ্যারি আরেকবার ডাকল ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল এতে হ্যারির গলা। বিস্কো ঘুমুচ্ছিল, ওর-ও ঘুম ভেঙে গেলো। শাঙ্কোও হ্যারির গলা শুনে চাপাস্বরে বলে উঠলো–
হ্যারি আমরা এখানে, মশালের আলোয় হ্যারি ফ্রান্সিসদের দেখতে পেলো। শুকনো ঘাস ছড়ানো মেঝের ওপর দিয়ে ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। তারপর হ্যারি তরোয়াল দিয়ে হাতের দড়ি কেটে দিলো। বিস্কো আর শাঙ্কোর হাতের দড়িও কেটে দিলো। ফ্রান্সিস বলল-তোমরা তাহলে খবর পেয়েছিলে?
–হ্যাঁ, আমরা তিতিকাকা বনে এসেছিলাম। রাজপুত্র পিসকোজ তার উনকা সৈন্যবাহিনী নিয়ে রাজবাড়ি আক্রমণ করেছে, ওখানে বোধহয় লড়াই চলছে।
–আর সব বন্ধুর? ফ্রান্সিস বলল।
–সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। চলো।
–তার আগে এই কয়েদঘরে যে উনকা সৈন্যরা বন্দী রয়েছে ওদের মুক্ত করতে হবে। ফ্রান্সিস অন্য বন্দীদের দিকে তাকিয়ে বলল। শাঙ্কো নিজের ঢোলা জামার মধ্যে থেকে বড় ছুরিটা বের করল। দ্রুত গিয়ে অন্য বন্দীদের হাত বাঁধা দড়ি কেটে দিল। যুদ্ধ বন্দীরা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলো।
ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরের বাইরে এল। পেছনে অন্য সদ্যমুক্ত উনকা সৈন্যরা। ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে এসে ঘিরে দাঁড়াল। মেস্তিজো হেসে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসের হাত ধরল।
–মেস্তিজো-আমাদের তরোয়াল তীর ধনুক কোথায় রাখা হয়েছে? মেস্তিজো বাঁ পাশে একটু দূরে ছোট ঘর দেখিয়ে বলল-ঐ যে অস্ত্রঘর। নিশ্চয়ই ওখানে রেখেছো ফ্রান্সিসরা অস্ত্রঘরের সামনে এল। ঘরটার দরজার সামনে মশাল জ্বলছে। দুজন পাহারাদার বর্শা হাতে অস্ত্রঘর পাহারা দিচ্ছে। অন্ধকার কুঁড়ে খোলা তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসদের আসতে দেখে ওরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মেস্তিজো একটু দূর থেকে বলল অস্ত্র ত্যাগ কর নইলে মরবে। ওরা দুজন বশা ছুঁড়ে ফেলে অন্ধকার মধ্য দিয়ে পালিয়ে গেল। বিস্কো একটা বশ তুলে দরজার তালা লাগানো লোহার আংটায় বশার মুখ ঢুকিয়ে প্রাণপণ চাড় দিল। কয়েকবার চাড় দিতেই একটা তালাটা খসে পড়ল। দরজা খুলে গেল। ফ্রান্সিস ঢুকল। ঘরটায় মশাল জুলছিল। মশালের আলোয় দেখল একপাশে ওর আর বিস্কোর তরোয়াল দুটো রাখা। পাশে শাঙ্কোর তীর ধনুক। ফ্রান্সিস, বিস্কো ও শাঙ্কো নিজেদের অস্ত্র নিল। সদ্য মুক্তি পাওয়া উনকা সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা বশাগুলোর ওপর। সবাই হাতে হাতে বশ নিল।
