ভোর হল। মেস্তিজো দূর থেকে সমুদ্রের তীরে নোঙর কর ফ্রান্সিসদের জাহাজটা দেখল। ও জাহাজটার কাছে যখন পৌঁছল তখন সকাল। সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে মেস্তিজো ভাইকিংদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য চিৎকার করে ডাকাডাকি শুরু করল। দুজন পাহারাদার ভাইকিং জাহাজের রেলিং-ধরে কাছে এলো, ঝুঁকে পড়ে মেস্তিজোকে দেখলো। মেস্তিজো চিৎকার করে বলল–
–খুব জরুরি খবর আছে। আমাকে জাহাজে উঠতে দাও। ততক্ষণে আরো কিছু ভাইকিং ডেকের রেলিং এর কাছে হাজির হয়েছে! ওরা তখন একটি কাঠের পাটাতন নামিয়ে দিল তীর পর্যন্ত। মেস্তিজো কাঠের পাটাতনের ওপর হেঁটে গিয়ে জাহাজে উঠল। ভাইকিংরা ওকে ঘিরে ধলে। বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল–
–কী সংবাদ?
মেস্তিজো বলল–
–সব বলছি। আগে আমাকে কিছু খেতে দিন। ভাইকিংর একে খাবার ঘরে নিয়ে গেলো। মাংস, রুটি খেতে দিলো। মেস্তিজো খাচ্ছে তখনি হ্যারি এলো। হ্যারি জিজ্ঞাসা করল–
আপনি কে? কী খবর এনেছেন? মেস্তিজো তখন আস্তে আস্তে নিজের পরিচয় ফ্রান্সিসদের বন্দী দশা আর তিতিকাকা বনে মারিয়া আশ্রয় লাভের কথা বলল। তারপর ফ্রান্সিসের নির্দেশও জানলো।
হ্যারি বলল–আমরা সকালের খাবার খেয়েই চিকামা রওনা হবো। আপনি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন।
ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ভাইকিংরা স্নান খাওয়া সেরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জাহাজের ডেক-এ এসে জমায়েত হল। প্রথমে মেস্তিজো পাটাতন দিয়ে হেঁটে জাহাজ থেকে নামলো। ওরা আকাশের দিক তরোয়াল দিয়ে চিংকার করে উঠল—ও-হো-হো-হো মরুভূমির ওপর দিয়ে শুরু হলো। মরুভূমির বালি এর মধ্যেই তেতে উঠেছে। সমুদ্রের দিক থেকে হাওয়া ছুটছে জোরে! সুর্যের তেজও বেশ, এর মধ্য দিয়েই ভাইকিংবা চলল। দুপুর নাগাদ চিক্লাই শহরে এসে পৌঁছল। সেখান থেকে হেঁটে চিকামায় এসে যখন পৌঁছল তখন বিকেল। মেস্তিজোরা চিকামা শহরে ঢুকল না। কয়েকটি পাহাড়ি টিলা পেরিয়ে তিতিকাকা বনে ঢুকলো। যখন তিতিকাকা বনের আস্তানায় এসে পৌঁছল তখন সন্ধ্যে হয় হয়। মেস্তিজো হ্যারিকে রাজপুত্র পিসকোজের কাছে নিয়ে গেলো। পিসকোজ সমাদরে হ্যারিকে ঘাসের বিছানায় বসালো। তারপর ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় ফ্রান্সিসের বিপদের কথা বলল—
–এই অবস্থায় আমাদের আর অপেক্ষা করা উচিত নয়। মেস্তিজো রাজা লুপাকাকে বলেছে যে, আপনারা পূর্ণিমার দিন আক্রমণ করবেন। পূর্ণিমার এখনো দুদিন বাকি। রাজা লুপাকা এই কটা দিন নিশ্চিত থাকবে। সেইজন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আক্রমণ করতে হবে। আপনার আপত্তি না থাকলেও আমরা কালকেই চিকামা আক্রমণ করতে পারবো। পিসকোজ মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর বলল
রাজা পাকাকে তৈরি হবার সময় দেবো না। কালকে রাতেই আমরা আক্রমণ করবো। আমি আজকেই সব আস্তানায় খবর পাঠাচ্ছি কাল বিকেলে সব সৈন্যরা এখানে-জড়ো হবে। এই সময় মারিয়া ঘরে ঢুকল। হ্যারি মারিয়াকে মুক্ত ও সুস্থ দেখে খুশি হলো। উঠে দাঁড়িয়ে তাকে মাথা নিচু করে সম্মান জানালো। বলল–
রাজকুমারী কালকে যুদ্ধ শুরু হবে। এ অবস্থায় আপনার এখানে না থাকাই ভালো, আপনি রাজী হলে আপনাকে জাহাজে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করছি। মারিয়া দৃঢ় স্বরে বলল না। আমি এখানেই থাকবো।
-কিন্তু এই লড়াই হাঙ্গামার মধ্যে আপনার কিছু হলে–
–আমার কিছু হবে না?
–বেশ। হ্যারি আর কিছু বলল না। রাজকুমার পিসকোজ বলল–এই লড়াইয়ে আমাদের সাহায্য করুন আমরা চাই।
–নিশ্চয়ই। তবে আপনারা আপনাদের যে রকম যুদ্ধ নীতি সেভাবে লড়াই ছালাবেন। আমরা আমাদের নীতি অনুযায়ী লড়বো। হ্যারি বলল।
–বেশ। পিসকোজ বলল। এবার হ্যারি মেস্তিজোকে বলল-আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। আপনাকে চিকামায় যেতে হবে।
–সে কী করে হয়। রাজকুমারী মারিয়াকে আমি পালাতে সাহায্য করেছি একথা এতক্ষণে রাজা পাকা জেনে গেছে। আমি চিকামায় ঢুকলেই চিমু সৈন্যরা আমাকে বন্দী করবে। রাজা পাকার কাছে নিয়ে যাবে। কী সাংঘাতিক শাস্তি–
–দাঁড়ান দাঁড়ান, শাস্তি এড়ানোর উপায় বার করছি। হ্যারি বলল। তারপর পাথরের মেঝেয় দুএকবার পায়চারি করল। ভাবতে লাগল। একসময় মেস্তিজোকে বলল-আচ্ছা আপনি তো রাজপুরোহিত। পুজো করতে আপনার করতে কী কী লাগে?
–ফুল লতাপাতা তিতিকার হ্রদের পবিত্র জল–ধোঁয়ার জন্যে গাছের শুকনো কয় এ সব!
-তিতিকাকা হদ্রের জল তো শুধু আপনিই আনেন? হ্যারি বলল–
-তাহলে ধরা পড়লে রাজা পাকাকে বলবেন–রাজকুমারী মারিয়া পুজো করতে চেয়েছিলো। তাই তাকে সঙ্গে নিয়ে আপনি তিতিকাকা হ্রদে পবিত্র জল আনতে যাচ্ছিলেন। তখনই আত্মগোপনকারী উনকা সৈন্যরা আমাদের বন্দী করে তাদের আস্তানায় নিয়ে গিয়েছিল। আপনি অনেক কষ্টে পালিয়ে চিকামায় চলে এসেছেন। পারবেন না এসব বলতে?
মেস্তিজো একটু চিন্তা করে বলল–হ্যাঁ তা পারবো।
-এইবার রাজাকে আপনি বলবেন যে দিন কয়েকের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হবে। সেই যুদ্ধে যাতে রাজা লুপাকা জয়লাভ করতে পারেন তার জন্য আপনি কালকে সন্ধ্যেবেলা পূজার আয়োজন করেছেন। সব চিকামাবাসীরা যেন সেই পূজা উৎসবে অংশগ্রহণ করে। মেস্তিজো হ্যারির পরামর্শটা ভাবতে লাগল। রাজপুত্র পিসকোজ বলল-আপনি পুজোর কথা বলছেন কেন?
হ্যারি বলল–রাজপুত্র কালকে সন্ধ্যেবেলা পুজোর আয়োজন হলে চিকামার অনেক লোক সেই পুজোর উৎসবে অংশ নিতে যাবে। চিমু সৈন্যরাও যাবে। রাজবাড়িতে থাকবে কিছু প্রহরী সৈন্য। আমরা সহজেই তাদের পরাস্ত করতে পারবো। রাজা রানীকে বন্দী করতে পারবো। রাজা রানীকে বন্দী করতে পারলে চিম্ সৈন্যদের মনোবল ভেঙে যাবে। তারা সহজেই বশ্যতা স্বীকার করবে। চিকামার মানুষজন পুজোর অঙ্গনে থাকবে। অযথা নিরীহ মানুষও এই লড়াইয়ের সময় মারা পড়বে না।
