একটু পরেই দুজন পাহারাদার সৈন্যের পাহারায় মারিয়া এল। মারিয়া চিন্তাগ্রস্ত। ফ্রান্সিস, বিস্কো, শাঙ্কো বন্দী। কয়েদঘরে কী কষ্টে না জানি ওদের দিন কাটছে মারিয়ার এই উৎসবে আসার একেবারেই ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু মেস্তিজো ওর সঙ্গে দেখা করে বারবার অনুরোধ করেছে-এই উৎসবে আপনি অবশ্যই আসবেন। আপনার মন ভালো নেই। তবু আসবেন। তাই মারিয়াকে আসতে হলো। মারিয়া বেদীতে বসে উৎসব দেখতে লাগলো। এই সময় মেস্তিজো ওর কাছে এলো। বলল–
–আপনি আমার সঙ্গে আসুন। দেবরক্ষীর পূজা করুন তাহলে আপনার মঙ্গল হবে। মারিয়া উঠে মেস্তিজোর পেছনে পেছনে আসতে লাগল। মারিয়ার পাহারাদার দুজন চিমু সৈন্য ওকে অনুসরণ করল। ওরা সকলে এসে মেস্তিজোর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল, মেস্তিজো ইঙ্গিতে পাহারাদার দুজনকে বাইরে দাঁড়াতে বলল। তারপর মারিয়াকে নিয়ে ঘরে তুলল, ঘরে ঢুকে মেস্তিজো ওর পুরোহিতের পোশাক নানান রঙের সুতোর কাজ করা গায়ের চাদরটা ফেলে দিল। একটা পঞ্চো গায়ে পরে নিল। তারপর পেছন দিকটার দরজাটা খুলে মারিয়াকে চাপা-স্বরে ডাকল–রাজকুমারী তাড়াতাড়ি চলে আসুন! দুজনে দরজার বাইরে এল। তারপর মেস্তিজো দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলো। পেছনে মারিয়া। মারিয়ার পাহারাদার দুজন সৈন্য তখনো বর্ষা হাতে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে মেস্তিজো ও মারিয়া যতটা দ্রুত সম্ভব যেতে লাগলো। সব লোকজন তখন উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা। ওদের লক্ষ্যই করল না। মেস্তিজো ও মারিয়া রাস্তায় এসে নামল। রাস্তা জনশূন্য। সবাই উৎসূবের প্রাঙ্গনে গিয়ে জড়ো হয়েছে। এক সময় ওরা চিকামা শহর থেকে বেরিয়ে এলো। আকাশে খণ্ড চাঁদ। তার আলোয় মেস্তিজো দেখল ধারে কাছে লোকজন নেই। এবার মেস্তিজোও দাঁড়িয়ে পড়ল। মারিয়াও দাঁড়িয়ে পড়ল। দুজনেই বেশ হাঁপাচ্ছে তখন। মেস্তিজো বলল
–রাজকুমারী–ফ্রান্সিস আমাকে দুটো দায়িত্ব দিয়েছে। এক, আপনাকে মুক্ত করার সেটা করলাম। দুই, জাহাজে গিয়ে ফ্রান্সিসের বন্ধুদের সব কথা জানানো। এইবার আমাকে সেই কাজটা করতে হবে। আপনি জাহাজে ফিরে যাবেন তো।
মারিয়া বলল–না আপনি চিকামাতেই কোথাও আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিন। ফ্রান্সিস্রা মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি চিকামা ছেড়ে যাবো না।
–কিন্তু চিকামায় থাকা আপনার পক্ষে নিরাপদ নয়। থাকলে আপনি যে কোন সময় বিপদে পড়তে পারেন।
–তাহলে চিকামার বাইরে আমার অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দিন। মেস্তিজো বেশ চিন্তায় পড়ল। ও ভাবতে লাগলো মারিয়াকে চিকামার বাইরে কোথায় রাখা যায়। তখন হঠাৎ মনে পড়ল তিতিকাকা বনের সেই আস্তানার কথা। বলল–
তিতিকাকা বনের মধ্যে আত্মগোপনকারী উনকা সৈন্যরা এক আস্তানা তৈরি করেছে। সেখানে মৃত রাজা কোলার পুত্র পিসকোজ আছে। আপনি ঐ আস্তানায় নিরাপদে থাকতে পারবেন।
-তাহলে খুবই ভালো হয়। মারি। বলল।
মেস্তিজো মারিয়ারে তিতিকাকা বনের দিকে নিয়ে চলল।
তিতিকাকা বনের মধ্যে যখন ওরা ঢুকল তখন রাত গভীর! বনের ওপার নিচে অন্ধকার; প বলে কিছু নেই। বনের এখানে ওখানে চাঁদের ভাঙা অস্পষ্ট আলোয় মেস্তিজো দ্রুত এগিয়ে চলল পেছনে মারিয়া। এক সময় ওরা সেই কাঠের বাড়ির কাছে এলো। হঠাৎ তিন চার জন আত্মগোপনকারী উনকা সৈন্য ওদের ঘিরে এল। মেস্তিগো চিৎকার করে বলে উঠল। উনকা সৈন্যরা ওকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানালো। তারপর ওদের বাড়িটার মধ্যে নিয়ে গেলো। ঘরে ঢুকে মারিয়া মশালের আলোয় দেখা লম্বাটে ঘরটায় অনেক লোকজন ঘাসের বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। এক কোনায় রাজপুত্র পিসকোজ ঘুমিয়ে ছিল। মেস্তিজো কাছে বলে কী বলে ডাকলো। পিসকেজের ঘুম ভঙে গেলো। সে উঠে বসল। মারিয়াকে দেখে বেশ অবাকই হলো! মেস্তিজো রাজপুত্রকে এক নাগাড়ে কী বলে গেলো। রাজপুত্র কী বলল। তখন মেস্তিজো মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল–আমি রাজপত্রের কাছে আপনার পরিচয় দিয়েছি। রাজপুত্র আপনাকে এখানেই থাকবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। মেয়েরা যে ঘরে থাকে সেই ঘরে। এবার মেস্তিজো মারিয়াকে নিয়ে ঘরের বাইরে এলো। একটা বড় উঠোন পেরিয়ে পূর্ব কোণায় একা ঘরের কাছে এসে দাঁড়াল। মেস্তিজো ঘরের দরজায় আস্তে ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে স্ত্রীলোকের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মেস্তিজো কী বলল। দরজা খুলে একজন বয়স্ক উনকা স্ত্রীলোক বেরিয়ে এল। মেস্তিজো তাকে কী বলল। স্ত্রীলোকাট মারিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে কী বলল। তারপর দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। মেস্তিজো মারিয়াকে বল–রাজকুমারী আপনি এখানে থাকবেন। এরাই আপনার দেখাশুনো করবে। আমি সমুদ্রতীরে যাচ্ছি। ফ্রান্সিসের বন্ধুদের খবর দিতে। মারিয়া ঘরটায় ঢুকল! দেখল ঘরে দুটো মশাল জ্বলছে। মেঝেয় ঘাসের বিছানায় মোটা কাপড়ের চাদর পাতা। কিছু স্ত্রীলোক শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। ঘুম ভেঙে দুএকজন মারিয়াকে দেখল। মধ্যবয়স্কা স্ত্রীলোকটি মারিয়াকে বিছানা দেখাল। হেসে কী বলল। বোধহয় মারিয়াতে শুতে বলল।
মেস্তিজো উঠোন মত জায়গায় নামল। তারপর ঐ আস্তানা থেকে বেরিয়ে এল। চলল মরুভূমির মত সেই ঢালা সমুদ্রতারের উদ্দেশ্য। দুএকটা টিলার মত পাহাড়ী এলাকা পার হয়ে মেস্তিজো সেই মরুভূমির মত এলাকায় এল। তখন চাঁদ পশ্চিমদিগন্তে হেলে পড়েছে! মৃদু-জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে মরুভূমি এলাকার জোরে হাওয়া আসছে। সমুদ্রের দিক থেকে বালি উড়ছে। মেস্তিজো চলল সমুদ্রের দিকে।
