তখনই কয়েরের দরজায় শব্দ হল। দেখা গেল দরজা খোলা হচ্ছে। দুজন পাহারাদার বান্দাদের জন্যে চীনামাটির বড় গোল পাত্রে খাবার নিয়ে ঢুকল। ওরা বন্দীদের হাতের বাঁধন খুলে দিল। তিনকোণা পাতা বন্দীদের সামনে ঘাসের ওপর বিছিয়ে দিল। খাবার ঢেলে দিল। গতরাত থেকে খাওয়া নেই, ঘুম নেই ফ্রান্সিসর। যেন ক্ষুধাতৃষ্ণা ভুলে গেছে। ফ্রান্সিস খাবার খেতে খেতে বলল–কিছুই ফেলো না–পেট পুরে খাও। মুখে ভালো না লাগলেও খাও। বন্দীদশায় ফ্রান্সিস সব সময় একথা বলে। শঙ্কেও উঠে বসে খেতে লাগল। সেই রানের রুটি, বুনো আলু আর সামুদ্রিক মাছের ঝোল। মেডিজের তাত্তিায় তিতিক বনের আস্তানায় এমনি খাবারই ওরা খেয়েছে। খেয়ে অভ্যস্ত হয়েছে। পেট পুরে খেল তিনজনে। তারপর অনেকটা জল খেল। পাহারাদাররা এঁটো পাতা নিয়ে চলে গেল। ফ্রান্সিসরা দ্বাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
কয়েক ঘণ্টা কটল। খেয়ে দেয়ে ফ্রান্সিস গায়ে বেশ জোর ফিরে পেল। লোহার দরজায় আবার শব্দ উঠল-ঢ ঢং ঢং ঘর র র। ওরা দেখল মেস্তিজো একটা লম্বা মত বুড়ো লোককে নিয়ে ঢুকছে। লোকটার মুখে পাকা দাঁড়ি গোঁফ। মাথায় কালো কাপড়ের কেটি বাঁধ। মাথায় পাকা চুল পেছনে বেণীর মত পাকানো। গলায় নানা রঙের পাথরের টুকরের মালা, হাতে একটা বোঁচকা। ফ্রান্সিস বুঝল লোকটা বদ্যি। বদি শাঙ্কোর কাছে এসে বসল। ওর পিঠের কালসিটে দাগ, চাবুকের ঘা এসব ভালো করে দেখল। তারপর ঝোলা থেকে চীনামাটির বোয়াম বের করল। একটা গাছের পাতা বের করল, তারপর সেই পাতার বোয়াম থেকে হলুদ রঙের কিছু গুড়ো ঢালতে ঢালতে মেস্তিজোকে জল নিয়ে আসতে বলল।
–মেস্তিজো জল নিয়ে এলো, যদি সেই জল গুড়োটার ওপর ফোঁটা ফোঁটা ঢেলে আঠার মতে করল। তারপর শাঙ্কোর পিঠে আস্তে আস্তে লাগিয়ে দিল। প্রথমে শাঙ্কো এ চেঁচিয়ে উঠল, বোধহয় জায়গাগুলো জ্বালা করে উঠল। তারপর শঙ্কো শান্ত হলো। বোধহয় জ্বালা যন্ত্রণা একটু কমল। ওষুধ লাগিয়ে বদ্যি মেস্তিজোকে কী বলল, মস্তিজো পাতাটায় ওষুধ কিছুটা রেখে দিল। তারপর চলে গেল, মেস্তিজো ফ্রান্সিসকে বলল–ওষুধ রইল। কাল সকালে লাগিয়ে দিও। সেদিন কাটল। মেস্তিজো পরের দিনও ওষুধ এনে দিলো।
দিন চারেক কাটল, শাঙ্কো এখন অনেকটা সুস্থ। সেদিন ফ্রান্সিস মেস্তিজোকে বলল–
–দেখো, রাজা লুপাকা শাঙ্কোকে যেভাবে বিনা কারণে শাস্তি দিলো, তাতে রাজার বিরুদ্ধে আমি রুখে দাঁড়াতে পারতাম। কিন্তু মারিয়ার কথা ভেবে আমি নিজেকে সংযত করেছি।
–ফ্রান্সিস। মেস্তিজো বলল–
–তোমাকে বলিনি কিন্তু এখন তো বলতেই হয়। মারিয়াকে একটা ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। তাকে বাইরে বেরুতে দেওয়া হচ্ছে না। কারো সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না।
ফ্রান্সিস বলল?
–এটা হবে আমি জানতাম। কিন্তু এখন যে করেই হোক মারিয়াকে উদ্ধার করতে হবে, মেস্তিজো তুমি কী একা পারবে।
–নিশ্চয়ই পিরবো। মেস্তিজো বলল–আমি সেসব ছকে রেখেছি। কিন্তু আমার ভয় হলো পরে রাজা লুপাকা এসব জানতে পারলে আমার জীবন বিপন্ন হবে।
–তোমার কোনো ভয় নেই। তোমাকে দুটো কাজ কতে হবে। মারিয়াকে মুক্ত করতে হবে আর আমাদের জাহাজে আমার বন্ধুদের বিপদের সংবাদ পৌঁছে দিতে হবে। ভাবছিলাম রাজা পাকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামব না। কিন্তু আর লড়াইয়ে না নেমে উপায় নেই। তুমি আমার বন্ধুদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসে সোজা তিতিকাকা বনে গিয়ে রাজপুত্র পিসকোজের কাছে নিয়ে যাবে। পিসকোজ যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকামা আমাণ করে। আমি এখান থেকে পালাবার চেষ্টা করব কিন্তু দি পালাতে না-ও পারি আমার বন্ধুরা এসে ঠিক আমাদের উদ্ধার করবে। মেস্তিজো বলল–
–ঠিক আছে আমি যাচ্ছি, দেখি কতদূর কী করতে পারি। মেস্তিজো সেদিন সন্ধ্যেবেলা রাজা লুপাকার সঙ্গে দেখা করল। বলল
–মহারাজ আমি গোপন সূত্রে সংবাদ পেয়েছি যে রাজপুত্র পিসকোজ আগামী। পূর্ণিমার দিন চিকমা আক্রমণ করবে।
–পূর্ণিমা কবে? রাজা জিজ্ঞাসা করলেন?
–আর সাতদিন পরে। তারপর মেত্তিজো বলল।
–কালকে দেবরক্ষীর পূজো। সেই উৎসবে আপনি ও মহারাণী আসবেন। রাজকুমারী মারিয়াকেও আসার অনুমতি দেবেন এই আমার অনুরোধ। রাজা কিছুক্ষণ ভাবলেন তারপর বললেন।
–বেশ তাই হবে, কিন্তু রাজকুমার মারিয়ার সঙ্গে পাহারাদার সৈন্য যাবে?
–বেশ। মস্তিজো বলল।
পরদিন দুপুর থেকেই দেবীর পূজের উৎসব শুরু হল। চিকামার অধিবাসারা দলে দলে পুজোর আঙ্গিনায় আসতে লাগল। মই বেয়ে উঠে দেবরক্ষীর গলায় মালা পরাতে লাগল। দেবরক্ষীর মূর্তির বেদীতে ফুল পাতা ছড়িয়ে দিতে লাগল। বুনো গাছের শুকনো কষ জড়ো করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিল। সুগন্ধি ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল পূজাঙ্গনে। মেস্তিজো সারাদিন পুজো নিয়ে ব্যস্ত রইল। উৎসব জমে উঠল সন্ধ্যাবেলা। সমস্ত পূজাঙ্গন ঘিরে অনেক মশাল জুলল। শুরু হল নাচ গান। দলে দলে মেয়েরা সুর করা নাচের আসরে নাচগান করতে লাগল।
সন্ধ্যের পরেই ঘোড়ায় চড়ে রাজা লুপাকা ও রানী এল উৎসব প্রাঙ্গনে। বসল দেবরক্ষীর মূর্তির বেদীতে। রাজা রানী দুজনেই বেশ সেজেগুজে এসেছে। শুধু চারদিকে দাঁড়ানো চি সৈন্যরা রাজারানীর জয়ধ্বনি দিল। চিকামার অধিবাসীরা কোন জয়ধ্বনি দিল না।
