–মেস্তিজো ওদের জিজ্ঞাসা করো যে শাঙ্কোকে এখানে বন্দী করা হয়েছে কী না? আর শাঙ্কো সুস্থ আছে কী না!!
মেস্তিজো পাহারাদারদের এসব কথা জিজ্ঞেস করল। উত্তরে পাহারাদাররা কী সব বলল। মেস্তিজো ফ্রান্সিসের দিকে ফিরে বলল।
–হ্যাঁ, শাঙ্কোকে এখানে বন্দী করে রাখা হয়েছে আর শাঙ্কো সুস্থ তাছে।
–শাঙ্কোকে কেন বন্দী করা হয়েছে জিজ্ঞাস কর।
–চিম পাহারাদার মেস্তিজোকে কী বলল। মেস্তিজো বলল–
–ওরা সন্দেহের বশে শাঙ্কোকে বন্দী করেছে। ওদের সন্দেহ তিতিকাকা বনে যেসব উনকা সৈন্যরা আত্মগোপন করে তাদের সঙ্গে শাঙ্কোর যোগ আছে। শাঙ্কো গুপ্তচর। একটু পরেই রাজসভার কাজ শুরু হবে। তখন রাজার সামনে শাঙ্কোকে হাজির করা হবে। রাজা বিচার করে শাস্তি দেবেন সেই শাস্তিই শাঙ্কোকে পেতে হবে। ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ভেবে দেখল এক্ষুনি চিমু পাহারাদারদের সঙ্গে লড়াইতে নামা উচিত হবে না। সময় ও সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ওরা ফিরে এসে রাজবাড়ির সিংহদ্বারে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস, বিস্কো সারারাত কিছু খেতেও পারেনি, ঘুমুতেও পারেনি। মেস্তিজোরও একই অবস্থা তিনজন তখন প্রচণ্ড পরিশ্রান্ত। সদর দেউড়ির পাশে একটা লম্বাটে পাথরের ওপর ওরা বসে পড়ল।
বেলা বাড়তে লাগলো। একসময় রাজবাড়ির সদর দেউড়ি খুলে গেলো। লোকজন রাজসভার ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। ফ্রান্সিসরাও গেলো। একসময় রাজা লুপাকা এলো। পাথরের সিংহাসনে বসল। ততক্ষণে পাহারাদার সৈন্যরা হাত বাঁধা শাঙ্কোকে রাজার সামনে এনে উপস্থিত করেছে। একজন পাহারাদার শাঙ্কোকে দেখিয়ে গড়গড় করে কী সব বলে গেলো। রাগে রাজা লুপাকার মুখ লাল হয়ে উঠল। চিৎকার করে রাজা কী বলে উঠল। মেস্তিজো চাপা গলায় বলে উঠল–
ফ্রান্সিস, পাঁচ ঘা বেত মারার হুকুম হয়েছে। তখন লম্বা, কালো বেত হাতে একজন সৈন্য এগিয়ে এলো। প্রচণ্ড জোরে চাবুক চালালো শাঙ্কোর গায়ে। শাঙ্কোর সমস্ত শরীর নড়ে উঠল। ও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। বসে পড়ল, ফ্রান্সিস বুঝল চাবুকের পাঁচটা ঘা শাঙ্কো সহ্য করতে পারবে না, অজ্ঞান হয়ে যাবে। ও মেস্তিজোকে বলল–
শিগগির রাজাকে বলো চাবুক মারা বন্ধ করতে। আমি রাজার সঙ্গে কথা বলব। মেস্তিজো চিৎকার করে দুহাত ওপরে তুলে লুপাকাকে সে কথা বলল। এবার মেস্তিজো মারফৎ রাজা লুপাকা ও ফ্রান্সিসের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো।
ফ্রান্সিস-শাঙ্কো আমার বন্ধু। তাকে চাবুক মারা হচ্ছে কেন?
রাজা–ও গুপ্তচর।
ফ্রান্সিস–আপনি তার কোন প্রমাণ পেয়েছেন?
রাজা–আমার সৈন্যরা তার প্রমাণ পেয়েছে।
ফ্রান্সিস–মিথ্যে কথা, যদি এ মিথ্যে অভিযোগে আমার বন্ধুকে শাস্তি দেওয়া হয় তাহলে গুপ্ত স্বর্ণমূর্তি আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করব না।
রাজা–কিন্তু তোমাদের তো সেই জন্যই এখানে থাকতে দেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সিস–আমার বন্ধুকে যদি মুক্তি দেওয়া না হয় তাহলে আমি স্বর্ণমূর্তি খুঁজবো না!।
রাজা–তাহলে তোমাদের দুজনকেও বন্দী করা হবে।
ফ্রান্সিস–বেশ তাই করুণ। কিন্তু আমার বন্ধুকে আর একটাও চাবুক মারা চলবে না।
রাজা–ওর আরো চারটে চাবুকের ঘা পাওনা আছে।
ফ্রান্সিস চিৎকার করে উঠল–না-না।
রাজা লুপাকা আঙুল নেড়ে পাহারাদারদের ইঙ্গিত করল, ওরা পাঁচজন ছুটে এসে ফ্রান্সিস ও বিস্কোর হাত বেঁধে ফেলল। তারপর ওদের কোমর থেকে তরোয়াল খুলে নিল। আবার চাবুকের ঘা পড়ল শাঙ্কোর পিঠে, তারপর আবার। শাঙ্কো পাথুরে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল চাবুকের ঘায়ে আহত শাঙ্কোর দিকে। ফ্রান্সিসের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। বিস্কোর চোখেও জল। ওরা অসহায় বন্দী, কিছুই করার নেই।
পাহারাদাররা ফ্রান্সিস ও বিস্কোকে নিয়ে হাঁটতে লাগল কয়েদঘরের দিকে। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগল। ওর মাথায় অনেক চিন্তা। শাঙ্কোর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। মারিয়ারও যাতে কোন বিপদ না হয় সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। ওদের দুজনকে কয়েদঘরে ঢোকানো হল। একটু পরেই পাহারাদাররা আহত শাঙ্কোকে কয়েদঘরে রেখে গেলো। ফ্রান্সিস ও বিস্কো আহত শাঙ্কোর ওপর ঝুঁকে পড়ল। বাঁধা দুটো হাত দিয়ে ফ্রান্সিস শাঙ্কোর মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। এমন সময় কয়েদঘরের দরজায় টং করে শব্দ হলো। ফ্রান্সিস দেখল মেস্তিজো লোহার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস তাকাতেই ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে লোহার দরজার কাছে দাঁড়াল। মেস্তিজো বলল–ফ্রান্সিস, অনেক কায়দা করে রাজা লুপাকাকে হাত করেছি। বলেছি ফ্রান্সিসদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখব এবং এইভাবে রাজপুত্র পিসকোজ ও আত্মগোপনকারী উনকা সৈন্যদের সব খবরাখবর জোগাড় করব এবং তা রাজা লুপাকাকে জানাবো। রাজা খুব খুশি, আমাকে অনেক ক্ষমতা দিয়েছে। ফ্রান্সিস বলল–মেস্তিজো-তুমি যে করেই হোক শাঙ্কোর চিকিৎসার ব্যবস্থা কর।
দেখছি, একথা বলে মেস্তিজো চলে গেলো। ফ্রান্সিস এবার শাঙ্কোর পাশে ভাল করে বসল। শাঙ্কোর মাথা নিজের কোলে তুলে নিল। শাঙ্কো ব্যথায় একটু কঁকিয়ে উঠল। ফ্রান্সিস ডাকলো–শাঙ্কো?
–উঁ?
–খুব কষ্ট হচ্ছে?
–না। শাঙ্কো মৃদু হাসল। বলল–বুঝলে ফ্রান্সিস–আমি খুব আহত হবার ভান করেছি যাতে আরো চাবুক খেতে না হয়। তবে পিঠটা ভীষণ জ্বালা করছে। দেখতো কতটা কাটল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে শাঙ্কোর জামাটা খুলতে লাগল। বিস্কোও সাহায্য করল। জামা খোল হলে মশালের আলোয় ওরা দেখল তিন চারটে লম্বাটে কালশিটের দাগ শঙ্কোর পিঠে। একটা দাগ একেবারে পিঠের চামড়া কেটে বসেছে। টুইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে কাটা জায়গা থেকে! ফ্রান্সিস বুঝল–শাঙ্কোর চিকিৎসা প্রয়োজন। নইলে কাটা জায়গাটা পেকে যেতে পারে। ফ্রান্সিস বলল–বিঙ্কে চিনেমাটির হাঁড়িট! জল নিয়ে এসো। বিজে উঠল। রের কোনায় রাখ হাঁড়িটা থেকে চিনেমাটির বাটিতে করে জল নিয়ে এল। ফ্রান্সিস নিজের কোমরের ফেট্টি থেকে কিছুটা কাপড় ছিঁড়ল। কাপড়ের টুকরোটা জলে চুবিয়ে শাঙ্কের পিঠের কালসিটে দাগে, কটা জায়গায় আস্তে আস্তে জল বুলিয়ে দিল। শাঙ্কো একবার নড়ে উঠল। জল লাগায় বেশ জ্বালা করে উঠল। পারে একটু ঠাণ্ডা লাগায় ভাল লাগল।
