ওদিকে যত রাত বাড়তে লাগল ফ্রান্সিসের ও বিস্কোর উদ্বেগ ততই বাড়তে লাগল। শাঙ্কো এখনো ফিরে এলো না-কী হল ওর? ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়ে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। আরো রাত বাড়লো। শাঙ্কো তখনও ফিরে এলো না, ফ্রান্সিস অধৈর্য হয়ে বলল–
–বিস্কো তৈরি হয়ে চলো, তিতিকাকা বনে যাবো। বিস্কো উঠে দাঁড়ালো, কোমরে তরোয়াল গুলো। ফ্রান্সিসও কোমরে তরোয়াল গুঁজে নিলো। মেস্তিজোর দিকে তাকিয়ে দেখল মেস্তিজো ঘুমিয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস ওর দিকে এগিয়ে গেলো। কাঁধে ঠেলা দিয়ে ডাকল-মেস্তিজো, মেস্তিজো?
–মেস্তিজো বন্ধ চোখ খুলে তাকালো।
ফ্রান্সিস বলল-শাঙ্কো এখনো ফেরেনি। চল ওকে খুজতে যাবো।
মেস্তিজো তাড়াতাড়ি উঠে বসে বলল-সে কী? শাঙ্কোর আবার কী হলো?
ফ্রান্সিস বলল-কিছুই বুঝতে পারছি না। চলো দেখি।
তিনজনে বাড়ির বাইরে এসে রাস্তায় দাঁড়াল, রাত তখন গভীর। দেখল রাস্তা জনশূন্য, এখানে ওখানে দু-একটা মশাল জ্বলছে। তিনজনে চলল তিতিকাকা বনের দিকে। বনের কাছাকাছি এসে দেখল ঘাসের প্রান্তরে জ্যোৎস্না পড়েছে, তিতিকাকা বনের গাছ গাছালির মাথায়ও জ্যোৎস্নার ছড়াছড়ি। ওরা বনের মধ্যে ঢুকলো। এগিয়ে চলল। দেখল ডালপালার ফঁকফোকর দিয়ে এখানে ওখানে ভাঙা জ্যোৎস্না। পড়ছে। ওরা আত্মগোপনকারী উনকা সৈন্যদের আস্তানার উদেশ্যে চলল। ফ্রান্সিস ও বিস্কো মাঝে মাঝেই গলা চড়িয়ে ডাকতে লাগলো–
–শাঙ্কে-ও শাঙ্কো—ও–
কিন্তু উনকা সৈন্যদের আস্তানার কাছাকাছি আসতেই কয়েকজন উনকা সৈন্য উদাত বা হাতে ছুটে এলো।
মেস্তিজো চিৎকার করে বলল। আমরা বন্ধু। আমি মেস্তিজো। সেরা সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভাঙা জ্যোৎস্নায় ভালোর মস্তিজোকে চিনতে পারলে। মাথা নুইয়ে তাকে সম্মান জানালো। ফ্রান্সিস ও বিস্কোকেও চিনতে পার। ঘরটার কাছাকাছি আসতেই সৈন্যদের দলপতি ছুটে এলো ফ্রান্সিসদের দেখে। চিৎকার করে কী বলে উঠল। মেস্তিজো সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলে উঠল–সর্বনাশ শাঙ্কোকে চিম সৈন্যরা বন্দী করে নিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস চমকে উঠে বলল। সে কী? কখন?
এবার দলপতি এগিয়ে এসে মেস্তিজোকে কী বলল। মেস্তিজো ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–আজকে বিকেলের দিকে বনের বাইরে চিকামা যাবার রাস্তার বারে শাঙ্কোকে ওরা বন্দী করেছে তারপর চিকামায় নিয়ে গেছে। বোধহয় কয়েদখানায় বন্দী করে রেখেছে।
ফ্রান্সিস বলে উঠল–বিস্কো চলো চিকামায় ফিরি। এসময় দলপতি মেস্তিজোকে কী সব বলল, মেস্তিজো বলল।
–ফ্রান্সিস রাজপুত্র পিসকোজ এই আস্তানায় এসেছেন। উনি তোমাদের কথা শুনেছেন। তোমরা যদি ওর সঙ্গে কথা বলো তাহলে খুবই ভালো হয়।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে নিয়ে বলল–বেশ, কিন্তু বেশি সময় দিতে পারবো না। আমাদের এক্ষুনি চিকামায় ফিরে যেতে হবে আর শাঙ্কোর মুক্তির জন্য চেষ্টা করতে হবে।
–ঠিক আছে। চলো। মেস্তিজো বলল।
মেস্তিজো আর দলপতি আগে আগে চলল। পেছনে অন্য সৈন্যরা আর ফ্রান্সিস ও বিস্কো। একটু এগোতেই সেই লম্বাটে বাড়িটার সামনে এল ওরা। এবার দলপতি ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। সেই বাড়িটার বড় উঠোন মত জায়গায় এল ওরা। দলপতি পূর্ব কোণার একটা ঘরের দিকে চলল। ঘরের কাছে এসে দেখা গেল ঘরের দরজা খোলা। দলপতি দরজার সামনে দাঁড়াল। দুহাত বুকে রেখে মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে কী বলল। ঘরের ভেতর থেকে ভরাট গলায় কার কথা ভেসে এল। দলপতি ফ্রান্সিসদের ঘরে ঢুকতে ইঙ্গিত করল। প্রথমে মেস্তিজো ঢুকলো। পেছনে ফ্রান্সিস আর বিস্কো। ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস দেখল মোটা কাপড় পাতা ঘাসের বিছানায় একজন শক্ত সমর্থ যুরক বসে আছে। মাথায় লাল কাপড়ের ফেট্টি। কিন্তু কোনো পাখির পালক নেই! মেস্তিজো মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফ্রান্সিসকে গলা উঁচিয়ে বলল—রাজা কোলার ছেলে রাজপুত্র পিসকোজ। ফ্রান্সিস আর বিস্কো অল্প মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানাল। রাজপুত্র পিসকেজে হেসে বিছানা থেকে উঠল। ফ্রান্সিসের ডানহাতটা ধরে ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল—তুমি ফ্রান্সিস–বীর নাম শুনেছি–বসো। রাজপুত্র পিসরোজ নিজে বিছানায় বসল। ফ্রান্সিসের হাত ধরে বসাল। বিস্কো বসল। রাজপুত্র বলল–মেস্তিজো-অল্প স্পেনীয় ভাষা-শিখেছি। গুছিয়ে বলতে পারবো না। রাজা লুপাকা-চিকামা দখল–অত্যাচার-হত্যা-বন্দী-তাড়াবো। লুপাকাকে-চিকামা-স্বাধীন-আপনাদের সাহায্য। ফ্রান্সিস প্রথমে বুঝে উঠতে পারলো না কী বলবে। একটু ভেবে নিল। বলল এব্যাপারে আপনার এখানকার দলপতিকে আমি সব বলেছি। মেস্তিজোও জানে। আমরা এক্ষুণি আপনাদের সাহায্য করতে পারবো না। কারণ রাজকুমারী মারিয়া এখন রাজ প্রাসাদে প্রায় বন্দিনী। আর এই অবস্থায় রাজা লুপাকার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাই না। আমার বক্তব্য মেস্তিজো আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারবে। মেস্তিজো মৃদুস্বরে কিছুক্ষণ রাজপূত্রকে কী বলল। রাজপুত্র চুপ করে সব শুনে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। বলল-আপনার বন্ধু-বন্দী–লুপাক! হৃদয়হীন–নৃশংস-বন্ধু জীবন বিপন্ন। ফ্রান্সিস ঘাসের বিছানা ছেড়ে আস্তে আস্তে উঠল। ফ্রান্সিস বলল–রাজা লুপাকা যদি আমার বন্ধুকে আমার অনুরোধে মুক্ত দেয়-ভালো কথা। কিন্তু যদি আমার বন্ধুর ওপর অত্যাচার করে তবে বন্ধুর মুক্তির জন্যে, মারিয়ার মুক্তির জন্যে আমাদের অস্ত্র ধরতেই হবে। তখন আপনাদের পাশে আমাদের পাবেন। রাজপুত্র হেসে হাত তুলে বলে উঠল–দুঃসাহসী ফ্রান্সিস তোমাদের সামান্য সাহায্য-অনেক। ধন্যবাদ। ফ্রান্সিসরা আবার মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে ঘরের বাইরে চলে এল। মেস্তিজোও বাইরে এল। বলল-চলো আমিও তোমাদের সঙ্গে যাবো। তিনজন চলল চিকামার দিকে। পথে মেস্তিজো বলল–ফ্রান্সিস আমাদের খাওয়া দাওয়া কিন্তু কিছুই হয়নি। চলো আস্তানায় গিয়ে কিছু খেয়ে নি, ফ্রান্সিস বলল।–শাঙ্কোকে সুস্থ না দেখা পর্যন্ত আমার মুখে খাওয়া রুচবে না। পথে আসতে আসতে সূর্য উঠল, ভোর হল। ওরা যখন রাজবাড়ির পাশেই সেই লম্বা ঘরওয়ালা কায়েদঘরের সামনে এসে পেঁছিল তখন সকাল হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস কয়েঘরের দরজার গিকে এগিয়ে গেল। এই কয়েঘরে ওদের আগে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। দেখল চারজন চিম সৈন্য বর্শা হাতে কয়েদঘর পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিস মেস্তিজোকে কাছে ডাকল, বলল –
