–ধারণা নয়, বিশ্বাস। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল। ও একটা মশাল নিয়ে এসেছিল। সেটা মেস্তিজোর সামনে ধরে রইল। উত্তেজনায় ওর হাত কাঁপছে। নির্জনে মন্দির প্রাঙ্গণে হাতুটি হেনির ঠক্ ঠক্ শব্দ উঠছে। মেস্তিজো পাথর-দাঁত ভাঙতে লাগল। সত্যি বোর্সেটা পাথর তেমন শক্ত নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দাঁত অনেকটা ভেঙে খোঁদল দেখা গেল। কিন্তু খোদ শুন্য, কিছু নেই তাতে। মেস্তিজো একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-পেলে কিছু?
–হিসেব মেলেনি। আবার ভাবতে হবে। চলো নামি। ফ্রান্সিস মই বেয়ে নামতে লাগল। পেছনে মেস্তিজো। বিষ্কো শাঙ্গো তখন নিচে দাঁড়িয়ে ভাবছে ফ্রান্সিস কি সত্যিই লুকোনো স্বর্ণমূর্তি খুঁজে পেল? ফ্রান্সিস আর মেস্তিজোকে আস্তে আস্তে নামতে দেখে ওরা বুঝল ফ্রান্সিস ব্যর্থ। স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করতে পারেনি।
ফ্রান্সিস। আস্তানায় ফিরে এল। পথে কেউ কোনো কথা বলল না। ঘাসের বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফ্রান্সিস তাঙ্কের সমাধান ভাবতে লাগল।
পরিদিন সকালে ফ্রান্সিসের স্বর্ণমর্তি উদ্ধারের কথা চিকামায় ছড়িয়ে পড়ল। লোকজ বের সামনে এসে ভিড় করল। দেখল দেবরক্ষীর দাঁত ভাঙা হলো কেন।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিসর বিশ্রাম করছে। রাজবাড়ি থেকে রাজার একজন দেহরী এল। ফ্রান্সিসকে কী বলল। সি কিছুই বুঝল না। মেস্তিজোর দিকে তাকাল। মেস্তিজো বলল-রজ পাল তোমাকে ডেকেছে।
–ও। ঠিক আছে; তুমি আমার সঙ্গে লে! তাইলে কেউ কারো কথা বুকবে না। ফ্রান্সিস বলল।
মেস্তিজোও ফ্রান্সিসের সঙ্গে গাড়ি চলল।
রাজা লুপাকা পাথরের সিংহাসনে বসেছিল। ফ্রান্সিস ও মেস্তিজো সামনে এসে দাঁড়াল। মেস্তিজো মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। ফ্রান্সিস মাথা নোয়াল না। এই লুপাকার আদেশেই সেদিন গায়ক তরুণটি প্রাণ হারিয়েছিল। এই বেদনা ফ্রান্সিস ভুলতে পারেনি। দুজনের কথাবার্তার মধ্যে মেস্তিজো দোভাষীর কাজ করল। রাজা ও ফ্রান্সিসের মধ্যে কথাবার্তা হলো এই রকম–
রাজা-স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করতে পারবে?
ফ্রান্সিস-হ্যাঁ।
রাজা-[হেসে) কোনোদিনই পারবে না।
ফ্রান্সিস-দেখা যাক। অপেক্ষা করুন।
রাজা-না, আমি আর অপেক্ষা করবো না। দুদিন সময় দিলাম। হয় স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করো, নইলে আমার রাজত্ব থেকে বিদেয় হও।
ফ্রান্সিস-দুদিন অনেক সময়।
রাজা-আর একটা কথা। শুনলাম তুমি সোনার মর্তি খুঁজতে গিয়ে দেবরক্ষীর মূর্তির ক্ষতি করেছে। ঐ মূর্তির আর ক্ষতি করা চলবে না।
ফ্রান্সিস-কিন্তু ঐ মূর্তি তো আপনার চিরশত্রু রাজা কোলার হাতে তৈরি।
রাজা-ঐ মূর্তির নিচে আমি আমার নাম ভাস্কর হিসেবে খোদাই করে দেবো। ওটা আমার তৈরি বলে সবাই জানবে।
ফ্রান্সিস-বেশ। তবে একটা কথা। ঐ মূর্তির আর একটু ক্ষতি আমি করবো, কারণ প্রথমবারে আমার হিসেব মেলেনি। এটুকু আপনাকে মেনে নিতে হবে।
রাজা যদি স্বর্ণমুর্তি পাই তবে এটুকু মেনে নিতে আমার আপত্তি নেই। ফ্রান্সিসের সঙ্গে আর কোনো কথা হলো না। ওরা দুজন আস্তানায় ফিরে এল।
একটু সকাল সকাল খেয়ে নিল শাঙ্কো। বরাবরের মত তীর ধনুক নিয়ে শিকারে বেরিয়ে পড়ল। চলল তিতিকাকা বনের দিকে। বনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে সারা দুপুর শিকার করল–দুটো খরগোস আর চারটে বুনো মুরগি। বিকেলের দিকে ফিরে আসছে তখন আত্মগোপনকারী তিনজন উনকা সৈন্যর সঙ্গে দেখা। ওরা শাঙ্কোর সঙ্গে সঙ্গে তিতিকাকা বনের প্রান্ত পর্যন্ত এল। এখানে ঘাসে ছাওয়া প্রান্তরের ওপর দিয়ে চিকামা যাওয়ার ধূলোটে পথ। ওরাও পথের কাছাকাছি এসেছে, দেখল দুজন চিম সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে এলাকাটা পাহারা দিচ্ছে। উনকা তিনজন ওদের দেখা মাত্র বনের দিকে ছুটল। চিমু ঘোড়সওয়ার সৈন্যরাও পিছু ধাওয়া করল। একজন বর্শা ছুঁড়ল। একজন উনকা সৈন্যের পিঠে গেঁথে গেল বশাটা। সে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। বাকি দুজনের একজনের একজন ঘুরে দাঁড়িয়ে বর্শা ছুঁড়ল। বর্শা বিঁধল চিমুসৈন্যের একজনের ঘোড়ার পেটে। ঘোড়াটা জোরে লাফিয়ে উঠল। তারপর আরোহী সৈন্যটিকে নিয়ে ঘাসের প্রান্তরে পড়ে গেল। অন্য জন ছুটে এল। উনকা সৈন্য দুজন ততক্ষণে বনের আড়ালে ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়েছে। শাঙ্কো চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার চিমু সৈন্য দুজন শাঙ্কোর কাছে এল। দুজন ঘোড়া থেকে নেমে এল। একজন শাঙ্কোর তীর ধনুক কেড়ে নিল। অন্যজন শাঙ্কোর দুহাত দড়ি দিয়ে বাঁধল। বাঁধা দড়িটা ধরে ঘোড়ায় উঠল অন্যজনও তীর ধনুক নিয়ে ঘোড়ায় উঠল। দুজন আস্তে আস্তে চালাল। শাঙ্কোর হাতে বাঁধা দড়ি একজন ধরে নিয়ে চলল। শাঙ্কোও কোন প্রতিবাদ না করে চলল ওদের পেছনে পেছনে। সৈন্য দুজন মুখ ফিরিয়ে শাঙ্কোকে নানা কথা জিজ্ঞেস করছে। শাঙ্কো ওদের কোন কথাই বুঝতে পারে নি। চুপ করে থেকেছে।
তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। রাজবাড়ির পশ্চিমদিকে একটা লম্বাটে পাথরের ঘরের সামনে এসে সৈন্য দুজন ঘোড়া থেকে নামল। শাঙ্কো যেসব খরগোস, বুনন মুরগি শিকার করেছিল সেসব সেই সৈন্যটি নিয়ে গেলো। অন্য সৈন্যটি ঘরটার দরজার কাছে গেলো, দরজার দুপাশে মশালের আলোয় দেখা গেল দুজন সৈন্য বর্শা হাতে পাহারা দিচ্ছে। শাঙ্কো বুঝল এটা কয়েদঘর; সৈন্যটি এবার শাঙ্কোর কাছে এল। হাত বাঁধা শাঙ্কোকে নিয়ে ঘরটার দরজার কাছে এলো ততক্ষণে দরজাটা খোলা হয়েছে, কয়েদঘরের পাহারাদার সৈন্যটি শাঙ্কোকে ঘরের মধ্যে ঠেলে ঢুকিয়ে। দিল। তারপর দরজা বন্ধ করে দিল। শাঙ্কো এবার চারপাশে তাকিয়ে ঘরটা দেখল। লম্বাটে ঘর। পাথুরে দেওয়ালে দুপাশে দুটে মশাল জ্বলছে। তার আলোয় দেখল মেঝেতে লম্বা লম্বা শুকনো ঘাস বিছানা। তার ওপর হাত বাঁধা অবস্থায় শুয়ে বসে আছে কয়েকজন উনকা সেন্য। শাঙ্কো প্রথমে শুকনো ঘাসের ওপর বসল। তারপর শুয়ে পড়ল।
