কেউ কোন কথা বলল না। ফ্রান্সিস সকলের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কেউ-কেউ মুখ ফেরাল। কেউ-কেউ মাথা নিচু করল। আশ্চর্য! হ্যারি কোথায়?
ফ্রান্সিস বুঝল, তাহলে ব্যাপার অনেক দূর গড়িয়েছে।
ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। গভীর দুঃখে তার বুক ভেঙে যেতে লাগল। একটা স্বপ্নকে কেন্দ্র করে এত কষ্ট, এত পরিশ্রম, সব ব্যর্থ হয়ে গেল। স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। ফ্রান্সিস অশ্রু রুদ্ধস্বরে বলতে লাগল, ভাইসব, অতি নগণ্য সংখ্যক হলেও পৃথিবীর এমন কিছু মানুষ আছে, ঘরের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যাদের ঘরে আটকে রাখতে পারে না। বাইরের পৃথিবীতে জীবনমৃত্যুর যে খেলা চলছে–নিজের জীবন বিপন্ন করেও সেই খেলায় মাতে সে। এর মধ্যেই সে বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে পায়। আমিও তেমনি একজন মানুষ ফ্রান্সিস একটু থামল। তারপর বলতে লাগল, তোমাদের কারো মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, সোনার ঘন্টা খুঁজে বের করার পেছনে আমার উদ্দেশ্য কি? উত্তর খুবই সহজ আমি বড়লোক হতে চাই? কিন্তু তোমরা আমার বন্ধু। ভালো করেই জানো আমাদের পরিবার যথেষ্ট বিত্তশালী। তবে কেন এত আগ্রহ? কেন এই অভিযান? ভাইসব, উদ্দেশ্য আমার একটাই। ছেলেবেলা থেকে যে গল্প শুনে আসছি, কত রাতের স্বপ্নে দেখেছি যে সোনার ঘন্টা সেটা খুঁজে বের করব। তারপর দেশে নিয়ে যাব। আমাদের রাজাকে উপহার দেব। ব্যস–আমার কাজ শেষ। এর জন্যে যে কোন দুঃখকষ্ট, বিপদ-বিপর্যয় এমনকি মৃত্যুর। মুখোমুখি হতেও আমি দ্বিধাবোধ করব না।
ফ্রান্সিস একটু থেমে আবার বলতে লাগল–তোমরা সেনাপতিকে ক্যাপটেন বলে মেনে নিয়েছো। ভালো কথা। জাহাজের মুখ ঘোরাও দেশের দিকে। ফিরে গিয়ে ঘরে সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জীবন কাটাগে। কিন্তু আমি ফিরে যাব না। ফেরার পথে প্রথমে যে বলটা পাব, আমি সেখানেই নেমে যাব। জাহাজ জোগাড় করে আবার আসবো। আমাকে যদি সারাজীবন ধরে সোনার ঘন্টার জন্যে আসতে হয়, আমি আসব।
ফ্রান্সিস থামল। কেউ কোন কথা বলল না। হঠাৎ সেনাপতি চেঁচিয়ে বলল–এসব বাজে কথা শোনার সময় নেই আমার। জাহাজের মুখ ঘোরাও।
ভীড়ের মধ্যে চাঞ্চল্য জাগল। দেশে ফিরে যাবে, এই আনন্দে সবাই চীৎকার করে উঠল। কিন্তু কেউ লক্ষ্য করেনি, চাঁদের আলো ম্লান হয়ে গেছে। ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘের মত কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে চারিদিকে! বাতাস থেমে গেছে। জাহাজের গতিও কমে এসেছে। ভাড়ের মধ্যে কে একজন বলল–এত কুয়াশা এল কোত্থেকে?
কথাটা কারো কারোকানে গেল। তারা কুয়াশা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আশ্চর্য! এত কুয়াশা? এই অসময়ে? গুঞ্জন উঠল ওদের মধ্যে। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কুয়াশার সেই আস্তরণের দিকে।
ফ্রান্সিস রেলিঙে ভর দিয়ে হাতে মাথা রেখে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। সেও লক্ষ্য করেনি? চারিদিকের পরিবেশ এই পালটে যাওয়ার ঘটনাটা। হঠাৎ ওর কানে গেল সকলের ভীত গুঞ্জন। ফ্রান্সিস মুখ তুলল। এ কি! চাঁদের আলো ঢাকা পড়ে গেছে। অন্ধকার হয়ে গেছে। চারদিক। কুয়াশার ঘন আস্তরণ ঢেকে আস্তরণ ঢেকে দিয়ে সমুদ্র আকাশ।
ফ্রান্সিস চীৎকার করে বলে উঠল–‘এক মুহূর্ত নষ্ট করবার মত সময় নেই। দাঁড়ে হাত লাগাও। সামনেই প্রচণ্ড ঝড় আর ডুবো পাহাড়ের বাধা। সবাই তৈরী হও।
কিন্তু সেই ভীড়ে কোন চাঞ্চল্য জাগল না। সবাই স্থানুর মত দাঁড়িয়ে রইল। কি করছে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না।
হঠাৎ সেনাপতি চীৎকার করে বলে উঠল–সব ধাপ্পাবাজি।
ফ্রান্সিস সেনাপতির দিকে একবার তাকাল। তারপর দুহাত তুলে ভাঙা-ভাঙা গলায় বলল–আমাকে বিশ্বাস কর। আমার বন্ধুত্বের মর্যাদা দাও। সবাই তৈরি হও দেরি করো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমরা সোনার ঘন্টার বাজনার শব্দ শুনতে পাবে।
–পাগলের প্রলাপ–সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলল।
এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করো না। ফ্রান্সিস তবু বলে যেতে লাগল পাল নামাও, দাঁড়ে হাত লাগাও!
ফ্রান্সিস আর বলতে পারল না। পিঠে কে যেন তরোয়ালের ডগাটা চেপে ধরেছে। ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়াতে গেল। পারলো না। সঙ্গে সঙ্গে তরোয়ালের চাপ বেড়ে গেল। শুনল সেনাপতি দাঁত চাপা স্বরে বলছে–আর একটা কথা বলেছো তো, জন্মের মত তোমার কথা বলা থামিয়ে দেব।
সেনাপতির কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের প্রচণ্ড ধাক্কায় সমস্ত জাহাজটা ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। উত্তাল ঢেউ জাহাজের রেলিঙের ওপর দিয়ে ছুটে এসে ডেকে আছড়ে পড়ল। সেনাপতি কোথায় ছিটকে পড়ল। অন্য সকলেও এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল। শুরু হল জাহাজের প্রচণ্ড দুলুনি। ডেকে দাঁড়ায় তখন কারসাধ্য। ঠিক তখনই ঝড়ের শব্দ ছাপিয়ে বেজে উঠল সোনার ঘন্টার গম্ভীর শব্দ–ঢং–ঢং–ঢং।
ডেকে এখানে-ওখানে তালগোল পাকিয়ে পড়ে থাকা মানুষগুলো উৎকর্ণ হয়ে শুনল সেই ঘন্টার শব্দ। এই ঘন্টা যেন মন্ত্রের মত কাজ করল। সোনার ঘন্টা–এত কাছে। জাতে ভাইকিং ওরা। সমুদ্রের সঙ্গে ওদের নিবিড় সম্পর্ক। ঝড় প্রচণ্ড সন্দেহ নেই। সমুদ্রও উন্মত্ত। কিন্তু ওরাও জানে কীভাবে ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। ওরা আর কারো নির্দেশের অপেক্ষা করল না। একদল গেল দাঁড় বাইতে, আর একদল গেল মাস্তুলের দিকে পাল নামাতে।
মাস্তুলের মাথায় উঠে দেখতে হবে ঘন্টার শব্দটা কোন দিক থেকে আসছে। ফ্রান্সিস জাহাজের ভীষণ দুলুনি উপেক্ষা করে মাস্তুল বেয়ে উঠতে লাগল। একেবারে মাথায় উঠে প্রাণপণ শক্তিতে মাস্তুলটা আঁকড়ে ধরে রইল। তারপর যেদিক থেকে ঘন্টার শব্দ আসছে, সেইদিকে তাকাল। ঝড়-বৃষ্টির আবছা আবরণের মধ্যে দিয়ে দেখল, দুটো পাহাড়ের মত পাথুরে দ্বীপ। মাঝখানে সমুদ্রের জল বিস্তৃত। আশ্চর্য! সেখানে সমুদ্র শান্ত। সেই সমুদ্রের মধ্যে দূরে একটা নিঃসঙ্গী পাহাড়ের মত দ্বীপ। পাথুরে দ্বীপ নয়। সবুজ ঘাস আছে দ্বীপটার গায়ে। তার মাথায় একটা সাদা রং-এর মন্দির মত। শব্দটা আসছে সেই দিক থেকেই। ফ্রান্সিস আর কিছুই দেখতে পেল না। ঝড়ের ধাক্কায় জাহাজটা কাত হয়ে গেল। মাস্তুল থেকে প্রায় ছিটকে পড়ার মত অবস্থা। ও তাড়াতাড়ি মাস্তুল বেয়ে নীচে নামতে লাগল। ডেকে পা দেবার আগেই দুটো পাল খাটাবার কাঠ সশব্দে ভেঙে পড়ল। ডেকে কয়েকজন চীৎকার করে উঠল। কি হল, তা আর তাকিয়ে দেখবার অবকাশ নেই।
