দিন যায়, রাত যায়। কিন্তু কোথায় সেই দ্বীপ? কোথায় সেই সোনার ঘন্টা? সকলেই হতাশায় ভেঙে পড়তে লাগল। এ কোথায় চলেছি আমরা? গল্পের সোনার ঘন্টার অস্তিত্ব আছে কি? না কি সবটাই ফ্রান্সিসের উদ্ভট কল্পনা? সেনাপতি আর তার দলের লোকেরা এতদিনে সুযোগ পেল। তারা গোপনে সবাইকে বোঝাতে লাগল–ফ্রান্সিস উন্মাদ। একটা ছেলে ভুলানো গল্পকে সত্যি ভেবে নিয়েছে। আর দিন নেই, রাত নেই সেই কথা ভাবতে-ভাবতে ও উন্মাদ হয়ে গেছে। কিন্তু ও পাগল বলে আমরা তো পাগল হতে পারি না? দীর্ঘদিন আমরা দেশ ছেড়েছি। কোথায় চলেছি, তার ঠিকানা নেই। কবে দেশে ফিরব, অথবা কেউ ফিরতে পারবে কি না, তাও জানি না। একটা কাল্পনিক জিনিসের জন্যে আমরা এভাবে আমাদের জীবন বিপন্ন করতে যাব কেন?
কিন্তু উপায় কি? সবাই মুষড়ে পড়ল। সেনাপতিও ধীরে-ধীরে ফ্রান্সিসের বন্ধুদের মন তার বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলতে লাগল।
এর মধ্যে আর এক বিপদ। জাহাজে খাদ্যাভাব দেখা দিল। মজুত জলে তখনও টান পড়েনি। কিন্তু কম খেয়ে আর কতদিন চলে? খাদ্য যা আছে, তাতে আর কিছুদিন মাত্র চলবে। তারপর? সেনাপতি বুদ্ধি দিল সবাইকে এখনও সময় আছে। চল আমরা ফিরে যাই। এই সবকিছুর মূলে হচ্ছে ফ্রান্সিস। তার নেতৃত্ব অস্বীকার করো। বেশী বাড়াবাড়ি করলে ওকে জলে ফেলে দাও। তারপর জাহাজ ঘোরাও দেশের দিকে।
কথা সকলেরই মনে ধরল। শুধু হ্যারি সবকিছু আঁচ করে বিপদ গুনলো।
ফ্রান্সিস কিন্তু এসব ব্যাপার কিছুই আঁচ করতে পারেনি। ওর তো একটাই চিন্তা যে করেই হোক সেই দ্বীপে পৌঁছতে হবে। আজকাল ওর বন্ধুরা কেমন যেন এড়িয়ে-এড়িয়ে চলে। ওর দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকায়। একমাত্র হ্যারিই আগের মত ফ্রান্সিসের সঙ্গে সঙ্গে থাকে। তবে তার প্রশ্নেও সংশয়ের আভাস ফুটে ওঠে।
গভীর রাত্রিতে ডেক-এ দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল দু’জনে। হ্যারি জিজ্ঞাসা করল–ফ্রান্সিস তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস কর, সোনার ঘন্টা বলে কিছু আছে?
–তোমার মনে সন্দেহ জাগছে? ফ্রান্সিস একটু হাসে।
–সে কথা নয়। এতগুলো লোক একমাত্র তোমার ওপর ভরসা করেই যাচ্ছে।
–হ্যারি আমি জাহাজ ছাড়ার সময়ই বলেছিলাম–যারা আমার সঙ্গে যাচ্ছে, সকলের জীবনের দায়িত্ব আমার। কাউকে বিপদের মুখ থেকে বাঁচাতে গিয়ে আমাকে যদি প্রাণ দিতে হয়, তাই আমি দেব।
–তোমাকে আমি ভালো করেই জানি ফ্রান্সিস–কথার খেলাপ তুমি করবে না! কিন্তু হাজার হোক মানুষের মন তো–
-–আমি বুঝি হ্যারি! দীর্ঘদিন আমরা দেশ ছেড়ে এসেছি–আত্মীয়স্বজন, বাড়ী ঘরের জন্যে মন খারাপ করবে, এ তো স্বাভাবিক। কিন্তু বড় কাজ করতে গেলে সব সময় পিছুটান। অস্বীকার করতে হয়। নইলে আমরা এগোতেই পারব না।
-–আচ্ছা ফ্রান্সিস, তুমি আমাদের যা-যা বলেছ, সে সব তোমার কল্পনা নয় তো?
ফ্রান্সিস কিছু বলল না। কাঁধের কাছে জামাটা একটানে খুলে ফেলল। ও তরোয়ালের কোপের সেই গভীর ক্ষতটা দেখিয়ে বলল–এটা কি কল্পনা হ্যারি?
হ্যারি চুপ করে গেল। বলতে সাহস করল না যে, ওর বন্ধুরা সবাই ওকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। ফ্রান্সিস কথাটা শুনলে হয়তো ক্ষেপে গিয়ে আর এক কাণ্ড বাধিয়ে বসবে।
ফ্রান্সিসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চূড়ান্ত রূপ নিল একদিন। সেদিন সকাল থেকেই সেনাপতি আর তার দলের লোকেরা গোপনে ফ্রান্সিসের কয়েকজন বন্ধুকে বলল–জানো আমরা পথ হারিয়েছি। ফ্রান্সিস নিজেই জানে না, জাহাজ এখন কোনদিকে, কোথায় চলেছে।
এমনিতেই সকলের মনে অসন্তোষ জমেছিল। এই মিথ্যা রটনা যেন শুকনো বারুদের স্তূপে আগুন দিল। মুহূর্তে খবরটা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল! সেনাপতির নেতৃত্বে গোপন সভা বসল। সবাই একমত হলো সেনাপতিই হবে জাহাজের ক্যাপটেন। ফ্রান্সিসের হুকুম আর চলবে না। হ্যারিও সভার ব্যাপারটা আঁচ করে সেখানে গিয়ে হাজির হল। সে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে উঠল। কিন্তু পারল না। তার আগেই কয়েকজন মিলে তাকে ধরে ফেলল। একটা ঘরে কয়েদী করে রেখে দিল। ফ্রান্সিস যাতে আগে থাকতে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে না পারে, তার জন্যে সবাই সাবধান হল।
তখন গভীর রাত। ফ্রান্সিস এক-একা ডেকে পায়চারী করছে! পরিষ্কার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। জ্যোত্সার ছড়াছড়ি। ফ্রান্সিসের কিন্তু কোনদিকে চোখ নেই। ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছে জ্যোৎস্নধোয়া দিগন্তের দিকে।
হঠাৎ পেছনে একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়াল। ও ভেবেছিল হ্যারি এসেছে বোধহয়। কিন্তু না। হ্যারি নয়–সেনাপতি। পেছনে তার দলের কয়েকজন। ফ্রান্সিসের আশ্চর্য হওয়ার তখনও বাকি ছিল। নীচ থেকে সিঁড়ি বেয়ে ফ্রান্সিসের সবাই দল বেঁধে উঠে আসছে ডেক-এ। ব্যাপারটা কি?
সেনাপতি এগিয়ে এসে ডাকল–ফ্রান্সিস?
–হুঁ।
–আমরা কেন উঠে এসেছিল বুঝতে পেরেছ?
–না।
–তোমাকে একটা কথা জানাতে।
–কি কথা?
–এই জাহাজ তোমার হুকুমে আর চলবে না।
–কেন?
–তোমাকে কেউ আর বিশ্বাস করে না।
–তাহলে কাকে বিশ্বাস করে?
-–আমাকে। এই জাহাজের দায়িত্ব এখন আমার।
ফ্রান্সিসের কাছে এবার সমস্ত ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। এই ষড়যন্ত্রের মূলে সেনাপতি আর তার সঙ্গীরা। তারাই ওর বন্ধুদের মন বিষিয়ে তুলেছে। ফ্রান্সিস এবার সকলের দিকে তাকাল। চীৎকার করে বলল–ভাইসব, আমাকে বিশ্বাস করো না তোমরা?
